দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই সে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে ঘরটার সর্বত্র একটাবার চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিয়েই কাঁপা-কাঁপা ফাঁসফ্যাসে গলায় হঠাৎ প্রশ্ন করল– ‘তুমি, তুমি দেখনি?’
আমি হকচকিয়ে গিয়ে নীরব চাহনি মেলে ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমাকে নীরব দেখে সে-ই আবার মুখ খুলল–‘তুমি তবে দেখনি? কিছুই দেখনি? অপেক্ষা কর। নিশ্চয়ই দেখতে পাবে। অপেক্ষা কর।’
আশার কথা বলতে বলতে হাতের মোমবাতিটাকে আড়াল করে নিয়ে লম্বা-লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল। ঝট করে একটা জানালা পুরোপুরি খুলে দিল। ঘরের বাইরে তখনও পুরদস্তুর ঝড়ের দাপাদাপি সমান তালেই চলেছে।
জানালাটা খুলে দিতেই প্রচণ্ড বেগে ঝড়ো হাওয়া ঘরের ভেতরে সবকিছু লণ্ডভণ্ড– আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল।
ঘরের বাইরে বিক্ষুব্ধ ঝড়ের দাপটে চললে রাতটা সুন্দরই বটে। ভয়ঙ্কর আতঙ্ক আর ঝড়ের উন্মাদনার অদ্ভুত বন্য বোঝাপড়া, সহাবস্থান।
পরিস্থিতিটা নিয়ে সামান্য ভাবতেই আমার মনে হল, অদূরবর্তী কোনো স্থানে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এ রকম মনে করার কারণও রয়েছে যথেষ্টই। ঝড়ের গতি একটু পর পরই দিক পরিবর্তন করছে।
জমাটবাধা কালো মেঘ নামতে নামতে অনেকটা নিচে নেমে আসাতেও ঝড়ে সে জীবন্ত রূপ আমরা অনায়াসেই চাক্ষুষ করতে পারলাম। অথচ আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা রূপালি চাঁদ বা অগণিত মিটমিটে তারা–কিছুই আমাদের চোখে পড়ল না। এমনকি ক্ষণিকের জন্য বিদ্যুৎও চমকায়নি যার ফলে মুহূর্তের জন্য হলেও পরিবেশটাকে আলোকিত করে তুলতে পারে। তা সত্ত্বেও কেমন যেন একটা অপ্রাকৃতিক আলোর খুবই স্লান একটা আভা প্রাসাদটার চারদিক জুড়ে রয়েছে। আশ্চর্য, ব্যাপারটা একেবারেই অবিশ্বাস্য।
আমি এগিয়ে আশারকে জানালার কাছ থেকে ধরতে গেলে জোর করেই টানতে টানতে ঘাটটার কাছে নিয়ে এলাম।
আমি তার পাশে, প্রায় গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে ভীত কাঁপা-কাঁপা গলায় বললাম–‘তুমি এসব দেখো না। আমি বলছি, এসব কিছুতেই দেখো না।’
সে ঝট করে আমার মুখের দিকে বিস্ময় মাখানো দৃষ্টি মেলে নীরবে তাকাল।
আমি বলেই চললাম–‘শোন, যে সব জিনিস দেখে তুমি জ্ঞানবুদ্ধি হারিয়ে হতভম্ব হয়ে পড়, সেটাকে নিছকই বৈদ্যুতিক ঘটনা ছাড়া অন্য কোনো আখ্যাই দেওয়া চলে না, আরে অবিশ্বাস্য হলেও এরকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই চোখে পড়ে। তা নাহলে মনে করতে পার এ-সব হ্রদের পচা দূষিত পানিতে ভোজবাজি।’
তার চোখের আতঙ্কটুকু তখনও রয়ে গেছে লক্ষ্য করে আমি এবার বললাম– ‘জানালাটা দিয়ে কী কনকনে ঠাণ্ডা ঝড়ো বাতাস বইছে! এটা তোমার শরীর বরদাস্ত করবে না। মারাত্মক ক্ষতিকর।
মুহূর্তের জন্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে এবার বললাম তোমার প্রিয় রোমান্সের বই এটা। এক কাজ করা যাক, আমি জোরে জোরে পড়ি, তুমি চুপটি করে শোন। আজকের এ ভয়ঙ্কর রাতটার বাকিটুকু এভাবেই কাটিয়ে দেওয়া যাক, কী বল?
