তার কথাগুলোর মধ্যে মন্ত্রের প্রভূত শক্তি বুঝি লুকিয়ে ছিল। আর সে শক্তিকে অতিমানবিক শক্তি ছাড়া কীই বা বলা যেতে পারে? নইলে যে কথাটা বলতে না বলতেই অভাবিতভাবে বিশাল সাবেকি আমলের দরজাটার দিকে সে আঙুল উঠিয়ে ছিল, সেটা অল্প অল্প করে খুলে গেল। তীব্র ঝড়ো হাওয়ার চাপেই সেটা খুলেছে। তবে দরজার বাইরেই লেডি ম্যাডেলিনের সাদা কাপড়ে ঢাকা মূর্তি। আর সাদা কাপড়টার এখানে ওখানে রক্তের ছোপ, আর শরীরের সর্বত্র কঠিন লড়াইয়ের চিহ্ন অর্থাৎ ক্ষতচিহ্ন।
মাত্র অল্প কিছু সময়ের জন্য সে ঘরটার চৌকাঠের ওপর কাঁপতে কাঁপতে ঝড়ের কবলে পড়া গাছের মতো টলতে লাগল। ব্যস, পর মুহূর্তেই ভয়ঙ্কর আর্তনাদ করে ঘরের ভেতরে অবস্থানরত তার ভাইয়ের ওপর ঝাঁপ দিল। অসহনীয় মৃত্যু-যন্ত্রণার অস্বাভাবিক আবেগে ভাইকে জাপটে ধরেই ঘরের মেঝেতে ধপাস্ করে পড়ে গেল। তার ভাইও এমনই কিছু ঘটতে পারে সে আশঙ্কা করে আতঙ্কিত ছিল। আর এরই ফলে সে-ও মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারাল।
সে কামরাটা থেকে, সে প্রাসাদটা থেকে আমি আতঙ্কের শিকার হয়ে পালিয়ে এলাম।
প্রাসাদের সদর-দরজা পেরিয়ে পুরনো পথটা যখন অতিক্রম করি, তুফানের উন্মাদনা তখনও একইভাবে চলছে, এতটুকুও স্তিমিত হয়েছে বলে মনে হলো না।
অকস্মাৎ সে পথটার একেবারে ওপরে সুদীর্ঘ একটা আলোর রেখা বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো দ্রুত ছুটে এলো।
এমন অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা কোথা থেকে এলো তা দেখার জন্য আমি ঘাড় ঘুরালাম। কারণ সে মুহূর্তে তো আমার পিছনে অবস্থান করছে কেবলমাত্র প্রাসাদটা আর তার ছায়াটুকু।
এবার ব্যাপারটা আমার কাছে খোলাসা হয়ে গেল, ওই অভাবনীয় আলোটার উৎস অস্তাচলগামী রক্তিম পূর্ণ চন্দ্র। তারই অত্যুজ্জ্বল প্রভা ছড়িয়ে পড়ছে পূর্ব বর্ণিত সে আঁকা বাঁকা ফাটলটার ভেতর দিয়ে যেটা বহু বাঁক নিয়ে প্রাসাদটার একেবারে ভিত অবধি নেমে এসেছে।
আঁকা-বাঁকা সামান্য সে ফাটলটা আমার চোখের সামনেই দ্রুত বেড়ে যেতে লাগল। আর তারই ভেতর দিয়ে তীব্র হিংস্র নিশ্বাস যেন ঘূর্ণিঝড় হয়ে ছুটে আসতে। লাগল। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের সামনে উপগ্রহটার সম্পূর্ণ বৃত্তটাই ফেটে খান। খান হয়ে গেল। আর? সুবিশাল প্রাসাদটার অতিকায় দেওয়ালগুলো হুড়মুড় করে ধ্বসে পড়তে লাগল। প্রচণ্ড একটা আওয়াজ, হাজার হাজার জলপ্রপাত যেন একই সঙ্গে ধেয়ে আসছে–এমনই কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ। আর আমার পায়ের তলায় অবস্থিত কালো-পানির হ্রদটা এক অবর্ণনীয় নীরবতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ‘আশার আলয়’-এর প্রতিটা টুকরোকে ধীরে ধীরে চাপা দিয়ে দিল। ব্যস, শেষ–সব শেষ!
দ্য ফ্যাকটস ইন দ্য কেস অব মি. ভালডিমার
মি. ভালডিমারের কেস।
মি. ভালডিমারের অস্বাভাবিক কেসটা কেন অভাবনীয় উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল সেটা সম্বন্ধে বিস্মিত হবার মতো বাহানা করার আর কোনো দরকার আছে বলে আমি অন্তত প্রয়োজন বোধ করছি না। সত্যি কথা বলতে কি, ভালডিমারের কেসটাকে পর্যালোচনা করে বলতে গেলে না বলে পারা যায় না যে, এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়।
আরও কিছু গবেষণা করার চিন্তা করে আমি তখনকার মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, তখনকার মতো ব্যাপারটাকে সবার গোচরে আনা চলবে না। আনবও না। আমার এরকম চিন্তা ভাবনার পিছনে যুক্তি হচ্ছে, আশ্চর্য ঘটনা সম্বন্ধে কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়, অদ্ভুত রহস্যটাকে ভেদ করতে পারি।
আমি ব্যাপারটাকে চেপে রাখতে চেষ্টা করলে পরিচিত মহল এমন গোপন ফিসফিসা নিতে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃত ব্যাপারটা সবাই জানতে না পেরে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করা ফুলানো-ফাঁপানো এক বিবরণ, অর্থাৎ আসলের সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত খাদ মিশে গিয়ে ব্যাপারটা সবার মধ্যে প্রচার হয়ে যায়।
ব্যাপারটা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন মহলে জোর সমালোচনা শুরু হয়ে যায়, চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড বেঁধে যায়। আর এরই ফলে স্বাভাবিকভাবেই পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে সবার মধ্যে বিদ্রূপ আর অবিশ্বাসের জোয়ার বয়ে যেতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন সঙ্গীন হয়ে পড়ে যে, আসলকে দূরে রেখে নকলকে নিয়েই সবাই মাতামাতি শুরু করে দেয়।
এ জন্যই প্রকৃত ঘটনাটা সবার সামনে তুলে ধরা উচিত মনে করছি। ঘটনাটাকে সংক্ষেপে মোটামুটি এরকম–
আমি গত তিন বছর ধরে মেসমেরিজম বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি, যাকে বলে আমার মধ্যে প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গত নয়মাস আগেকার কথা, হঠাৎ আমার মাথায় খেয়াল চেপে বসে একের পর এক এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেও একটা ব্যাপার সর্বদাই বাদ পড়ে গেছে। তবে সে খেয়ালটা একেবারে হঠাৎই- আমার মাথায় আসে। ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক তো অবশ্যই, যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে তার মিমাংসাও সম্ভব নয়। তবে ব্যাপারটা যে একেবারে অত্যাশ্চর্য, রীতিমত অবিশ্বাস্য এ বিষয়ে এতটুকু সন্দেহ নেই।
অনেকেই জানেন, চোখের সামনে ঘটতে দেখেছেন অনেকেই জীবন্ত মানুষকে বহুবার বহু স্থানে সম্মোহন করা হয়েছে। কিন্তু মরা মানুষকে সম্মোহন করার চেষ্টা করা কেউ করেছে কি? না, এমন কোনো ঘটনার কথা কস্মিনকালেও কেউ করেছে বলে শোনা যায়নি। তবে অন্য কেউ, কোথাও শুনে থাকলেও আমি অন্তত শুনিনি।
