তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছেন, তীক্ষ্ণ কণ্ঠটা নির্ঘাৎ কোনো বিদেশির। তবে সে কণ্ঠস্বরটা কোনো নারী, নাকি পুরুষের তা তিনি নিশ্চিত হতে পারলেন না। তবে কথার ধরন-ধারণ শুনে বুঝতে পারলেন, কণ্ঠস্বরটার মালিক স্পেন দেশীয়। কারণ, ভাষাটা স্পেন দেশীয় বলেই তার মনে হলো।
সাক্ষী পুলিশ ইসিদোর মুসেৎ ঘরটা আর মৃতদেহ সম্বন্ধে যে বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে গতকাল খবরের কাগজের যে বিবরণ ছাপা হয়েছে, তার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাদৃশ্য রয়েছে।
আঁরি দুভাল। একজন রৌপ্যকার। ওই বাড়িটার কাছাকাছিই আঁরি ভালোর বাড়ি। মাদাম ল এস্পালয়ের প্রতিবেশী।
ওই বাড়িটায় যারা প্রথম ঢুকেছিল, আঁরি দুভালো তাদের অন্যতম, সে ঘটনাটার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে মুসেৎ যে বিবরণ দিয়েছেন, তিনিও সেটাকে সমর্থন করলেন, অর্থাৎ উভয়ের বক্তব্য মোটামুটি একই রকম।
তারা সদর দরজা দিয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, শেষ রাত সত্ত্বেও যারা তাড়াহুড়ো করে বাড়িটার সামনে জড়ো হয়েছিল তারা যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পাওে, সেজন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
আঁরি দুভালোর মতে ওই তীক্ষ্ণ কণ্ঠের মালিক একজন ইতালিয়। কিন্তু ফরাসি যে কিছুতেই নয়, এ বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহও তার নেই। তবে সেটা যে অবশ্যই পুরুষের কণ্ঠ, এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন কোনো নারীর কণ্ঠ হলেও অবাক হবেন না।
আঁরি দুভালো দাও সিদ্ধান্ত নিবেদন করলেন ওই কণ্ঠের অধিকারী একজন ইতালীয়? তিনি কথাগুলো বুঝতে পানেনি। তবে কথার টান ও বলার ভঙ্গি দেখে তিনি এমন নিশ্চিত করে কথাটা বলতে পারছেন।
আঁরি দুভালো মাদাম ল আর তার মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল ভালোই চিনতেন। উভয়ের সঙ্গে সামনাসামনি কথাও বলেছেন বহুবার। অতএব তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটার মালিক যে তাদের মধ্যে কেউ-ই নন, এ ব্যাপারে তার মনে সামান্যতম সন্দেহও নেই।
আর ওদেন হাইসার। মাঝবয়সী একজন ভদ্রলোক।
ওদেন হাইসার এক রেস্তোরাঁর মালিক। রেস্তোরাঁটা তিনি নিজেই পরিচালনা করেন। তিনি স্বেচ্ছায় এ বিষয়ে সাক্ষ্যদান করতে এসেছিলেন। ফরাসি ভাষার অ, আ, ক, খ,ও জানেন না। তাই বক্তব্যকে ফরাসি ভাষায় তর্জমা করে দেওয়ার জন্য তিনি একজন দোভাষীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।