আমি যে বইটা তাকে দেখিয়েছি সেটা স্যার ল্যান্সলট ক্যানিং-এর লেখা। প্রচ্ছদে বড় বড় হরফে বইয়ের নামটা লেখা–‘উন্মাদের হা-হুঁতাশ।
বইটাকে মুখে আমার মনের মতো বললেও আসলে আদৌ তা নয়। বইটার পাতায় পাতায় যে সব অবান্তর কথা বলা হয়েছে, তাকে প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় না। আর আধ্যাত্মিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ আমার বন্ধুর এসব প্যাচাল মনে ধরার কথা নয়। তবে এ বিশেষ মুহূর্তে হাতের কাছে এ-বইটাই পেয়ে গেলাম। আর এও ভাবলাম, আমার বন্ধুর এখন এ-মানসিক পরিস্থিতিতে এসব অবান্তর এলোমেলো কথা ভালো লাগা একেবারে অসম্ভব নয়।
বইটার একের পর এক পাতা পড়তে পড়তে যে পাতাটায় পৌঁছে গেলাম, সেখানে নায়ক এথেলরেড সন্ন্যাসীর আখড়ায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। শেষপর্যন্ত ঢোকার জন্য তাকে বল প্রয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ বর্ণনাটা যে এভাবেই দেওয়া হয়েছে, এ-কথা অনেকেরই মনে পড়ার কথা।
নায়ক এথেলরেড এমনিতে গায়ে গতরে প্রচুর শক্তি ধরে–তার ওপর কড়া মদ গিলে গায়ে প্রচুর শক্তি পেয়েছে। তাই সে বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ও একরোখা সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলার তোয়াক্কা না করেই দরজা ভাঙার জন্য তৈরি হল। এদিকে অচিরেই ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবার আশঙ্কা ইতিমধ্যে দুচার ফোঁটা বৃষ্টিও গায়ে পড়ায় তার মধ্যে ব্যস্ততা সৃষ্টি করল। তাই সন্ন্যাসীকে আর ডাকাডাকি করে বৃথা সময় নষ্ট না করে হাতের মুগুরটা দিয়ে কাঠের দরজাটার গায়ে দমাদম আঘাত হানতে লাগল। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে ঘা কতক মারতেই দরজাটার গায়ে লোহার দস্তানা দিয়ে হাতটাকে ভেতরে চালান করে দেবার মতো একটা ফোকড় তৈরি করে ফেলল। এবার এত বেশি শব্দ করে আঘাত আসতে শুরু করল যে, গোটা বনটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে কী আওয়াজ!
অনুচ্ছেদটা পড়া শেষ করে আমি মুহূর্তের জন্য থেমে বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুললাম। নীরবে উৎকর্ণ হয়ে যে শব্দটাকে শোনার চেষ্টা করলাম সেটা প্রাসাদটার সবচেয়ে দূরবর্তী কোনো কোণ থেকে ভেসে আসছে সেটা যেন ল্যান্সলট-এর বইয়ে বর্ণিত অমিত শক্তিধর নায়কের মুগুরের আঘাতের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। তবে এটাকে একটা আকস্মিক যোগাযোগ ছাড়া অবশ্যই অন্য কিছু ভাবা যাবে না। জানালায় দমকা বাতাস লাগায় শার্সিগুলো যে দুমদাম আওয়াজ করে চলেছে তাতে আমার বইটা পড়ার কোনোই বাধা সৃষ্টি করতে পারল না।
