আমার কথায় সম্মতি জানিয়ে ডাক্তার দুজন বিদায় নিলেন। আমি তাদের বিদায় জানিয়ে ঘরে ঢুকে বন্ধুবর ভালডিমারের রোগশয্যার পাশে বসলাম। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে ম্লান হাসল। তার বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি আর আসন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারটা নিয়ে আমার খোলাখুলি আলোচনা হলো।
তার সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝতে পারলাম, এ রকম মর্মান্তিক শোচনীয় পরিস্থিতিতেও তার আগ্রহ আগের মতোই আছে, সামান্যতমও হ্রাস পায়নি। আমি এতে যারপরনাই অবাক হলাম।
পরীক্ষার কাজ শুরু করতে দেরি দেখে সে আমাকে জোর তাগাদা দিতে লাগল– কেন মিছে দেরি করছ বন্ধু, কাজ শুরু করে দিলেই তো পার। তাছাড়া হাতে সময়ও তো বেশি নেই। নাও, কাজে লেগে যাও।
ঘরে দুজন নার্স উপস্থিত। তারা আমার হুকুম তামিল করার জন্য তৈরি হয়েই রয়েছে। সমস্যা দেখা দিল কাজ শুরু করার প্রস্তুতির ব্যাপারটা নিয়ে। সবার আগে দরকার আমার কাজের দুজন সাক্ষী। এরকম দুজন লোকের উপস্থিতি ছাড়া কাজ শুরু করতে কিছুতেই আমি মনের দিক থেকে সাড়া পেলাম না। আসলে দুর্ঘটনাটা তো যে কোনো মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে।
আমার বন্ধুবরের তাড়া দেখে আমি বললাম–এত ব্যস্ততার কিছু নেই। এখনও হাতে প্রচুর সময় আছে। আগামীকাল সকাল আটটা নাগাদ পরীক্ষা শুরু করব, ভেবে রেখেছি।
কাল! কাল সকালে! আজ, এখনই নয় কেন, বুঝছি না তো?
কাল সকালে একজন ডাক্তারি পাঠরত ছাত্রকে সামনে হাজির রাখব।
ডাক্তারি পড়ছে?
হ্যাঁ। তার নাম থিওডোর এলো—
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল–ঠিক আছে, তবে তা-ই কর।
সকাল হলো। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে তার নির্দিষ্ট পথে আর নির্দিষ্ট গতিতে। ডাক্তার দুজন তখনও এসে পৌঁছায়নি। তাদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই ভালো হত। আমার এরকমই ইচ্ছা ছিল।
না, ডাক্তারদের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা আর সম্ভব হয়ে উঠল না। বন্ধুবর ভালডিমারই বাগড়া দিল। সে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে, তা আর বলার নয়। তবে তার শারীরিক অবস্থা দেখে আমিও শেষপর্যন্ত আর দেরি করতে উৎসাহি হলাম না।
আমি কাগজ-কলম নিয়ে ডাক্তারি পড়ুয়া মি. এলের সামনে বসলাম। তিনি যা কিছু দেখেছেন, যা-কিছু বললেন সবই লিখে নিলাম। একটা অক্ষরও বাদ দিলাম না। আর মুখ থেকে শোনা আমার লিখে-নেওয়া সে বক্তব্য নিচে উল্লেখ করলাম–
পরদিন রাত আটটার সময় আমি বন্ধুবর ভালডিমারের হাত দুটো জড়িয়ে ধরলাম। আমার হাতে তার হাত দুটোকে ধরে রেখেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম– দেখ বন্ধু মি. এল–আমাদের কাছে উপস্থিত রয়েছেন। আমাদের কথোপকথনের সাক্ষী হিসেবে তাকে এখানে আনা হয়েছে। অতএব তার সামনে তোমার যা-কিছু বক্তব্য কিছুমাত্রও গোপন না করে স্পষ্টভাবে সবকিছু বলবে, খেয়াল থাকে যেন।
বন্ধুবর ভালডিমার সামান্য ঘাড় কাৎ করে আমার কথার সম্মতি জানাল।
আমি এবার তাকে বললাম–কোনোরকম দ্বিধা সঙ্কোচ না করে, খোলামনে বল, পরীক্ষঅর ব্যাপারে তোমার সম্মতি আছে তো?
