লন্ড্রির মালিক পলিন দুবুর্গ মুখে এও জানা গেছে, বৃদ্ধা আর তার মেয়ের মধ্যে কোনোরকম অসদ্ভাব কোনোদিন ঘটেছে বলে তার জানা নেই। বরং তাদের আচার আচরণ ও কথাবার্তা শুনে তার মনে হয়েছে, উভয়ের মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক–মা মেয়ের মধ্যে যেটুকু হৃদতা থাকা সম্ভব তা পুরো মাত্রায়ই ছিল। অর্থকড়ির ব্যাপারেও তারা ছিলেন উদার। তবে তাদের জীবনযাত্রা ও অর্থাগমের ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। কিন্তু সে এটুকু শুনেছে। তারা অর্থের মালিক ছিল।
লন্ড্রির মালিক পলিন দুবুর্গের কাছ থেকে এও জানা গেছে, কাপড় চোপড় আনতে ও ধোলাই করা কাপড়-চোপড় ফেরৎ দিতে গিয়ে তাদের বাড়িতে কোনোদিনই অন্য কোনো লোককে দেখতে পাননি। আর এও বলেছেন, তিনি পুরোপুরি নিঃসন্দেহ যে, তাদের বাড়িতে কোনো পরিচারক বা পরিচারিকা কোনো দিনই ছিল না। যদি থাকত তবে কোনো-না-কোনোদিন তাঁর নজরে অবশ্যই পড়ত।
তিনি আরও যা বলেছেন তা হচ্ছে, তাঁদের বাড়ির চারতলা ছাড়া অন্য কোনো তলাতেই কোনো আসবাবপত্রই তার চোখে কোনোদিনই পড়েনি।
বার দেখা যাক তামাকের দোকানের মালিক তার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কি বলেছেন। তিনি গোড়াতেই বলেছেন, তিনি মাদাম ল এস্পালয়কে চিনতেন। তবে তিনি তার কাছে নস্যি ও তামাক খুব কম দিন এবং সামান্য পরিমাণেই বেঁচেছেন।
তিনি জেরার জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন, সেখানেই তার জন্ম হয়েছে। আর প্রথম থেকে আজ অবধি সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন।
যে পুরনো প্রাসাদোপম বাড়িটায় মৃতদেহ দুটোকে পাওয়া গেছে, সে বাড়িতে মৃতা বৃদ্ধা আর তার মেয়ে দুবছরেরও বেশিদিন বাস করেছে, মানে মৃত্যুও সে বাড়িতেই হয়েছে। এর আগেও সে বাড়িটায় এক স্বর্ণকার বসবাস করত। শুধু নিজেই নয়, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ওপরের ঘরগুলোকে ভাড়াও দিত। আসলে বাড়িটার মালিকানা স্বত্ব কিন্তু মাদাম ল এস্পালয়-এরই।
বাড়িটার স্বত্বাধিকারিণী মাদাম ল এস্পালয়। আর সেটাকে নিয়ে ভাড়াটিয়া বিভিন্নভাবে জোর জুলুম খাটাতে থাকায় তিনি শেষপর্যন্ত নিতান্ত অনন্যোপায় হয়ে ভাড়াটিয়ার অন্যায় আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে নিজেই নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলেন। আর কাউকে বাড়িটা ভাড়া দিতে রাজি হলেন না।
স্বর্ণকার আর যা বলল তা হচ্ছে, বৃদ্ধা মহিলার মনোভাব ছিল শিশুসুলভ। আর স্বাক্ষী গত দুবছরের মধ্যে মেয়েটাকে মাত্র পাঁচ-ছয় বার দেখেছে।
তারা মা-মেয়ে দুজনই পুরোপুরি তার চেয়ে বরং মাত্রাতিরিক্ত অবসর জীবন যাপন করতেন। আর তাদের প্রচুর বিত্ত সম্পদ ছিল বলেই জানা যায়।
সাক্ষী স্বর্ণকার প্রতিবেশীদের মুখে শুনেছেন, মাদাম ল এস্পালয় তাদের ধন। সম্পদের কথা সবাইকে বলে বেড়াতেন, কিন্তু তিনি মোটেই তা বিশ্বাস করতেন না।
