আমি তার বক্তব্য সম্বন্ধে কোনোরকম চিন্তা-ভাবনা না করেই বলে উঠলাম– অবশ্যই। সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।
মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এবার সবিস্ময়ে বললাম–দেখুন মি. দুর্প, ব্যাপারটা সম্পূর্ণরূপে আমার জ্ঞান-বুদ্ধি বহির্ভূত। আমি নিঃসঙ্কোচেই বলছি, আর যারপরনাই অবাক হয়ে গেছি। ভাবছি আমার ইন্দ্রিয়গুলোই কি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। হয়তো বা তাই হয়েছে বন্ধু। একটা কথা ভেবে আমি আরও অবাক হচ্ছি, আমি মনে মনে কি ভাবছি তা আপনি বুঝলেন কী করে?
তিনি ম্লান হেসে বলল–চাতিলির কথা বলছেন তো? আরে, আপনি তো নিজের মনকেই প্রশ্ন করছিলেন, বেঁটেখাট চেহারাটার জন্যই সে বিয়োগান্ত নাটকে একেবারেই বেমানান, ঠিক কি না?
আমি বললাম–আশ্চর্য ব্যাপার তো! হ্যাঁ, আমি সত্যি সত্যি এ ব্যাপারটা নিয়েই গভীরভাবে চিন্তা করছিলাম। সে লোকটা চাতিলি রু স্যাঁৎ ডেমিস-এর এক প্রাক্তন মুচি। দিব্যি জুতা সেলাই করে দিন কাটাচ্ছিল। ব্যস, নাটক থিয়েটারের ভূত চাপল তার মাথায়। ক্রিবিলিয়র লেখা জারাকেসস নামক নাটকটায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করতে মঞ্চে নেমে দর্শকদের গালাগালি কম খায়নি। এক কথায় দর্শকরা তাকে তুলাধূনা করে ছেড়েছে।
এবার আমি প্রায় গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলামআল্লাহর দিব্যি। আমাকে বল, কোন উপায়ে কিভাবে তা সম্ভব হল? তবে হ্যাঁ, যদি কোনো নির্দিষ্ট উপায় থাকে তবেই অবাক হচ্ছি, আপনি কিভাবে এ ব্যাপারটা, মানে আমার মনের কথা জানতে পারলেন, বলুন তো?
মুচকি হেসে বন্ধুবর দুপঁ আমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে বলল–আরে বন্ধু, ওই ফলওয়ালাই তো আপনাকে খোলাখুলি বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মোটামোটা চেহারাধারী জারাকেসসের ভূমিকার অভিনয় করার মতো দৈহিক উচ্চতা সে মুচিটার অবশ্যই নেই। মোদ্দা কথা, এ চরিত্রে সে একেবারেই বেমানান।
কী? কার কথা বলছেন? ফলওয়ালা! আরে ভাই আপনি তো আমাকে রীতিমত অবাক করে দিলেন দেখছি! কোনো ফলওয়ালাকেই আমি চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না! মুহূর্তের জন্য কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে ভেবে আবার বললাম–না, কোনো ফলওয়ালার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে বলে তো কিছুতেই মনে পড়ছে না।
একটু আগেই, পনেরো মিনিট আগেই একটা লোক ছুটতে ছুটতে এসে আপনার গায়ে পড়েছিল, এর মধ্যে ভুলে গেলেন?
হ্যাঁ, তা পড়েছিল বটে।
তবে?
এবার ব্যাপারটা আমার মনে পড়ল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে রুসি থেকে এ সদর রাস্তাটায় ওঠার সময় এক ফলওয়ালা এক ঝুড়ি আপেল মাথায় করে ছুটে যাচ্ছিল। আমার পাশ দিয়ে যাবার সময় এমন জোরে এক ধাক্কা দেয় যে, আমি হুমড়ি খেয়ে পথের ওপর পড়ে যাই।
এই তো বেশ মনে পড়েছে।
সে না হয় হলো, কিন্তু সে ঘটনার সঙ্গে চাতিলির কী সম্পর্ক থাকতে পারে, মাথায় আসছে না তো?
