আমি আবার বইটার পাতায় চোখ রাখলাম। পড়তে লাগলাম–
আমি শক্তিধর সৎ-যোদ্ধা যুবক এথেলরেড দরজা ভেঙে আখড়ার ভেতরে ঢুকে বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ও একরোখা সন্ন্যাসী বা তার চেলা চামুন্ড কাউকেই দেখতে না পাওয়ায় তার মধ্যে প্রচণ্ড ক্রোধের সঞ্চার হল। আবার সে বিস্মিতও কম হলো না।
ঘরের দরজায় পা দিয়েই সে থমকে গেল। দেখল, সন্ন্যাসীর পরিবর্তে একটা ড্রাগন ঘর আগলাচ্ছে। তার অতিকায় শরীরটা বড়-বড় আঁশে ঢাকা। আর জিভ দিয়ে লকলকে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
সন্ন্যাসীর সোনার দেওয়াল আর রূপার মেঝের অট্টালিকাটার প্রহরায় সে নিযুক্ত।
চকচকে একটা পিতলের ফলক দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে। তার গায়ে বড় বড় হরফে লেখা–যে এখানে প্রবেশ করতে পারবে বিজয়ীর সম্মান লাভ করবে। আর যে ড্রাগনটাকে মারতে পারবে, সে ফলক-বিজয়ীর সম্মানে সম্মানীত হবে।’
ফলকটার ওপর থেকে নজর তুলে নিয়ে এসেই বীরযোদ্ধা এথেলরেড হাতের মুগুরটা দিয়ে সজোরে ড্রাগনটার মাথায় আঘাত হানল। আঘাত লাগামাত্র ড্রাগনটা এমন বিকট চিৎকার করে উঠল যে এথেলরেডও হাত দিয়ে কান দুটো চেপে না ধরতে বাধ্য হল। এমন তীব্র চিৎকার এর আগে কেউ শোনেনি। ড্রাগনটা এবার তার পায়ের কাছে বার-কয়েক বুক-কাঁপানো চিৎকার করে পাগুলো ছড়িয়ে স্থির হয়ে গেল–শেষ নিশ্বাস ছাড়ল। ব্যস, সব শেষ।
এ পর্যন্ত পড়ে আমি আবার আচমকা বইটার পাতা থেকে মুখ তুললাম। আগ্রহের সঙ্গে কানখাড়া করতেই সত্যি সত্যি শুনতে পেলাম, নিচু অথচ কর্কশ কণ্ঠস্বর, অস্বাভাবিক আর্তস্বর বা কোনো ধাতব শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছে। গল্পকার ন্যাসল্ট ড্রাগনটার যে অস্বাভাবিক আর্তনাদের কথা বলেছেন, যে আর্তনাদের কল্পনা আমি মনে মনে এই মাত্র করছিলাম, অবিকল সে রকমই আর্তনাদ আমার কানে এসে বাজতে লাগল।
ব্যাপারটা আমার মনকে খুবই দুর্বল করে দিল। একবার নয়, পরপর দুবার এমন অস্বাভাবিক যোগাযোগ কি করে যে সম্ভব হতে পাওে, তা ভেবে আমি আরও বিস্মিত হয়ে পড়লাম।
আমি আতঙ্কে, বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেও অন্তত কিছুটা দৃঢ় মনোবল জোর করে বুকের মধ্যে ধরে রাখলাম, যার জন্য আমার মুখে এমন কোনো ভাব প্রকাশ করলাম না, বা এমন একটা শব্দও উচ্চারণ করলাম না যাতে আমার বন্ধুবর আশারের উত্তেজিত স্নায়ুগুলো আরও বেশি রকম উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
আমি তার ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃসন্দেহ হতে পারলাম না যে, আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ওই শব্দটা তার কানেও এসেছে। তবে এও সত্য যে, শেষের দিকে মিনিট-কয়েক ধরে লক্ষ্য করেছি, তার হাবভাবে কেমন যেন একটা পরিবর্তন এসেছে। আমুল পরিবর্তনও বলা চলে।
সে আমার মুখোমুখি বসে রয়েছে। খাট থেকে নেমে কাঁপা কাঁপা হাতে কোনোরকমে একটা চেয়ার টেনে দরজার মুখোমুখি বসল। ফলে এমন তার মুখের একটা মাত্র অংশ আমার নজরে পড়ছে। তবে তার ঠোঁট দুটো যে তিরতির করে কাঁপছে এটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। শ্রুতির আগোচরে যেন কিছুই নেই।
তার মাথাটা কাভাবে বুকের ওপর ঢলে পড়েছে। তবে পাশ থেকে হলেও যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতেই বোঝা যাচ্ছে, সে ঘুমিয়ে পড়েনি। চোখ দুটো আধ-খোলা। তার শরীরটা স্থির হলেও মনে হচ্ছে থেকে থেকে বুঝি এদিক-ওদিক চলছে।
আমি বন্ধুর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে নিয়ে আবার ল্যান্সলটের বইয়ের পাতায় চোখ রাখলাম।
