আমি তার চোখের ক্রমপরিবর্তনটুকু স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আর লক্ষ্য করলাম, ঘুমের ঘোরে যারা হাঁটাচলা করে তাদের চোখের সাদা অংশটুকুতে যেমন অন্তর্মুখিত প্রকাশ পায় ঠিক সেরকমই ভাব তার চোখে প্রকট হয়ে উঠল।
এবার দ্রুত হস্তচালনা করতে শুরু করলাম। করলামও বার কয়েক।
ব্যস, তার চোখের পাতা তির তির করে কেপে উঠল। দু-তিনবার কাঁপা কাঁপির পরই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে গেল। দুটো চোখই এবার বন্ধ রইল।
আমি এতেও সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। ফলে আবারও হস্তাচালনা শুরু করলাম। বার কয়েক হস্তচালনা করে আর ইচ্ছাশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে খাঁটিয়ে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শক্ত আর সহজ-সরল করে আনলাম। এতে অবশ্য আমাকে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে।
ভালডিমার এবার দুহাত আর পরা দুটো টান টান করে বিছানার ওপর ছড়িয়ে দিল। আর মাথাটাকে সামান্য উঁচু করে সে স্থির হয়ে রইল।
তখন মাঝরাত। ঘরে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অনুরোধ করলাম। আপনারা বন্ধু ভালডিমারের শরীরিক অবস্থা ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, দেখে নিন, এখন এ। সম্পূর্ণরূপে সম্মোহিত।
রোগীর ক্রমপরিবর্তন লক্ষ্য করে ডাক্তার ডি-র মধ্যে প্রবল উত্তেজনা দেখ দিল না। তিনি ব্যাপারটাতে খুবই আগ্রহান্বিত হয়ে পড়লেন। তিনি এবার মুখ খুললেন–আমি ব্যাপারটায় খুবই উৎসাহ বোধ করছি।
আমি নীরবে মুচকি হেসে বললাম খুবই আনন্দের কথা! এতে আপত্তির কোনো কারণই থাকতে পারে না।
ডক্টর এফ বললেন–আমার ইচ্ছা থাকলেও থাকা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি কাজ থাকলে অবশ্যই বাকি রাতটুকু এখানেই কাটিয়ে যেতাম। তবে কথা দিচ্ছি, ভোর হলেই চলে আসব।
ডক্টর এফ বিদায় নিয়ে বাড়ি গেলেন।
ডক্টর ডি আর নার্স দুজন ঘরে রয়ে গেলেন।
বন্ধুবর ভালডিমারকে একই রকমভাবে রাত তিনটি পর্যন্ত রেখে দিলাম। অর্থাৎ ডক্টর এফ বিদায় নিয়ে ঘর ছেড়ে যাবার সময় তার যে রকম অবস্থা দেখে গিয়েছিলেন ঠিক সেরকমই তাকে রেখে দিলাম।
এবার তার অবস্থা এমন হয়ে এলো যে, তার নাকের ডগায় আয়না ধরে কেবলমাত্র এটুকুই বোঝা গেল, তার শ্বাসক্রিয়া চলছে।
এমনও দেখা গেল, তার হাত-পা আড়ষ্টপাথরের মতো শক্ত আর আগের মতো বরফের মতো ঠাণ্ডা। তবে তার শরীরের কোথাও মৃত্যুর সামান্যতম লক্ষণও চোখে পড়ল না।
একটা ব্যাপার কিন্তু খুবই সত্য যে, বন্ধু ভালডিমারের আগে মেসমেরিজম অবস্থায় রেখে কখনই সম্পূর্ণরূপে সাফল্য লাভ করিনি। ডান বাহুর ওপর হাত চালনা করে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আমার হাত নাড়ায় তার হাত নাড়াতে আমি পারিনি!
মৃত্যুপথযাত্রী মুমুর্ষ বন্ধু ভালডিমারের ওপর ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে ডান বাহুর ওপর হাত চালনা করে আমার নাড়ার অনুকরণে তার হাত নাড়ানোর চেষ্টা আবারও করলাম, ব্যর্থ হব–সাফল্য লাভ করব না জেনেই তা করলাম।
আরে বাবা! এ যে রীতিমত অবিশ্বাস্য কাণ্ড! অত্যাশ্চর্যভাবে সাফল্য লাভ করায় আমি যারপরনাই অবাক হয়ে পড়লাম। আমার হাতটা যে যে দিকে গেল, তার হাতটাও ঠিক সে সে দিকে নড়তে লাগল। খুশিতে আমর বুকের ভেতরে যেন রীতিমত আন্দোলন শুরু হয়ে গেল।
আমি তার মুখের ওপর সামান্য ঝুঁকে বললাম–বন্ধু ভালডিমার, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?
সে ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল–না।
তার ঠোঁট দুটো তির তির করে কাঁপতে আরম্ভ করল।
আমি একই প্রশ্ন পর পর তিনবার পুনরাবৃত্তি করলাম।
প্রথম দুবার তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না।
কিন্তু তৃতীয়বার তার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না সত্য। কিন্তু তার চোখের পাতা ধীরে ধীরে খুলে গেল। ঠোঁট দুটো বার কয়েক নড়ে উঠল। পর মুহূর্তেই ঠোঁট দুটোর ফাঁক দিয়ে খুবই অস্পষ্ট কথা কটা বেরিয়ে এলো–হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছি। জাগিয়ে দিও না। এভাবেই আমাকে মরতে দাও!
আমি হাত বাড়িয়ে তার হাত-পা পরীক্ষা করলাম। বুঝলাম আগের মতোই শক্ত। তবে আমি নড়ানোমাত্র সে ডান হাতটাকে একই রকমভাবে নড়াচ্ছে।
আমি আবারও তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করলাম–একটা কথা খোলাখুলিভাবে বল তো, তুমি কী এখনও বুকে ব্যথা বোধ করছ?
সে আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট স্বরে জবাব দিল–না, ব্যথা নেই–আমি মরতে চলেছি!
সকালে ডক্টর এফ না আসা অবধি বন্ধু ভালডিমারকে আর বিরক্ত করলাম না।
ভোর হবার পর পরই ডাক্তার এফ হাজির হলেন। তিনি ঘরে ঢুকেই দেখলেন, রোগী এখনও বেঁচে আছে। ব্যাপারটা তাকে যারপরনাই বিস্মিত করল। তিনি চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে আমার বন্ধুর দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি এগিয়ে গিয়ে রোগীর বিছানার পাশের চেয়ারটায় বসলেন। এবার হাত বাড়িয়ে তার নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর ঠোঁটের সামনে আয়না ধরলেন। তারপর সেটাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিলেন। এবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন–থামবেন না, চালিয়ে যান–চালিয়ে যান।
ভালডিমার আগের মতোই মিনিট কয়েক নিশ্চল-নিথরভাবে কাটিয়ে দিল। আমি টুকরো-টুকরো কয়েকটা প্রশ্ন করলাম। তার কাছ থেকে কোনো জবাবই পেলাম না।
তাকে নীরব দেখে ভাবলাম, একটু-আধটু শক্তি সঞ্চয় করে নিচ্ছে।
পর পর চারবার আমি তাকে একই প্রশ্ন করলাম। প্রথম তিনবার তার দিক থেকে। কোনো জবাব পেলাম না। চতুর্থবার খুবই ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল–হ্যাঁ এখনও ঘুমিয়ে রয়েছি।
