ডাক্তার দুজন তার মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। এক সময় উভয়ে প্রায় সমস্বরেই বললেন–মৃত্যু পর্যন্ত মি. ভালডিমারের এ প্রশান্ত অবস্থানে অব্যাহত রাখা হোক। ঠিক এমনই প্রশান্ত অবস্থার মধ্যে থাকুন।
আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম–হুম!
তারা এবার বললেন–মৃত্যুক্ষণ আসতে নাকি আর তেমন দেরি নেই। আমাদেরও মনে হচ্ছে খুব বেশি হলেও তিনি আর মিনিট কয়েক টিকে থাকবেন।
আমি আগের সে প্রশ্নটাই বন্ধুকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম।
আমি প্রশ্নটা শেষ করতে-না-করতেই তার মুখমণ্ডলে অভূতপূর্ব, একেবারেই অত্যাশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
আমি অনুসন্ধিসু দৃষ্টিতে তার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থেকে আকষ্মিক পরিবর্তনটুকুর দিকে নজর রাখতে লাগলাম। দেখলাম, তার চক্ষুগোলক ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে গেল। এ জন্যই চোখের মণি আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। গায়ের চামড়া যেন সাদা চকের মতো বিবর্ণ হয়ে গেল। হঠাৎই জ্বরভাবযুক্ত উত্তপ্ত গোলাকার দাগ দুটো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। নিভে গেল।
নিভে গেল কথাটা বিশেষ কারণবশত ব্যবহার করতেই হলো। মনে হলো, জ্বলন্ত মোমবাতির মতোই কোনো অদৃশ্য শক্তি ফুঁ দিয়ে হঠাৎ নিভিয়ে দিয়েছে।
একটু আগেও ওপরের ঠোঁটটা নিচের দিকে ঝুলে থাকার জন্য দাঁতগুলো চাপা পড়েছিল। দেখা যাচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ অস্বাভাবিক কাঁপতে কাঁপতে ঠোঁটটা ওপরের দিকে উঠে গেল। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যেই দাঁতের পাটি আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল, আরও প্রকট হয়ে দেখা দিল কালচে হয়ে ওঠা জিভটা। তখন ঘরে যারা উপস্থিত ছিলেন সবাই মৃত্যুর দৃশ্য ইতিপূর্বে বহুবারই প্রত্যক্ষ করেছেন, তবু আমার বন্ধুবর ভালডিমারের তখনকার পরিস্থিতি তার অস্বাভাবিক মুখমণ্ডলটা দেখামাত্র চমকে উঠলেন। ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে সবাই তার বিছানা থেকে হঠাৎ পিছিয়ে না গিয়ে পারলেন না।
আমার বিশ্বাস, আমার বক্তব্যে পাঠক-পাঠিকার মনে অবিশ্বাস জন্মাচ্ছে। এ রকম কথায় অবিশ্বাস জন্মানোর কথাই বটে। তবু সেদিন যা-কিছু ঘটেছিল আমি একটা কথা বাদ না দিয়ে হুবহু তা-ই বলব।
আমরা, বিশেষ করে উপস্থিত ডাক্তার দুজন আমার বন্ধু ভালডিমারের মধ্যে প্রাণের আর সামান্যতম লক্ষণও দেখতে না পেয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতেই হলো সে মারাই গেছেন।
তার মৃত্যু হয়েছে এরকম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমরা সবাই আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়ে তার দেখভালের দায়িত্ব নার্স দুজনের ওপরই ছেড়ে দিলাম। ঠিক সে মুহূর্তেই তার জিভটা অস্বাভাবিক রকম কেঁপে উঠল। পুরো একটা মিনিট ধরে একইভাবে কাটল।
এবার তার মুখবিবরটা পুরোপুরি খুলে একেবারে হাঁ হয়ে গেল। হাঁ হয়ে থাকা চোয়ালের ফাঁক দিয়ে এমন এক বুক-কাঁপানো কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এলো যাকে ভাষায় প্রকাশ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। স্বরটা অভাবনীয় কর্কশ, ভাঙা-ভাঙা এবং রীতিমত শূন্যগর্ভ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বীভৎস ছাড়া সে স্বরটাকে বীভৎস বা অবর্ণনীয় ছাড়া অন্য কোনোভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সত্যি, কোনো মানুষ কোনোদিনই এমন ভয়ঙ্কর শব্দ অবশ্যই শোনেনি।
আর ভয়ঙ্কর সে শব্দটা যে অপার্থিব, এতে কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। অপার্থিব বলছি এ কারণেই যে, অন্তত আমার যা মনে হয়েছিল তা-ই ব্যক্ত করলাম। প্রথমত শব্দটা যেন বহু, বহু দূরবর্তী উৎস থেকে বেরিয়ে এসেছে। আর দ্বিতীয়ত তা আঠালো বস্তুর মতোই রীতিমত চটচটে।
এতক্ষণ কণ্ঠস্বর আর শব্দর ভয়ঙ্করতার কথাই বললাম। এবার সে পরিস্থিতিটার কথা আরও একটু খোলসা করে বলছি–যাকে শব্দ বলছি তাকে শব্দাংশ বলাই উচিত। কারণ শব্দটা শুরু হবার পর হঠাৎ যেন মাঝপথে থেমে গিয়েছিল।
মাত্র কয়েক মিনিট আগে আমি বন্ধু ভালডিমারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে ঘুমোচ্ছে কি না।
আমার প্রশ্নটার উত্তর সে যা দিয়েছিল, তা এরকম- হ্যাঁ, হ্যাঁ, না, ঘুমোচ্ছিলাম বটে। এখন মরতে চলেছি।
সে আমার প্রশ্নটার উত্তর যেরকম ভয়ঙ্কর স্বরে দিয়েছিল, তা কানে যাওয়া মাত্র আমার বুকের ভেতরে কেবলমাত্র ধড়াস করেই উঠেছিল তা নয়, গায়ের সবগুলো নোম একই সঙ্গে খাড়া হয়ে উঠেছিল। সত্যি কোনো শব্দ যে এরকম ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক হতে পারে, বার বার কেটে কেটে বেরোতে পারে খুব বেশি রকম দুঃস্বপ্নেও কেউ তা কল্পনাও করতে পারবে না। অতএব গায়ে যে কাঁটা দিয়েছিল তা কারো পক্ষে অস্বীকার করার কথা নয়।
ভয়ঙ্কর শব্দটা কানে যাওয়ামাত্র ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্র মি. এল মুহূর্তে সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পরিস্থিতির মোকাবেলা করা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে নার্স দুজন কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ঘর ছেড়ে যাবার পর তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
সে মুহূর্তে আমার অবস্থা যে কেমন খারাপ হয়ে পড়েছিল তা চেপে রেখে পাঠক পাঠিকাকে ধন্ধের মধ্যে রাখা আদৌ আমার ইচ্ছে নয়।
সত্যি বলছি, তখন আমার জ্ঞান-বুদ্ধি যেন একেবারেই ভোতা হয়ে গিয়েছিল। যাকে বলে পুরোপুরি লোপ পেয়ে গিয়েছিল। ঘণ্টাখানেক কারো মুখে টু-শব্দটিও ছিল না। আসলে কথা বলার ক্ষমতাই যেন ছিল না।