ভয়ঙ্কর ড্রাগনটার ক্রোধ থেকে অব্যাহতি পেয়ে পিতলের ফলকটার কথা ধরে যুবক এথেলরেডের মনে পড়ে গেল। নিজের ওপর থেকে শক্তিশালী মন্ত্রের প্রভাব কাটাবার কথাও তার মনে পড়ে গেল।
মৃত ড্রাগনটাকে টানাটানি করে সরিয়ে পথ পরিষ্কার করে নিয়ে সে দেওয়ালে টাঙানো ফলকটার দিকে এগিয়ে চলল।
কিন্তু সে ফলকাটার কাছে পৌঁছাবার আগেই সেটা অভাবিতভাবে আচমকা দুম করে রূপার মেঝের ওপর পড়ে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল। একটা ধাতব ঠণ্ঠক্ শব্দ স্পষ্ট আমার কানে এলো।
আমি আচমকা সম্পূর্ণ বিপর্যস্তভাবে লাফিয়ে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এত কিছু সত্ত্বেও আমার বন্ধু আগের মতোই দোল খেতে লাগল। তার দুলুনির এতটুকু বাধা পড়ল না। তবে তার দৃষ্টি সামনের দিকে সম্পূর্ণ স্থির। মুখটা যেন পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে।
আমি ধীর-পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধের ওপর একটা হাত রাখামাত্র সে হঠাৎ থরথর করে কাঁপতে লাগল। ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠলেও ঠোঁট দুটো অস্বাভাবিক রকম বেঁকে গেল।
তার দিকে সামান্য ঝুঁকে মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেই আমার স্পষ্ট মনে হলো যে, প্রায় অস্ফুট স্বরে কি যেন বলছে। আমি যে তার পাশে, একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে চেতনাটুকুও তার মধ্য থেকে নিঃশেষে উঠে গেছে।
তার মুখের একেবারে কাছাকাছি কানটাকে নিয়ে গিয়ে কোনোরকমে বক্তব্যটা উদ্ধার করতে পারলাম।
সে বিড়বিড় করে বলে চলল–‘কি হে, তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ না? আমি কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। হ্যাঁ, আমি শুনতে পেয়েছি। বহুকাল, বহুকাল, বহু মিনিট, বহু ঘণ্টা। বহুদিন আমি এ আহ্বান শুনেছি। তা সত্ত্বেও আমার সাহসে কুলোয়নি! উফ্! কৃপা কর, আমাকে কৃপা কর বড়ই অভাগা আমি–সত্যি আমার সাহসে কুলোয়নি। আমরা তাকে জীবন্ত সমাহিত করেছি। তোমার কাছে প্রকাশ করিনি আমার ইন্দ্রিয়গুলো বড় প্রখর হয়েছে? তোমার কাছে আজ প্রকাশ করছি, আমি প্রথম ফাঁকা কফিনের মধ্যে তার নড়াচড়ার খুবই অল্প আওয়াজ শুনেছি। বহু, বহুদিন আগেই আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছি। তবু, তবু আমার সাহসে কুলোয়নি–কোনো কথা বলা সাহসে কুলোয়নি। আর এমন এ মুহূর্তে–আজ রাতে–এথেলরেড উফ! সন্ন্যাসীর কাঠের দরজা ভাঙল, ড্রাগনটার মরণ ডাক আর আছড়ে পড়ে ফলকটার খানখান হয়ে যাওয়ার আওয়াজ; তার চেয়ে বরং বল, তার কফিনটা খোলার আওয়াজ, তার কারাগারের লোহার হাঁসকলের ধাতব শব্দ, মাটির তলার ঘরের তামার পাতে ঢাকা সুড়ঙ্গের ভেতর তার লড়াই! উফ! আমি কোথায় পালিয়ে যাব? কোথায় গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকব? এ মুহূর্তে কি সে এখানে হাজির হবে না? ব্যস্ততার সঙ্গে কাজ সেরে ফেলার জন্য সে কি আমাকে তিরস্কার করছে না? আমার ওপর কি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেনি? সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ কি আমার কানে পৌঁছায়নি? তার বুকের ধুকপুকানি কি আমার কানে ধরা পড়েনি? পাগল! বদ্ধ পাগল।’–এ পর্যন্ত বলে সে দুম্ করে একটা লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আত্মাটা যেন বেরিয়েই যাচ্ছে এমন আর্তস্বরে বলল– ‘উন্মাদ! বদ্ধ উন্মাদ কোথাকার! এখনও সে দরজাটার বাইরেই দাঁড়িয়ে! বদ্ধ উন্মাদ!’
