মুহূর্তের জন্য নীরব থেকে বন্ধুবর আবার মুখ খুললেন একটা কথা কি জানেন? পরমাণুর কথা আর এপিকিউরাসের মতবাদ সম্বন্ধে কথা আগেই জানা না থাকলে আপনার মুখ দিয়ে তো কিছুতেই স্টিরিওয়টসি কথাটা বেরোবার কথা নয়।
আর একটা কথা, এই তো মাত্র কয়দিন আগেই আমি আপনাকে বলেছিলাম, এ বিখ্যাত গ্রিক পণ্ডিতের অনুমানটা অস্পষ্ট হলেও সেটা কী অত্যাশ্চর্যভাবে অধুনা নীহারিকা তত্ত্বের তত্ত্ব কর্তৃক বিশেষভাবে সমর্থন লাভ করেছে।
আর ঠিক তখনই আপনি যে ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলির নীহারিকার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবেন, সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম।
আমি সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলাম—
আপনি নিঃসন্দেহ ছিলেন?
অবশ্যই। আপনি কিন্তু কার্যতও তাই করেছিলেন, নক্ষত্রমণ্ডলির নীহারিকার দিকে তাকিয়েও ছিলেন। ঠিক কি না?
আমি নিঃসঙ্কোচে তার কথার জবাব দিলাম–তা আর অস্বীকার করিই বা কি করে?
মি. দুপঁ পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললেন–যাক গে, যে কথা বলছিলাম–আপনার চিন্তার প্রতিটা পদক্ষেপ আমি সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করে চলছিলাম। কিন্তু গতকাল চাতিলি যে মিউজি পত্রিকায় তিক্ত সমালোচনা করেছেন, সে ব্যাপারে মুচি মশাই অভিনয় করার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে নিজের নামটাও যে পাল্টে ছিল, কিছুটা অসম্মানজনকভাবে সে কথা বলতে গিয়ে একটা লাতিন উক্তির সাহায্য নিয়েছেন। আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি, সে উক্তিটায় রিয়া-এর কথাই ব্যকত করা হয়েছে।
আমি নীরবে ম্লান হাসলাম।
সঁসিয়ে দুঁপ বলেই চললেন–খুবই সত্য কথা যে, আপনি চাতিলি আর ওরিয়ন শব্দ দুটো আপনার অন্তরের অন্তঃস্থলে একই সঙ্গে ভেবে উঠতে বাধ্য। কার্যত হলও তা-ই।
আমি ভ্রূ দুটো কুঁচকে বললাম–কিন্তু মি. দুপঁ, আমার মনের কথা আপনি এমন করে।
আমাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে মি. দুপঁ বলে উঠলেন–আপনার ঠোঁটের কোণে ফুটে-ওঠা হাসির ছাপটুকুই আমাকে এরকমটা ভাবতে সাহায্য করেছে। শব্দ দুটো একই সঙ্গে আপনার অন্তরের অন্তঃস্থলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। পনি বেচারা মুচিটার আত্মনিবেদনের কথা ভেবেই এক সার হচ্ছিলেন।
আর কিছু?
আর? এতক্ষণ লক্ষ্য করছিলাম, আপনি সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকেই হাঁটছিলেন। আর এখন দেখছি রীতিমত সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এতেই আমি সন্দেহ হয়ে পড়লাম যে, চাঁতিলির বেটেখাট চেহারার মানুষটার কথাই আপনার মাথায় পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে। ঠিক তখনই আমি আপনার চিন্তার ছেদ ঘটিয়ে বলে উঠলাম– এ চাতিলি লোকটা খুবই বেঁটেখাটো হওয়ায় থিয়েতের দ্য ভারায়েতেস-এ খুবই ভালো অভিনয় করতে পারত। আর মানাতও দারুণ।
এবার গেছেৎ দ্য ব্রাইকনোর একটা সান্ধ্য পত্রিকা পড়তে পড়তে নিচের অনুচ্ছেদটার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল–
হত্যাকাণ্ড!
