একটা কথা কি, যে লোকটা মৃত্যু পথযাত্রী, অর্থাৎ মর-মর হয়েছে তাকে সম্মোহন করা সম্ভব। কিন্তু মৃত্যুর পর পরিস্থিতি কেমন হয় তারও তো পরীক্ষা করে দেখা চাই। শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা তো এমনও দাঁড়াতে পারে যে, মেসমেরিজমের মাধ্যমে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যেতে পারে? শেষপর্যন্ত যদি মৃত্যুটা রদ করা সম্ভব না-ই হয় তবুও চেষ্টা করে দেখতে দোষটা কোথায়?
এরকম একটা অত্যাশ্চর্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হাত দেওয়ার আগে এর অনেকগুলো দিক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা অবশ্যই দরকার। ব্যাপারগুলো নিয়ে আগেই গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনা করে নিয়ে তবে কাজে হাত দেওয়া উচিত।
অবশ্যই বিবেচনা করার মতো দিকগুলোর মধ্যে আসল দিক হচ্ছে তিনটি–সবার আগে আমাদের দেখা দরকার, মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে মুমূর্ষ মানুষটার ওপর চৌম্বক শক্তির প্রভাব কার্যকর হয় কি না। আর যদি হয়ই তবে তা কতখানি কার্যকর হয়। তারপর, অর্থাৎ দ্বিতীয়ত-চৌম্বক প্রভাব যদি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কারো মধ্যে, কার্যকর হয়েই থাকে তবে আসন্ন মৃত্যু মেসমেরিজম প্রভাবকে বৃদ্ধি করে, নাকি হ্রাস করে দেয়? তার পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়, অর্থাৎ তৃতীয়ত কতদিন অথবা কি পরিমাণে আসন্ন মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যেতে পারে।
এর শেষের ব্যাপারটাই কিন্তু আমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহের সঞ্চার করল। সত্যি কথা বলতে কি, ব্যাপারটা সম্বন্ধে আমি কৌতূহলাপন্নও কম হলাম না। আর এরকম আগ্রহ কৌতূহলের শিকার হয়েই আমি এরকম একটা উদ্ভট কাজে হাত দেবার সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারিনি।
কিন্তু একটা সমস্যার মুখোমুখি আমাকে হতে হলো। সমস্যাটা হচ্ছে, কাকে নিয়ে আমি এ অভিনব আর অত্যাশ্চর্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটা করব? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু মি. আরনেস্ট ভালডিমারের নামটা আমার মনে পড়ে গেল।
মি, আরনেস্ট ভালডিমার নামে আর যে বন্ধুবর বিবলিথিকা ফরেনসিকা বইটা লিখে খুব নাম করেছে, তার কথা বলছি। আর ছন্দনামেও সে ইস্সাচার মাকস নামে আরও একটা বই লিখেছে। তার লেখা ওয়ালন্সটাইন আর গর্গনচুয়া বই দুটোও পাঠক-পাঠিকাদের কাছে কম সমাদৃত হয়নি।
নিউ ইয়র্ক শহরের হারলেম নামক অঞ্চলে আমার বন্ধুবর মি. ভালডিমার ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সেই তখন থেকে তার চেহারার তেমন লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তনই হয়নি। অর্থাৎ তখন তাকে আমি যেমনটি দেখেছিলাম আজও তাকে ঠিক একই রকম চোখে লাগে।
আমার বন্ধুবরের দেহেরনিম্নাংশের সঙ্গে জন র্যানডলফের দেহের নিচের দিকটার হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তার মাথায় একরাশ ঝাঁকড়া চুল, কুচকুচে কালো। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, মাথা থেকে বুঝি তেল চুঁইয়ে পড়ছে। তবে কানের কাছে নেমে আসা জুলফি সাদা, দুধের মতো ধবধবে সাদা। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের বিশ্বাস, তার মাথার চুলগুলো আসল নয়, নকল চুলের গোছা মাথায় পড়েছে। অর্থাৎ পুরচুলা ছাড়া তো এমনটা হবার কথা নয়।
আমার বন্ধুর স্বভাব প্রকৃতির কথা বলতে গেলে সবার আগেই বলা দরকার, যে মানুষ হিসেবে বড়ই নার্ভাস প্রকৃতির। অল্পতেই কেমন ঘাবরে যায়। মেসমেরিজম-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে তার মতো একজন মানুষ হলেই ভালো হয়। একবার নয়, দু তিনবার তাকে খুব সহজেই ও অল্প সময়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। কোনো সমস্যাই হয়নি। সহজেই ঘুম পাড়ানো সম্ভব ঠিক এরকমই একজন মানুষ আমার পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
তবে এও সত্য যে, আমার বন্ধুবরকে সহজে ঘুম পাড়ানো সম্ভব হলেও বেশ বার কয়েক আমাকে রীতিমত নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছিলেন। যাকে বলে একেবারে নাস্তানাবুদ হওয়া। আরও আছে, তার স্বভাব প্রকৃতি, মানে তার ধাতটা এমনই অদ্ভুত যে, কি ঘটতে পারে আগে থেকে কিছুই অনুমান করা যায় না।
আরও আছে, আমার বন্ধুবর এমনই এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ যে, তার ইচ্ছাশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে আমার বশে আনা সম্ভব হয়নি, কোনোদিনই না। অর্থাৎ আমি এটাই বোঝাতে চাচ্ছি–আমরা যাকে ক্লোয়ারভয়্যান্স বলি, আরও সহজভাবে বলতে গেলে যাকে অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি। এ ব্যাপারটায় তার ওপর কিন্তু কোনোদিনই ভরসা করা যায়নি। পুরো ব্যাপারটাকেই সে ভেস্তে দিয়েছে। পরবর্তীকালে ভাবতে বসে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে সবার আগেই আমার মাথায় এসেছে তার ক্ষীণ শরীরের কথা।
আমি আগাগোড়াই তাকে একজন নড়বড়ে মানুষ দেখে আসছি। স্বাস্থ্য সর্বদাই টালমাটাল। সে যে কখন ভালো আছে আর কখন যে রীতিমত দুর্বল হয়ে পড়েছে তা তাকে দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই।
বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। বন্ধুবর ভালডিমারের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ পরিচয় হওয়ার মাস কয়েক আগে ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রায় দিয়েছিলেন, ব্যাধিটার নাম দুরারোগ্য যক্ষা। আর জোর দিয়ে তারা বলেছিলেন, এ রোগের কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কোনো উপায় তো নেই-ই, মৃত্যু যে অবশ্যম্ভাবী এতে কোনো সন্দেহই নেই।
ডাক্তারের ভবিষ্যদ্বাণী শোনার পর রোগী-ভদ্রলোক কিন্তু মনের দিক থেকে মোটেই ভেঙে পড়েননি, বরং মৃত্যুকে হাসিমুখে বরণ করে নেবার জন্য নিজের মনকে শক্ত করে বেঁধে তৈরি হয়েই রইলেন।
