অত্যুদ্ভুত ধারণাটা আমার মাথায় চেপে বসার পরই বন্ধুবর মি. ভালডিমার-এর নামটাই সবচেয়ে আগে আমার মনের কোণে উঁকি দিল।
আমি মোটামুটি নিশ্চিন্তই ছিলাম, আমার উদ্দেশ্যের কথা শুনে সে আপত্তি করবে না। কারণ, তার মনটা তো আমার আর অজানা নয়।
ব্যাপারটা সম্বন্ধে আমার নিঃসন্দেহ হবার পিছনে অন্য কারণও ছিল যথেষ্টই। আমি ভালোই জানতাম, আমেরিকাতে তার কোনো আত্মীয়-পরিজন নেই যে তাকে বাধা দিয়ে আমার উদ্দেশ্যটাকে বানচাল করে দিতে পারে। এরকম ভাবনা চিন্তার মাধ্যমে আমি উৎসাহিত হয়ে বন্ধু ভালডিমারের সঙ্গে আমার উদ্ভট পরিকল্পনাটা সম্বন্ধে খোলাখুলি বিস্তারিত আলোচনা করলাম। তার উৎসাহ, আগ্রহ আর মানসিক উত্তেজনা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করল। বিস্মিত হবার কারণও অবশ্যই রয়েছে। আমার মেসমেরিজমের পাল্লায় বার বারনিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছিল ভালডিমার। কিন্তু অবাক কাণ্ড! সে কিন্তু কোনোদিন, মুহূর্তের জন্যও মেসমেরিজমের ব্যাপারে তেমন মাতামাতি করেনি।
রোগটা এমনই একটা বিশেষ প্রকৃতির যে, মৃত্যু কবে, কখন আর কিভাবে হবে বলা সম্ভব নয়, শুনে বন্ধুবর বলল–আমিই তোমাকে সময়মত সবকিছু বলে দেব।
আমি তার কথা শুনে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম।
সে আমার জিজ্ঞাসা দূর করার জন্য এবার খেলাসা করেই বলল–শোন বন্ধু, ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমার মৃত্যুর দিন আর সময় সম্বন্ধে আমাকে রায় দিয়ে যাবেন, তখনই আমি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে কিছুমাত্র উদাসিন থাকব না।
ব্যবস্থা গ্রহণ বলতে তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছ?
ডাক্তাররা যখনই আমার মৃত্যুর দিনক্ষণ বলে যাবে তার চব্বিশ ঘণ্টা আগেই আমি তোমাকে তলব করব।
ভালডিমার মাস সাতেক আগে আমাকে একটা চিঠি লিখেছিল। যথাসময়েই আমি সেটা হাতে পেয়েছিলাম। চিঠিটার বক্তব্য এরকম–
সুপ্রিয় পি
এখন অনায়াসেই চলে আসতে পার। গতকাল মাঝরাতে দুজন চিকিৎসক আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমার পরমায়ু সম্বন্ধে রায় দিয়ে গেলেন। সময় আগত। দেরি না করে এসে পড়।
ইতি
তোমার বন্ধু ভালডিমার
বন্ধুবর ভালডিমার চিঠিটা লেখার আধঘণ্টা পরেই সেটা আমি হাতে পেয়ে গেলাম। চিঠিটা পাওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট পরেই আমি মুমূর্ষ বন্ধুর রোগশয্যার পাশে পৌঁছে গেলাম। দিন দশেক তাকে দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই দশাটা দিনের মধ্যেই তার শরীরের অবস্থা যা হয়েছে, তা দেখামাত্রই চমকে ওঠার মতো। সর্বাঙ্গে রীতিমত কাঁপুনি লেগে যায়।
প্রথম দর্শনেই দেখলাম, তার মুখটা চকের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখ। দুটোনিস্তেজ, এতই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে যে, চোয়ালের হাড় যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। গালের চামড়া পর্যন্ত ঢিলে হয়ে ঝুলে পড়েছে। আর নাক ও মুখ দিয়ে অনবরত শ্লেষ্ম বেরোচ্ছে।
আমি তার শিয়রে বসে হাতটা টেনে নিলাম। নাড়ি দেখলাম। নাড়ির গতি খুবই ক্ষীণ, নেই বললেই চলে। এতকিছু সত্ত্বেও আমার বন্ধুবর ভালডিমার অস্বাভাবিক দৃঢ় মনোবল আর সর্বশেষ দৈহিক শক্তির জোরেই তার ধড়ে এখনও প্রাণের অস্তিত্ব অব্যাহত রয়েছে। নিজেকে একটু সতেজ করে নেওয়ার জন্য সে নিজের হাতেই শিশি থেকে ওষুধ ঢেলে নিয়ে খেল।
আমি দরজা ঠেলে যখন ঘরে ঢুকলাম তখন দেখলাম, দুর্বল হাতে সে একটা নোটবইতে কি যেন লিখছে।
আমাকে দেখেই সে ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে নীরবে কিছু সময় তাকিয়ে রইল। তারপর খুবই স্পষ্টস্বরে কথা বলল।
তার বিছানার দুদিকে দুজন চিকিৎসককে বসে থাকতে দেখলাম। আর মুমূর্ষ বন্ধুবর ভালডিমার বালিশে হেলান দিয়ে বসে। বালিশের গায়ে নিজের ভার সঁপে দিয়ে সে কোনোরকমে নিজেকে সোজা রেখেছে।
আমি ইশারায় ডাক্তার দুজনকে বাইরে, বন্ধুর আড়ালে ডেকে নিয়ে এলাম। তার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাইলাম।
আমার প্রশ্নের উত্তরে উভয়ে একই কথা বললেন।
গত আঠার মাস যাবৎ আপনার বন্ধুর বাঁ দিকের ফুসফুস ক্রমে শক্ত হতে হতে এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মোদ্দা কথা, বর্তমানে তা একেবারেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। আর ডানদিকের ফুসফুস? সেটার ওপরের অংশও একই দশায় পৌঁছাতে চলেছে। আরও আগে নিচের দিকের বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে দগদগে ঘা হয়ে গেছে। ফুসফুসের কয়েকটা জায়গায় ছোট-বড় ছিদ্রও হয়েছে আর পাঁজরের গায়ে লটকে রয়েছে। সম্প্রতি ডানদিকে এ-হাল হয়েছে। ফুসফুস এত শক্ত হয়ে পড়েছে যা ভাবাই যায় না। সে সঙ্গে গতিবেগ অভাবনীয়ভাবে বেড়ে গেছে।
এক মাস আগেও রোগীর উপরোক্ত লক্ষণগুলো ধরা পড়েনি। মাত্র তিন মাস আগে ধরা পড়েছে, ফুসফুস পাঁজরের সঙ্গে লটকে রয়েছে।
তবে এখন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয় সত্য, তবু মনে হচ্ছে মূল ধমণীটাও অবশ্যই অকেজো হয়ে পড়েছে, কেন সম্ভব নয়? কারণ, আমার বন্ধুবরের মারা যাবার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে রবিবার রাত বারোটা নাগাদ। আর আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে এসব ভাবনা-চিন্তা করছি শনিবার সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। এটুকু সময়ের মধ্যে তার শেষ অবস্থায় আর কী-ই বা করার কথা ভাবা যেতে পারে?
ডাক্তারদের মতামত শোনার পর তাদের অনুরোধ করলাম–আগামীকাল রাত দশটা নাগাদ আপনারা উভয়েই যেন আমার মৃত্যুপথযাত্রী রোগী বন্ধুর কাছে উপস্থিত থাকবেন।