ভয়ঙ্কর এক হত্যাকাণ্ড! আজ সকালেরই কথা। আজ রাত তিনটির কাছাকাছি পর পর তিন তিনটি ভয়ঙ্কর আর্তস্বর শোনা গেল। বিকট আর্তস্বর শুনে মাৎ-রোচ নগরের বাসিন্দাদের ঘুম চটে গেল। অনুমানে বুঝা গেল, রু মর্গ-এর একটা সুবিশাল বাড়ির চার তলার একটা ঘর থেকে আর্তস্বরটা ভেসে আসছে।
যে ঘরটায় কেবলমাত্র মাদাম ল এম্পালয়ে আর তার মেয়ে সাদামোয়াজেল ক্যাসিল ল এস্পালয়ের।
আর্তস্বরটা শোনার পর প্রতিবেশীরা ছুটাছুটি করে গিয়ে কিছুতেই বাড়িটার ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। স্বাভাবিক পথে ভেতরে ঢোকার জন্য সাধ্যাতীত প্রয়াস চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে তারা কিছুটা দেরি হয়ে গেলেও এবার ছুটাছুটি করে শাবল, হাতুড়ি আর গাঁইতি দিয়ে দমাদম ঘা মেরে সদর দরজাটা ভেঙে ফেলল। শেষপর্যন্ত দুজন সশস্ত্র পুলিশকে নিয়ে আটজন প্রতিবেশী হন্তদন্ত হয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গেল।
ইতিমধ্যে আর্তনাদ থেমে গেছে। তবে তারা ব্যস্তপায়ে সিঁড়ি বেয়ে প্রথমের দিকের ধাপগুলো অতিক্রম করার সময় দু বা তার চেয়ে বেশি ক্রোধান্বিত মোটা গলা তাদের কানে এলো। মোটা গলায় তারা যেন অনবরত বকাবকি করেই চলেছে।
তারা উত্তর্ণ হয়ে ওই কণ্ঠস্বরগুলো সম্বন্ধে ধারণা করে নেবার চেষ্টা করল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে লক্ষ্য করার পর তারা অনুমান করল, এ বাড়িটা থেকেই মোটা কুদ্ধ স্বরগুলো ভেসে আসছে।
তারা আরও ব্যস্তভাবে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল। প্রথম ধাপটা অতিক্রম করে তারা দ্বিতীয় চাতালটায় পা দিতে না দিতেই সে সব ক্রুদ্ধস্বরও থেমে, মিলিয়ে গেল। ব্যস, সব চুপচাপ, একেবারে শুনশান।
এবার সশস্ত্র পুলিশসহ প্রবেশকারী দলটা উদ্রান্তের মতো এ-ঘর ও-ঘর অনবরত ছুটাছুটি দাপাদাপি করতে লাগল।
সবাই ছুটাছুটি করে চারতলার পিছনের দিককার একটা ঘরের দরজার সামনে পৌঁছে দেখল, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। বারকয়েক ধাক্কাধাক্কি করে কোনো ফল না পেয়ে শাবল আর হাতুড়ির ঘা মেরে মেরে দরজাটা ভেঙে ফেলল।
দরজাটা ভাঙার পরই সবাই হুড় মুড় করে ঘরে ঢুকে গেল। দরজা চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভেতরে পা দিয়েই সবাই আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আকস্মিক আতঙ্কে সবাই যেন হতবাক হয়ে পড়ল।
ঘরগুলো একেবারে তছনছ হয়ে রয়েছে। চারদিকে ভাঙা আসবাবপত্রের ছড়াছড়ি। ঘরে একটা মাত্র খাট, ভাঙা। তার ওপরকার বিছানাপত্র ঘরময় ছড়ানো ছিটানো।
আর দুপা এগিয়ে ঘরটার প্রায় কোণার দিকে চোখ পড়তেই সবার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কাৎ হয়ে পড়ে থাকা একটা চেয়ারের ওপরে রক্তমাখা একটা ক্ষুর। টকটকে লাল টাটকা রক্ত।