রেস্তোরাঁর মালিক ওদেন হাইমার আমস্টারডামের একজন বাসিন্দা। আকাশ ফাটা আর্তনাদটা যখন বাড়িটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তখন তিনি জরুরি কাজের তাগিদে ও-পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। চিৎকার চাঁচামেচি শোনামাত্র তিনি আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। বেশ কয়েক মিনিট ধরে আর্তস্বরটা চলছিল–দশ মিনিটও হতে পারে। অতএব সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, আর্তস্বরটা ছিল তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী। আর সেটা ছিল রীতিমত ভয়ঙ্কর আর হৃদয়বিদারকও বটে।
আর্তস্বর শুনে যারা হুড়মুড় কওে বাড়িটার ভেতরে ঢুকেছিলেন, ওদের সাথে হাইমারও সঙ্গ নিলেন।
ইতিপূর্বে যারা, যে সাক্ষ্যদান করেছেন, তাদের মধ্যে একটা ছাড়া বাকি সব কয়টাকে ওদেন হাইমার নির্দিধায় মেনে নিলেন। ওই কণ্ঠস্বরটার কথা বলতে চাইছি। সে কণ্ঠস্বরের মালিক যে একজন পুরুষ এ বিষয়ে তার মনে এতটুকুও সন্দেহ নেই। কিন্তু সে কথাগুলোকে তিনি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। কারণ কণ্ঠস্বরটা ছিল খুবই তীক্ষ্ণ আর খুবই দ্রুত উচ্চারিত হয়েছিল। আর বক্তা অস্বাভাবিক ক্রোধে ও ভয়ে। ভয়ে কথাগুলো বলছিল। আর ছিল খুবই কর্কশ। আর এত তাড়াতাড়ি কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছিল, যা বলে বোঝানো যাবে না। কর্কশ কণ্ঠস্বর খুবই তাড়াতাড়ি সেরে, ডায়েবে ল আর মন ডিউ শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিল। শব্দগুলো একবার নয়, বার বারই উচ্চারিত হয়েছিল।
এবার সাক্ষী মিগনোর কথায় আসা যাক।
জ্বলে মিথুনো রুদোলোরা-র অন্তর্গত এৎ ফিলস ফার্মের একজন ব্যাংকার। বড় মিথুনো নামেই তিনি বেশি পরিচিত।
আট বছর আগেকার কথা। গত সালের বসন্তে মাদাম ল এস্পালয় তার ব্যাঙ্কে। একটা হিসেব খুলেছিলেন। মাদাম ল এস্পালয়ের কিছু ধন-সম্পদ ছিল।
মাদাম ল এস্পালয় মাঝে মাঝে তার ব্যাঙ্কে কিছু কিছু অর্থ জমা দিতেন। তিনি মৃত্যুর তিনদিন আগে নিজে ব্যাঙ্কে এসেছিলেন। চার হাজার ফ্ৰা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নেন। নগদ নয়, উপরোক্ত পরিমাণ অর্থের সোনা ব্যাঙ্ক তার হাতে তুলে দিয়েছিল। ব্যাঙ্কের একজন কেরানি নিজে তার সঙ্গে গিয়ে তাঁর বাঞ্ছিত অর্থমূল্যের সোনা বাড়িতে পৌঁছে দেন।
মিগনো এৎ ফিলস্ ব্যাঙ্কের কেরানি ভদ্রলোকের নাম এডলফ লৌ বো। তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন যে, সেদিন দুপুর দুটোয় তিনি মাদাম ল এস্পালয়ের সঙ্গে তার বাড়ি যান এবং চার হাজার ফ্র পৌঁছে দেন।
দরজা খুলে মদাম ল এস্পালয় তার হাত থেকে সোনাসমেত থলেটা নেন। আর অন্য আর একটা থলে নেন বৃদ্ধা মহিলাটি।
বৃদ্ধার হাতে থলে দুটো তুলে দিয়ে তিনি অভিবাদন সেরে পথে নামলেন। তখন পথ ছিল নির্জন। ধারে কাছে কোনো লোককেই দেখতে পাননি। সেটা আসলে সদর রাস্তা ছিল না, উপ-রাস্তা।
এবার সাক্ষ্য দিলেন উইলিয়াম বার্ড। তিনি একজন স্থানীয় দর্জি।
পোশাক পরিচ্ছদ সেলাইয়ের কাজে তার খুবই নামডাক। বাড়িটার ভেতরে যারা প্রথমে ঢুকেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তিনি প্যারিস শহরে দুবছর বসবাস করছেন।
