আমাদের নির্জর-নিরালা অট্টলিকায় বাস সম্পূর্ণ নিখুঁত। আমরাই নিজেদের নিয়ে মেতে থাকতাম। আমাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করার জন্য কোনো অতিথি অভ্যাগতরই পদচিহ্ন পড়ত না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদেরনির্জনতায় জীবন যাপনের কথা আমাদের পরিচিতজনদের কাছ খুবই সতর্কতার সঙ্গে গোপন রেখেছিলাম।
আরও আছে, বহুকাল আগে থেকেই মি. দুপঁ প্যারিসের যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে, সবার কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আবার অন্যভাবেও বলা যেতে পারে, প্যারিসের মানুষরাও এখন আর তার খোঁজখবর নেয় না।
তারা যেন তাকে মন থেকে ঝেড়ে-মুছে ফেলে দিয়েছে। ফলে আমরা সে বাড়িটায় পুরোপুরি নির্জন-বাসের মধ্য দিয়ে দিন গুজরান করতে লাগলাম।
এদিকে আমার নতুন বন্ধুবর তো নিজের মেজাজ মর্জি মাফিক এখানকার রাত নিয়ে পুরোপুরি মজে গেল। আর তার অন্য সব খেয়ালের মতোই আমি নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে তার খপ্পরে পড়ে গিয়ে তার অদ্ভুত সব খেয়ালের মধ্যেই ডুবে গেলাম।
তবে এও সত্য যে, অভাবনীয় সে অন্ধকার যে আমাদের প্রতিনিয়ত ঘিরে রাখছে এমন কথাও বলা যাবে না। কিন্তু আমরা কখন-সখন প্রয়োজনবোধে সকল অন্ধকারময় পরিস্থিতি তৈরি করে নিতেও ছাড়িনি।
প্রথমদিনের ভোরের কথা বলছি। পুব-আকাশে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে আমরা দুজনে মিলে জরাজীর্ণ বাড়িটার জানালা-দরজাগুলো দমাদম বন্ধ করে দিলাম। আর ঘরের ভেতরে তীব্র গন্ধযুক্ত দুটো মোমবাতি জ্বেলে আমাদের কাজকর্ম ও চলাফেরার ব্যবস্থা করে নিলাম। আর সে দুটো থেকে কেবলমাত্র ভৌতিক ক্ষীণ আলোর রেখা বেরোতে লাগল। আমাদের বাঞ্ছিত, স্বাভাবিক আলো কিছুতেই পেলাম না।
সেই ক্ষীণ আলোর রেখা সম্বল করেই আমরা যেন স্বপ্নপুরীর বাসিন্দাদের মতো লেখালেখি, পড়াশুনা আর অত্যাবশ্যক কাজকর্ম অব্যাহত রাখলাম।
ঘড়িটা যতক্ষণ আমাদের প্রকৃত অন্ধকারের আগমনবার্তা না জানিয়ে দেয় ততক্ষণ আমরা মোমবাতির ক্ষীণ আলোর রেখার মধ্যে এভাবেই কাজকর্ম চালিয়ে যেতে লাগলাম।
অন্ধকার নেমে এলেই আমরা দুজন তখন চার দেওয়ালের সীমানা ছেড়ে পরস্পরের হাত ধরাধরি করে পথে নেমে পড়ি, দিনের আলোচনার জের চালিয়ে যাই। আর সে জনাকীর্ণ নগরটার কখনও উজ্জ্বল আলো আবার কখনও বা ছায়ায় ঢাকা পথ দিয়ে বহু দূরবর্তী অঞ্চল দিয়ে ঘোরাঘুরির মাধ্যমে মানসিক উত্তেজনার অসীমতার খোঁজ করি যা কেবলমাত্র শান্ত পর্যবেক্ষণের পথেই পাওয়া সম্ভব। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঝে-মাঝে বহু দূরবর্তী অঞ্চলে চলে যাই।
