হুইস্ট খেলায় যে সুদক্ষ জীবনের অন্য যেসব পরিস্থিতিতে মনের সঙ্গে মনের দ্বন্দ্ব চলে, সে ক্ষেত্রেও জয়মাল্য লাভের হিম্মত তার আছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, হুইস্ট খেলায় সুদক্ষ বলতে কি বুঝায়? আমার মতে, সুদক্ষ হচ্ছে সেই পূর্ণতা, ন্যায়সঙ্গত সুবিধা লাভের যাবতীয় উৎস যেখানে করায়ও। সে উৎস বলতে কেবলমাত্র বহু সংখ্যক নয়। বিভিন্ন ধরনেরও বটে। সাধারণত অন্তরের অন্তরতম কোণে যেগুলো সঞ্চিত থাকে, সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিতার ধারে কাছেও যেতে পারে না।
একটা কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, সহজ-সরল বুদ্ধি আর বিশ্লেষণাত্মক শক্তিকে একটা দাঁড়িপাল্লায় ফেলে বিচার করা উচিত নয়। তবে তো উভয়কে গুলিয়ে ফেলাই হবে। কারণ যে ব্যক্তি বিশ্লেষক তাকে তো অবশ্যই বুদ্ধির অধিকারী হতেই হবে।
এমনও তো হতে পারে, একজন বুদ্ধিমান মানুষ বিশ্লেষণের ব্যাপার স্যাপারে নিতান্তই অক্ষম হতে পারে।
বিশ্লেষণ ক্ষমতা আর বুদ্ধিমত্তার যে পার্থক্য তা কল্পনার পার্থক্যের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি। উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও কল্পনার পার্থক্যের চেয়ে অনেক বেশি পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে যা দেখা যায়, সত্যিকারের কল্পনাশক্তিসম্পন্ন মানুষ কোন অবস্থাতেই বিশ্লেষক ভিন্ন অন্য কিছু হয় না।
উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে যে কাহিনীর উল্লেখ করছি, তা যথোপযুক্ত হবে বলেই আমি মনে করছি।
আঠারো–সালের বসন্ত আর গ্রীষ্মের অংশবিশেষ, আমি প্যারিসে কাটিয়েছিলাম। তখন যেখানে বসবাসকালে মি. সি. অগাস্ত দুর্পর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আর সে পরিচয় ক্রমে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়ে ওঠে।
মি. দুপঁ এক সুপ্রতিষ্ঠিত পরিবারের যুবক ছিল।
এক সময় মি. দুপঁ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির চাপে পড়ে দারিদ্রের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। আর দারিদ্রের নিষ্ঠুর আঘাতে আঘাতে তার চারিত্রিক শক্তি চাপা পড়ে যায়। ক্রমে সে মনের দিক থেকে এতই ভেঙে পড়ে যে, বাইরের জগতের সঙ্গে মেলামেশা অথবা খোয়া-যাওয়া পৈত্রিক সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করার ব্যাপারে পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিয়েছিল।
তবে উত্তমর্ণের সহানুভূতি ও উদার মানসিকতার দৌলতে পৈত্রিক সম্পত্তির কিঞ্চিৎ তখনও তার দখলে ছিল। তা থেকে যৎসামান্য যা-কিছু আয় হতো তা থেকেই কোনোরকমে বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যক সামগ্রি সংগ্রহ করে দিন গুজরান করত। অবান্তর ব্যাপার স্যাপার নিয়ে সে মোটেই মাথা ঘামাত না না।
মি. দুঁপের একমাত্র বিলাসিতা বলতে ছিল, পুঁথিপত্র সংগ্রহ করা। আর তা প্যারিস শহরে সহজেই সংগ্রহ করা যায়। ব্যস, এ ছাড়া অন্য কোনো বস্তুর দিকে তার। কিছুমাত্র ঝোঁকও ছিল না।
মি. সি. আগস্ত দুঁপের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা, পরিচয় হয় একটা অখ্যাত গ্রন্থাগারে। সেটা রুম মর্তার নামক অঞ্চলে অবস্থিত। আর পরিচয়ের সূত্রটাও ছিল অত্যাশ্চর্য। ঘটনাচক্রে আমরা উভয়েই খুবই নামকরা এবং দুপ্রাপ্য একটা বইয়ের খোঁজ করছিলাম। সে উপলক্ষ্যেই আমাদের মধ্যে পরিচয় ঘটে। দীর্ঘসময় ধরে উভয়ের মধ্যে কথাবার্তা হয়। তার পরই ক্রমে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে।
প্রথম পরিচয়ের পর থেকে আমাদের মধ্যে ঘন ঘন দেখা হতে লাগল।
ফরাসিদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নিজের সম্বন্ধে, নিজের পরিবার সম্বন্ধে কথা বলার ব্যাপারে তারা যারপরনাই উৎসাহবোধ করে। সে-ও ঠিক একই রকমভাবে আমাকে তার পরিবারের ইতিকথা গল্পাকারে শুনিয়েছিল। আমিও খুবই আগ্রহের সঙ্গে, ধরতে গেলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথাগুলো শুনেছিলাম।
মি. দুঁপের পরাশুনার ব্যাপকতা আমাকে কেবল বিস্মিতই নয়, মুগ্ধও কম করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, তার কল্পনার উচ্ছ্বাসে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
আমি ভেতরে ভেতরে খুশিই হয়েছিলাম, তখন পারিসে যে সব বস্তু হন্যে হয়ে খুঁজে বেরিয়েছি, সে দিক থেকে চিন্তা করলে এরকম একজনের সান্নিধ্য লাভ করায় আমি এমনই খুশি হয়েছিলাম যে, এক বহুমূল্য সম্পদ যেন আমার হস্তগত হয়েছে। একদিন গল্পচ্ছলে কথাটা খোলাখুলি বলেই ফেলেছিলাম।
আমরা কথাবার্তার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যতদিন সেখানে থাকব ততদিন আমরা দুজন এক সঙ্গেই বাস করব।
আমার সাংসারিক অবস্থা তার চেয়ে কিছুটা অন্তত কম বিপন্ন, তার চেয়ে আমি কম বিধ্বস্ত হওয়ার জন্য বাড়ি ভাড়া করা আর আমাদের বিচিত্র মেজাজ মর্জি অনুযায়ী তার ব্যবহার উপযোগি আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করার দায়িত্বটা আমার ওপরেই বর্তে গেল।
অদ্ভুত ধরনের পুরনো, একেবারেই জীর্ণ একটা বাড়ি আমি ভাড়া করলাম। বাড়ি না বলে সেটাকে অট্টালিকা বললেই যথাযথ বলা হবে। কুসংস্কারের জন্য বাড়িটা দীর্ঘদিন যাবৎ যে কেন পরিত্যক্ত, সে খোঁজ খবরও আমরা নিলাম না।
তাছাড়া কাল-জীর্ণ প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে অট্টলিকাটা কুবুর্গ স্যাঁত জার্মেনের একনির্জন নিরালা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।
যা-ই হোক, কাল-জীর্ণ অট্টলিকাটায় আমরা ছকবাঁধা জীবননির্বাহ করতে লাগলাম। আর সেখানে জীবনযাত্রা নির্বাহের বিবরণ যদি এ পৃথিবীর মানুষ জানতে পারত তবে সবাই আমাদের নির্ঘাৎ পাগল জ্ঞান করত। তবে এমন পাগল যারা কারও কিছুমাত্রও অনিষ্ট করে না।