সে এবার ক্ষীণ অথচ স্পষ্ট স্বরে নিজের মতো ব্যক্ত করতে গিয়ে বলল–আমার সম্মতি তো অবশ্যই আছে। আমি যদি মেসমেরিজমে সম্মত না-ই হতাম তবে আর তোমার কথামতো কাজ করতে গেলাম কেন। তাছাড়া তোমাকে তড়িঘড়ি খবর দিয়ে এখানে নিয়ে আসতেই বা উৎসাহি হতে যাব কেন, বল তো?
হুম।
আমি মেসমেরিজমে সম্মত। আর তা এখনই শুরু কর, এটাই আমার ইচ্ছা।
হ্যাঁ, তা-ই করছি।
এমনিতেই অনেক দেরি করে ফেলেছ। নাও, ঝটপট কাজে লেগে যাও।
ব্যস আর মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে আমি তার ওপর মেসমেরিজম বিদ্যা প্রয়োগ করতে মেতে গেলাম। গোড়াতেই হস্তচালনা শুরু করে দিলাম, ইতিপূর্বে বহুবারই সে পদ্ধতিতে তাকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম, ঠিক একই পদ্ধতিতে।
তার কপালের ওপর দু-একবার টোকা দেওয়ামাত্র সম্মোহনের প্রভাব ফলতে শুরু করে দিল।
কিন্তু না, ফল তেমন কিছু পাওয়া গেল না। দশটার কাছাকাছি ডাক্তার দুজন হাজির হলেন। এর আগে পর্যন্ত ফল না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা আমার মধ্যে জেঁকে বসেছিল, সত্য বটে।
ডাক্তার দুজন ঘরে পা দিতেই আমি কোনোরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই সরাসরি প্রশ্ন করলাম–বন্ধুবর ভালডিমারের ওপর মেসমেরিজমবিদ্যা প্রয়োগ করতে চলেছি, আপনাদের কোনো আপত্তি আছে কী?
তাঁরা সমস্বরে বললেন-দেখুন, রোগীর মৃত্যুযন্ত্রণা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। অতএব এখন মেসমেরিজমের ঝুঁকি নেওয়া যেতে পারে?
ডাক্তার দুজনের সম্মতি পেয়েই আমি নিচের দিকে হাত চালালাম। এবার ভালডিমারের খুলে-রাখা ডান চোখের দিকে আমার দৃষ্টি নিবন্ধ রাখলাম।
একজন ডাক্তার তার নাড়ি ধরে সর্বক্ষণ বসেই রইলেন। দেখলেন নাড়ির গতি খুবই ক্ষীণ। অতিকষ্টে শ্বাসকার্য চালাচ্ছে। প্রতি আধ মিনিট অন্তর নিশ্বাস ফেলছে।
তার এই একই অবস্থা পনেরো মিনিট ধরে চলল। পনেরো মিনিট পরে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি লক্ষ্য করলাম, এবার তার শ্বাসক্রিয়া চালাবার আর কোনো কষ্টই রইল না। তবে এও লক্ষ্য করলাম, আধ মিনিট পর শ্বাস ফেলার ব্যাপারটা রয়েই গেল।
আমি এবার তাড়াতাড়ি তার হাত-পা পরীক্ষা করে দেখলাম, বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। উত্তাপ বলতে কিছুই নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। এবার তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসু নজরে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। লক্ষ্য করলাম, তার মধ্যে প্রকৃত মেসমেরিজমের আসল লক্ষণগুলো এক এক করে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। আর সেগুলো খুবই স্পষ্ট।
