আতঙ্কিত চোখের মণি সরিয়ে নিয়ে চুল্লিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই আর একটা অভাবনীয় দৃশ্য চাক্ষুষ করে সবাই নতুন করে বিস্মিত হলো। দেখল, চুল্লিটার ওপরে দু-তিনটি ইয়া লম্বা, ঘন, রক্তাক্ত পাকা চুলের বেণী এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। চুলগুলোকে টেনে হিঁচড়ে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে।
আর মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা গেল, চারটি ফরাসি স্বর্ণমুদ্রা নেপোলিয়ন। আরও আছে–তিনটি বড়সড় রূপার চামচ, পোখরাজের কানের দুল একটা, প্রায় হাজার চারেক সোনার ঐ দুটো বড় বড় বস্তায় বোঝাই করা আর ছোট ধাতব চামচ তিনটি এবং খুটিনাটি কিছু সামগ্রি।
ঘরের এক কোণে একটা আলমারি। তার ড্রয়ারগুলো সবই খোলা। দেখে মনে হল, বুঝি লুটপাট করে কে বা কারা চম্পট দিয়েছে। খাটের তলায় নয়, বিছানাপত্রের তলায় ছোট্ট একটা লোহার সিন্দুক দেখা গেল। বিছানাটা ওল্টানো থাকায় সেটাকে ভালোভাবেই দেখা গেল। সেটাকে খোলা হয়েছিল, ভাঙা নয়। ভেতরের জিনিসপত্র খাটের ওপর ইতস্তত ছড়ানো। সিন্দুকটা খোলা যে হয়েছিল তার প্রমাণ, চাবিটাকে তার গায়েই ঝুলে থাকতে দেখা গেল।
আমরা এগিয়ে গিয়ে সিন্দুকটার ভেতরের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলাম। হতাশই হতে হলো। কারণ, কিছু অ-দরকারি কাগজপত্র আর পুরনো চিঠিপত্র ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না।
সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মাদাম ল এস্পালয়ের কোনো চিহ্নই নজরে পড়ল না।
এবার চুল্লিটার ওপরের চিমনিটার দিকে আমাদের নজর গেল। সেটার গায়ে অস্বাভাবিক ঝুল দেখতে পেয়ে আমাদের সন্দেহ হলো। ফলে ব্যস্তপায়ে এগিয়ে গেলাম। বার-কয়েক উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে সেটার ভেতরটা ভালোভাবে পরীক্ষা করলাম।
উফ! কী বীভৎস দৃশ্য! চোখের সামনে ফুটে উঠল! শরীরের সব কয়টা স্নায়ু যেন একই সঙ্গে ঝনঝ নিয়ে উঠল। শিরা উপশিরায় রক্তের চাপ বেড়ে গেল। নিজেদের চোখ দুটোর ওপরও যেন আস্থা রাখতে পারছে না।
কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! তার মেয়ের লাশটা নিচের দিকে মাথা নামানো অবস্থায় চিমনিটার ভেতরে গুঁজে রাখা হয়েছে।
এবার সবাই মিলে টানাটানি করে চিমনির ভেতর থেকে মেয়েটার লাশটাকে বের করে আনলাম। ব্যাপারটা বোঝা গেল, সরু চিমনিটার ভেতর দিয়ে সেটাকে কোনোরকমে ঢুকিয়ে শক্ত ও মোটা কিছু একটা দিয়ে ঠেলে ঠেলে যতটা সম্ভব ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
মৃতদেহটাতে হাত দিয়ে দেখা গেল, তখনও বেশ গরম। নিঃসন্দেহ হওয়া গেল, কিছুক্ষণ আগেই আত্মা দেহখাঁচাটা ছেড়ে গেছে।
মৃতদেহটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেল, বেশ কিছু জায়গায় চামড়া উঠে গেছে আবার কিছু জায়গার চামড়া গুটিয়ে গেছে। ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। মৃতদেহটাকে জোর করে ফেলে ধাৰ্কে চিমনিটার ভেতরে ঢোকাতে গিয়েই চামড়া এমন বিচ্ছিরিভাবে গুটিয়ে গেছে।
আর মৃতদেহটার মুখ জুড়ে বেশ কয়েকটা গভীর কাটা দাগ। গলায় কালসিটে পড়ে রয়েছে। আর তাতে নখের ক্ষত, গভীর ক্ষত। মৃত–মেয়েটাকে যে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহই রইল না।
এবারের কাজ হলো বাড়িটাতে আবার তল্লাসি চালানো। দীর্ঘসময় ধরে সশস্ত্র পুলিশ আর বহিরাগতরা তন্নতন্ন করে বাড়িটার সর্বত্র, এমনকি আনাচে-কানাচে পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও সম্পূর্ণরূপে হতাশ হতে হলো।
ঘরগুলোতে তল্লাসি চালিয়ে হতাশ হয়ে পুরো দলটা এবার ভেতর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে খোঁজাখুঁজিতে মেতে গেল।
বাড়িটার পিছন দিকে এক ফালি ফাঁকা জায়গা। শান-বাঁধানো চত্বর। ছোট একটা ওঠোনও বলা চলে। সেখানে পৌঁছে কোণের দিকে ঘাড় ঘুরাতেই দেখা গেল, একটা মৃতদেহ। বৃদ্ধ মহিলার মৃতদেহ।
মৃতদেহটা থেকে গলাটাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই মনে হলো। তবে ঘাড়ের সঙ্গে লেগে রয়েছে।
মৃতদেহটাকে সামান্য উঁচু করতেই মাথাটা দুম করে পড়ে গেল। সেটাকে প্রথম দর্শনেই সবাই সর্বাঙ্গে অস্বাভাবিক কল্পনা অনুভব করল। মৃতদেহটা যে কী ভয়ঙ্কর রীতিমত বীভৎস হয়ে পড়েছে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। শুধু মাথাই কেবল নয়, সারাটা দেহই অস্বাভাবিক রকম ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বীভৎস হয়ে পড়েছে তার দেহটা। এমনই বিকৃত হয়ে পড়েছে যে, মানুষের দেহ বলে না দিলে কিছুতেই বুঝার উপায়ই নেই। উফ্! কোন মানুষের দেহ যে এমন ভয়ঙ্কর দর্শন হতে পারে, ভাবাই যায় না।
বহু খোঁজ খবর নেওয়ার পরও ভয়ঙ্কর সে রহস্যটা ভেদ করার মতো তিলমাত্র সূত্রও খুঁজে পাওয়া গেল না।
ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই থেমে থাকল না। পরদিন ভোরের খবরের কাগজে ফলাও করে এসব অতিরিক্ত বিবরণ ছাপা হলো।
রুমর্গের শোকসন্তপ্ত ঘটনা। এ ভয়ঙ্কর ও অদ্ভুত ঘটনাটার ব্যাপারে আরও বহু লোককে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু সর্বত্রই হতাশ হতে হলো।
অত্যক্তৃত রহস্যটা ভেদ করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রই পাওয়া গেল না। তবে তদন্ত করতে গিয়ে যেসব সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করা সম্ভব হয়েছে সেগুলোকে একের পর এক নিচে উল্লেখ করছি–
পলিন দুবুর্গ, লন্ড্রির মালিক নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন–মৃত দুজনকেই তিনি চেনেন। গত তিন বছর যাবৎ তাদের সঙ্গে তার পরিচয়। এ সময়ে তিনি তাদের যাবতীয় পোশাক পরিচ্ছদ ধোলাই করেছেন। এ-সুবাদে তাদের মধ্যে পরিচয় খাতির যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতরই হয়েছে।