আমরা যখন হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যাই তখন আমার নতুন বন্ধু দুঁপের মধ্যে বিশ্লেষণশক্তির একটা বিশেষ গুণ আমার নজরে পড়ে। আর এ-গুণ চোখের সামনে দেখে আমি পঞ্চমুখে প্রশংসা না করে পারি না। সত্যি কথা বলতে কি, সে অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
আমার বন্ধুবর দুঁপের সঙ্গে মেলামেশা করে আমি তার সম্বন্ধে যে ধারণাটুকু করেছি তা হচ্ছে, তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা লোক-দেখানো না হলেও অন্তত অনুশীলনের তার আগ্রহ যথেষ্টই রয়েছি। আর এ-কাজে সে যে নির্ভেজাল আনন্দ লাভ করে, সে কথা নির্দিষ্কাতেই আমার কাছে ব্যক্ত করে। সে বরং সম্পূর্ণ নিঃসঙ্কোচে আমাকে বলে–শুনুন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই তার সম্বন্ধে অন্তরের অন্তঃস্থলে একটা জানালা উন্মুক্ত রাখে। আর তারা যে আমার সম্বন্ধে অনেক কিছুই অবগত আছে সেটাকে সোজাসুজি আর খোলসাভাবেই ব্যক্ত করতেই অভ্যস্ত। সে-সব মুহূর্তে তার কথাবার্তা চালচলন নির্জীব হয়ে ওঠে। তার চোখ দুটো শূন্য দৃষ্টি হয়ে ওঠে। কিন্তু তার গলা রীতিমত পঞ্চমে চড়ে যায়। এ মুহূর্তে তার অবস্থা দেখে আমার প্রায়ই দ্বৈতসত্তার দার্শনিক তত্ত্বের কথা মনে পড়ে যায়।
আমি কল্পনা করি, বন্ধুবর দুঁপের মধ্যে দুটো মন বাস করছে। তাদের একটা বিশ্লেষণধর্মী আর অন্যটি সৃষ্টিধর্মী।
আমি এ পর্যন্ত যা-কিছু বলেছি, তাতে করে আপনারা কিন্তু ভুলেও ভাববেন না যে, আমি আপনাদের সামনে কোনো রোমাঞ্চকর বা রহস্যের মোড়কে মোড়া কোনো কাহিনী তুলে ধরার মতলবে আছি। আমি ফরাসি বন্ধুর কথা যা-কিছু বলেছি তা হয়তো বা রোগগ্রস্ত মেধাশক্তি, নতুবা উত্তেজনার ফলশ্রুতি ছাড়া কিছু নয়। তবে তার তখনকার কথাবার্তার ধরন-ধারণ একটা উদাহরণের সাহায্যে সম্যক উপলব্ধি করা যাবে।
প্যালেস রয়েলের অদূরবর্তী একটা নোংরা পথ দিয়ে এক রাতে আমরা দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিলাম। তখন আমরা উভয়েই নিজের নিজের ভাবনা-চিন্তা নিয়ে এতই আত্মমগ্ন ছিলাম যে, কেউ কারো সঙ্গে কোনো কথাই বলিনি। আসলে আমাদের কারোই কিছু বলার মতো মানসিক পরিস্থিতি ছিল না।
আরও কিছুটা পথ এগিয়ে আমার সহযাত্রী-বন্ধু দুপঁ হঠাৎ বলে উঠল–বেটেখাট লোকটা সম্বন্ধে তোমার কী ধারণা, বল তো?
আমি চিন্তার জগৎ থেকে অকস্মাৎ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসে নীরবে জিজ্ঞাসুদৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে না পারায় মুখ বুজে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।
সে আমার জিজ্ঞাসা দূর করতে গিয়ে বলল–বলছি কি, খুবই বেঁটেখাট এ লোকটা থিয়ের দ্য ভ্যারায়েতস-এ চলে গেলে সে অনেক ভালো কিছু করতে পারত, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।