সাক্ষী আর যা-কিছু বলেছেন তা হচ্ছে, বৃদ্ধা আর তার মেয়ে ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে কোনোদিন তাদের বাড়িতে ঢুকতে বা বেরোতে দেখেননি। তবে কেবলমাত্র এক বা দুদিন কুলিকে বাড়িতে যাতায়াত করতে দেখেছেন। আর যাকে সে বাড়িতে ঢুকতে দেখেছেন তিনি হচ্ছেন একজন ডাক্তার। তিনি আট দশদিন সে বাড়িতে যাতায়াত করেছেন।
কেবলমাত্র লন্ড্রির মালিক আর স্বর্ণকারই নয়, আরও বহু প্রতিবেশি ওই একই রকম সাক্ষ্যদান করেছেন। কেউই কিন্তু সে বাড়িতে করার কথা বলেননি।
আর একটা কথা, বৃদ্ধা মাদাম ল এস্পালয় আর তার মেয়ের মধ্যে কোনোদিন কোনোরকম ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে কারো জানা নেই, কারো মুখে কিছু শোনেও নি।
হ্যাঁ, আর যা-কিছু জানা গেছে, বাড়িটার সামনের দিককার জানালাগুলোর খড়খড়ি কালে-ভদ্রে খুলতে দেখা গেছে। চারতলার পিছনের বড়সড় ঘরটা ছাড়া পিছনের অন্যসব ঘরের জানালার পাল্লাগুলোও সর্বদাই বন্ধ করে রাখা হত। বাড়িটার পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। পুরনো, তবে খুব বেশি পুরনো বলা যাবে না।
এবার সাক্ষ্যদান করতে গিয়ে সশস্ত্র পুলিশের বক্তব্য তুলে ধরছি। তার নাম ইসিদোর মুসেৎ। তিনি জানতেন, ভোর তিনটার সময় তাকে তলব করা হয়।
পুলিশ ইসিদোর আরও বলেছেন, জরুরি তলব পেয়ে তিনি ছুটে এসে দেখেন, বাড়িটার সদর দরজায় বিশ-ত্রিশটা লোক দাঁড়িয়ে। সবাই বাড়িটার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সদর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। উপায়ন্তর না দেখে শেষমেশ বেয়নেট দিয়ে দরজাটা খোলা হলো। শাবল, গাঁইতি আর হাতুড়ি ব্যবহার করে দরজাটা অবশ্যই ভোলা হয়নি।
সদর দরজাটা সহজেই খোলা সম্ভব হওয়ার কারণও রয়েছে যথেষ্ট। দরজাটা দো-আঁজ করা। তাছাড়া নিচে আর ওপরে কোনো খিল বা ছিটকিনি নেই।
দরজাটা না খোলা অবধি তীব্র চিল্লাচিল্লি চলেছিল। দরজাটা খোলা হয়ে গেলে চিল্লাচিল্লি থেমে সবকিছু শুনশান হয়ে গেল।
চিল্লাচিল্লি শুনে মনে হতে লাগল, একটা বা বহুকণ্ঠের আর্তনাদ বলেই মনে হচ্ছিল। আর তা খুবই তীব্র আর একনাগাড়ে দীর্ঘসময় ধরে হচ্ছিল না, একটু বাদ বাদ মুহূর্তের জন্য বিরতি দিয়ে হচ্ছিল আর খুব দ্রুতও ছিল না।
সাক্ষী সশস্ত্র পুলিশ ইসিদোর সুমেৎ-ই সবার আগে আগেই সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় উঠে যান। লম্বা-লম্বা পায়ে ওপরের চাতালে উঠেই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন, তীব্র স্বরের কথা কাটাকাটি তার কানে এলো। দুজনে জোর ঝগড়ায় মেতেছে। একটা গলা খুবই কর্কশ আর দ্বিতীয় গলাটা অপেক্ষাকৃত সরু আর তীক্ষ্ণ। প্রথম কণ্ঠস্বরটা কোনো এক ফরাসি পুরুষের। আর তার ব্যবহৃত কয়েকটা শব্দ তিনি বুঝতে পেরেছেন। উৎকর্ণ হয়ে তিনি আবারও কণ্ঠস্বরটাকে ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করলেন। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই ধরেছেন, কোনো-না-কোনো পুরুষের কণ্ঠই বটে। অবশ্যই কোনো নারীর কণ্ঠস্বর নয়। স্যাকরে আর ডায়েবল শব্দ দুটো তিনি পরিষ্কার শুনতে ও বুঝতে পেরেছেন।