দুপঁ অবান্তর কথার ধার কাছ দিয়েও যায় না। সে ম্লান হেসে বলল–বলছি, সবকিছু খোলসা করেই বলছি; আর পুরো ব্যাপারটা যাতে আপনি ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন সে জন্যই আমাদের উভয়ের আলোচনার গোড়া থেকেই, মানে ফলওয়ালার সঙ্গে আপনার ধাক্কা লাগা ও পড়ে যাওয়া পর্যন্ত আপনার চিন্তার সম্পূর্ণ ধারাটাই আমি একের পর এক বলছি। শুনুন, এ চিন্তার বড় বড় গাঁটগুলো হচ্ছে, চাতিলি, ওচিয়ন, ড. নিক ল্স, এপিকিউরাস, স্পিরিও টমি, পথে ছড়িয়ে পড়ে থাকা পাথর আর ফলওয়ালা।
আমি তার বক্তব্য শুনে বললাম–হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন মি. দুঁপ।
বন্ধুর দু আবার বলতে লাগল–আমার যেটুকু মনে পড়ছে, রুসি ছেড়ে আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমরা ঘোড়ার আলোচনায় মগ্ন ছিলাম। ঘোড়ার ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আমাদের আলোচনা জোর জমে উঠেছিল। আর আমাদের আলোচনার শেষ বিষয়বস্তু। তারপরই আমরা রাস্তাটা অতিক্রম করার উদ্যোগ নিলাম। ঠিক সে মুহূর্তেই এক ফলওয়ালা তার ফলভর্তি ঝুড়িটা মাথায় নিয়ে ছুটতে ছুটেতে আপনার গা-ঘেঁষে চলে যাওয়ার সময় আচমকা আপনাকে এমন জোরে একটা ধাক্কা মারল যে, আপনি টাল সামলাতে না পেরে প্রায় পথের ওপর পড়ে থাকা পাথরের ঢিবির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
একটা পাথরের টুকরোয় পড়ে আপনার পা হড়কে যায়। আপনি পায়ে চোট পেলেন। পায়ের কবজিটা মচকে যায়। আপনি মুখ বিকৃত করে প্রায় ফিসফিসিয়ে কি যেন বললেন, কিছুই বুঝতে পারলাম না। আপনি বিতৃষ্ণাভরে পাথরের ঢিবিটার দিকে তাকালেন। আবারও বিড়বিড় করে কি যেন বললেন। পর মুহূর্তেই আবার হাঁটা জুড়লেন।
তবে এও সত্য যে তখন আমি যে সবকিছু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম তা-ও সত্য নয়। আসলে ইদানিং সবকিছুকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেও কোনো ব্যাপারেই উদাসিন থাকতে পারি না।
হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম বন্ধুবর দুপঁ আবার বলতে লাগল–তখন আপনি মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে। চোখে-মুখে জমাটবাধা বিরক্তির ছাপ এঁকে আপনি বার বার রাস্তাটার ছোট বড় গর্তগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন।
আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম। আগের মতোই পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আমরা হাঁটতে লাগলাম। এক সময় আমরা লামটিন নামক গলিটায় হাজির হলাম, গলিটা চমৎকারভাবে পাথরে বাঁধানো। তখন আপনার মুখটা জ্বল জ্বল করে উঠল। আপনাকে প্রায় অস্ফুটস্বরে ঠোঁট নাড়তে দেখে আমি ভাবলাম, আপনি নির্ঘাৎ স্টিরিওটমি কথাটাই বার বার উচ্চারণ করে চলেরছন। এ রকমভাবে বাঁধানো রাস্তাঘাটের এ নামকরণই করা হয়।
