নিরবচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে মি. এল-এর সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়েছি। দীর্ঘ চেষ্টার পর তার মধ্যে সংজ্ঞা ফিরে এলো। সে চোখ মেলে তাকাল। একটু পরেই ধীরে ধীরে উঠে বসল।
এবার মি. এলের সঙ্গে বন্ধু ডালডিমারের অবস্থা নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করলাম।
বন্ধুর অবস্থা সম্বন্ধে যা-কিছু বলেছি, দেখা গেল এখন তার কিছুমাত্রও হেরফের হয়নি। সে একই রকম অবস্থায় বিছানা আঁকড়ে পড়ে রয়েছে। তবে বর্তমানে যেটুকু পরিবর্তন হয়েছে, মুখের সামনে আয়না ধরলে আগের মতো নিশ্বাসের লক্ষণ চোখে পড়ছে না।
বন্ধুর বাহু থেকে টেনে রক্ত বের করার চেষ্টা করা হলো। একবার নয়, বেশ কয়েকবারই চেষ্টা করা হলো। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হতে হলো।
এবার আমার ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে তার বাহুকে আগের মতো নাড়াবার চেষ্টা করলাম। এ-কাজেও দারুণভাবেই ব্যর্থ হতে হলো। কিছুতেই তার বাহুটাকে নাড়াতে পারলাম না। মেসমেরিজমের লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠেছিল কেবলমাত্র আমার বন্ধুর জিভে।
আমি যতবারই তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছি, ততবারই তার জিভটা তিরতির করে কাঁপতে আরম্ভ করেছে। ব্যাপারটা দেখে মনে হলো কিছু বলার জন্য, মানে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই সে অসহায়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জিভটা নড়েছে, কিন্তু কোনো স্বরই বেরোয়নি।
কেবলমাত্র আমি নই, অন্যান্য সবাইও এক এক করে প্রশ্ন করেছে। তারাও ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি বন্ধু ভালডিমারকে যুগ্ম সন্মোহনের প্রভাবে ও অন্যকে নিয়ে প্রশ্ন করাতেও বাদ দেইনি। এক্ষেত্রেও প্রায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তার জিভ অনড়ই থেকে গেছে।
এবার নার্স পরিবর্তন করার দরকার বোধ করলাম। কারণ, যে দুজন নার্স বিন্দ্ৰি রাত কাটিয়েছে তাদের পক্ষে আর কর্তব্য পালন করা সম্ভব নয়। তারাও তো মানুষ। শরীরের ক্লান্তি আসাটাই তো স্বাভাবিক। ফলে অন্য দুজন নার্স জোগাড় করে তাদের। ওপর বন্ধুবর ভালডিমারের দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে ডাক্তার দুজন আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। মি. এল আর আমিও তাদের পিছন পিছনই বেরিয়ে এলাম।
বিকেল হলো। আমরা আবার এক-এক করে রোগীর অবস্থা দেখার জন্য তার ঘরে হাজির হলাম।
দরজায় দাঁড়িয়েই আমি শয্যাশায়ী বন্ধুর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। কিন্তু তার অবস্থার কোনো পরিবর্তনই আমার চোখে পড়ল না। আগের মতো একই অবস্থায় সে বিচানা আঁকড়ে নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো এলিয়ে পড়ে রয়েছে।
আমরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলাম, বন্ধুকে আর জাগানোর চেষ্টা করে ফায়দা কিছু হবার নয়। তার শারীরিক অবস্থা দেখে পরিষ্কার দেখা গেল, মৃত্যু বলতে যা বোঝায় তা হয়ে গেছে, একমাত্র মেসমেরিজমের মাধ্যমে তাকে এখনও ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। অতএব তাকে আবার জাগাবার চেষ্টা করলে মৃত্যু দ্রুত ঘটে যাওয়া ছাড়া কিছুই হওয়া সম্ভব নয়।
সেদিন, সে মুহূর্তের পর থেকে পুরো একটা সপ্তাহ পর্যন্ত পুরো সাত সাতটা দিন বন্ধু ভালডিমার একইভাবে বিছানা আঁকড়ে এলিয়ে পড়ে থেকেছে।
আমি, ডাক্তার আর অন্যান্যদের সঙ্গে করে মাঝে মাঝে গিয়ে বন্ধুর অবস্থা দেখে এসেছি। নার্সরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো তার দেখাশোনায় লিপ্ত থেকেছে। তাদের কর্তব্যে এতটুকুও ত্রুটি ছিল না।
গত শুক্রবারের কথা। সেদিন সকালেই মনস্থ করলাম, বন্ধু ভালডিমারকে আর একবার জাগাবার চেষ্টা করে দেখি। করলামও তা-ই। কিন্তু সর্বশেষ এ পরীক্ষার ফল ভালো হয়নি। আর এ ঘটনাটা নিয়েই আড়ালে যত কিছু গুনগুনানি, যত কিছু ফিসফিসানির সূত্রপাত হয়েছিল।
মেসমেরিজম পদ্ধতি অনুযায়ী বেশ কিছুক্ষণ ধরে হস্তচালনার কাজে লিপ্ত রইলাম। কিন্তু নিদারুণভাবে ব্যর্থ হতে হলো।
এবার তার চোখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেখতে পেলাম, তার চোখের করোনিয়া নিচের দিকে ধীরে ধীরে কিছুটা নেমে গেল। প্রথমে চোখের ভুল মনে করলাম। কিন্তু না, ঠিকই দেখেছি বটে!
তার পর মুহূর্তে নজরে পড়ল, নিচের দিকে নেমে-আসা চোখের তারার গা থেকে খুবই দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ রস চুঁইয়ে-চুঁইয়ে পড়তে লাগল। আমি কয়েক মুহূর্ত সেখান থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না।
.
আমার পক্ষে হাত গুটিয়ে নিশ্চেষ্টভাবে বসে থাকা সম্ভব হলো না। আবার সক্রিয় হয়ে উঠলাম। চেষ্টা চালাতে লাগলাম, ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে বন্ধু ভালডিমারের বাহুকে আবার চালনা করা সম্ভব হয় কিনা। নিষ্ঠার সঙ্গে চেষ্টা চালালাম। কিন্তু তাশ হতে হলো। আমার চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হলো।
এবার ডক্টর এফের ইচ্ছায় তাকে একটা প্রশ্ন করলাম–বন্ধু ভালডিমার, একটা প্রশ্ন করতে চাচ্ছি, উত্তর দেবে কি?
সে আগের মতোই নির্বাক নিশ্চল নিথরভাবেই এলিয়ে পড়ে রইল।
আমি এবার বললাম–বন্ধু, বল তো, এ মুহূর্তে তোমার অনুভূতি কেমন, বলতে পারবে কি?
এবারও তার দিক থেকে কোনো জবাবই পেলাম না। তবে মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ দুটোর ওপর চক্রাকার লালচে আভা প্রকাশ পেল। তারপরই তার জিভটা তিরতির করে কেঁপে উঠল। ব্যাপারটা দেখে আমার যেন স্পষ্টই মনে হল, ব্যথিত অস্বস্তিকর মুখবিবরের ভেতরে জিভটা অস্বাভাবিকভাবে ঘুরপাক খেতে আরম্ভ করেছে। মুখটা দীর্ঘ সময় হাঁ করা অবস্থায় ছিল। কারণ, চোয়াল আর ঠোঁট দুটো আগের মতোই একই রকম আড়ষ্ট ছিল। এ সাতটা মাস একই অবস্থায় ছিল, কোনো পরিবর্তনই লক্ষিত হয়নি।
