কদিন যেতে না যেতেই তার বিবর্ণ মুখে পড়েছে আরও একটা রক্তিম আভার প্রলেপ। শুধু কি এ-ই? তার চোখের মণি দুটোর উজ্জ্বল ভাবটা উধাও হতে হতে আজ একেবারেই নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। আর তার কণ্ঠস্বরটাও যেন দারুণনিস্তেজ হয়ে গেছে। সে যা-ই বলে তাতেই একটা আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট। আতঙ্কে সে যেন একেবারে কুঁকড়ে যায়।
বন্ধুর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই বারবার একই কথা আমার বুকের কন্দরে বার বার পাক খেতে থাকে, সে বুঝি কোনো একটা চাপা রহস্যকে প্রকাশ করে দেবার জন্য মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছে। সে প্রতিনিয়ত অন্তর্জালায় পুড়ে মরছে।
আবার ব্যাপারটাকে এমনও মনে হত, আমার সব ধারণাই বুঝি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তার চালচলন ইদানিং যা-কিছু আমার নজরে পড়ছে তা নিছকই পাগলামি, বদ্ধ পাগলের লক্ষণ। হ্যাঁ, পাগলের লক্ষণই বটে। মাঝে-মধ্যেই লক্ষ্য করেছি সে মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কোনো কাল্পনিক শব্দ শোনার অত্যুত্র আগ্রহেই সে যেন এমনটা করে। বন্ধুর অবস্থার ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে দেখে আমি দারুণ আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমার মধ্যেও যেন কেমন অভাবনীয় একটা পরিবর্তন একটু একটু করে প্রকাশ পেতে লাগল, বুঝতে পারলাম। তবে, তবে কি তার অবস্থা আমার মধ্যেও সংক্রমিত হতে চলেছে? আমিও কি তার দলেই পৌঁছে গেছি?
আমার বন্ধুর একেবারেইনিজস্ব মনগড়া অথচ দৃঢ় লক্ষ্যণীয় কুসংস্কারগুলোর প্রভাব যেন এক-এক আমার মধ্যে প্রকাশ পেতে লাগল। আর তা নিশ্চিত হয়ে উঠতে লাগল। ব্যাপারটা এতই দৃঢ়ও নিশ্চিত যে নজরে পড়তে বাধ্য।
একটা রাতের ঘটনা বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। মৃতা লেডি ম্যাডলিনকে ভূগর্ভস্থ আশ্রয় কক্ষে রেখে আসার পর সপ্তম-অষ্টম রাতের ঘটনার কথা বলছি। সে রাতে আহারাদি সেরে বিছানা আশ্রয় নেবার পরপরই আমার সে বিশেষ অনুভূতির পূর্ণ শক্তির অভিজ্ঞতা আমি লাভ করলাম।
ব্যাপারটা কি তাই না? বলব, সবই খোলসা করেই বলব, আর গোপনও রাখব না কিছুই। বিছানা শুয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে অনবরত পা দুটো নাচিয়েই চলেছি। কিছুতেই ঘুম আসতে চাইছে না। চোখ বন্ধ করেনিদারুণ অস্থিরতা আমার মধ্যে ভর করল। কতক্ষণ আর বিদ্রি অবস্থায় বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব?
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিলাম।
আমার মধ্যে যে স্নায়বিক উত্তেজনা পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নিয়েছে, নানা যুক্তি বুদ্ধির সাহায্যে তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেকে হালকা করার চেষ্টা করলাম।
নানা যুক্তির অবতারণা করে নিজের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, সম্পূর্ণরূপে না হলেও অন্তত আংশিক আমার এ আকস্মিক অনুভূতির কারণ এ-ঘরটার বিষণ্ণ দর্শন আসবাবপত্রের অস্বাভাবিকতার প্রভাব। চোখের পাতা মেলতে আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল, বাইরে থেকে আসা ঝড়ো হাওয়ার ঝাঁপটায় দরজা-জানালার ভেঁড়া আর কালো পর্দাগুলো অবিশ্বাস্যভাবে দুলছে আর বিশ্রি রকম আওয়াজ সৃষ্টি করছে। বিছানার চারদিকের আওয়াজটা আরও বিশ্রি ও অস্বস্তিকর পৎ-পৎ ঘঘসে হয়ে উঠছে আমার বিছানাটার চারদিকে।
ক্রমেই একটা অস্বাভাবিক কাঁপুনি নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার মধ্যে ভর করল। একেবারে অসহ্য! পরিস্থিতিটা আমাকে একেবারেই অস্থির করে তুলল। অস্থিরটা ক্রমেই বেড়ে চলল। এক সময় সেটা আমার বুকে জগদ্দল পাথরের মতো কঠিন বোঝা হয়ে চেপে বসল।
দীর্ঘ সময় ধরে নিজের মনের সঙ্গে লড়াই করে জোর করে অবাঞ্ছিত সে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিটাকে মন থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে ঝট করে উঠে বসে পড়লাম।
বিছানায় বসে উৎকর্ণ হয়ে চার দেওয়ালে ঘেরা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার পরিবেশটার দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকার পর কেন বলতে পারব না–আমার ভেতর থেকে নির্দেশ পাওয়া তাগিদেই হয়–আরও বেশি মনঃসংযোগ করে উকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করে ঝোড়ো। বাতাসটার সাময়িক বিরতির ফাঁকে ফাঁকে শুনতে পেলাম, কারো যেন নিঃশব্দে পদচারণা করার আওয়াজ। আর সেটা ধীরগতিসম্পন্ন হলেও নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে আসছে। অস্পষ্ট সে আওয়াজটার উৎস কোথায় আমার জানা নেই।
আমি আরও কয়েক মুহূর্ত অসহ্য এবং দুর্বোধ্য আতঙ্কের তীব্র অনুভূতিতে বিপর্যস্ত হয়ে অন্ধকারে হাতড়েই আলনা থেকে পোষাক টেনে নিলাম। সাধ্যমত ব্যস্ততার সঙ্গে পোষাক বদলেই আমিনিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগলাম। এর উদ্দেশ্যে সে অসহ্য করুণ অবস্থাটা কাটিয়ে নিজেকে হালকা করতে পারি। অন্ধকার ঘরের মধ্যে আমি নিরবচ্ছিন্নভাবে পায়চারি করছি তো করছিই।
নিদারুণ আতঙ্ক আর নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বার কয়েক পায়চারি করার পর মনে হল, সিঁড়ি থেকে যেন মৃদু পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। মুহূর্তের জন্য উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করার পর বুঝতে পারলাম, পায়ের শব্দটা পরিচিত বন্ধু আশায় আসছে।
পর মুহূর্তেই আমার দরজায় বার কয়েক হালকা টোকা দিয়েই সে জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখটা খুবই ফ্যাকাশে বিবর্ণ দেখলাম। তবে তার দুচোখের তারায় উন্মাদ মানুষের বিশেষ ধরনের উচ্ছ্বাসটুকুও আমার নজর এড়াল না। আর এও লক্ষ্য করলাম, তার চোখ-মুখে সংযত মৃগী রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ। তার অভাবনীয় লক্ষণ দেখে আমার মধ্যে অবর্ণনীয় ভীতির সঞ্চার ঘটল। তবু সে অসহ্য নীরবতার মধ্যে এতক্ষণ কাটাতে হয়েছে, জোর করে সহ্য করেছি, সে তুলনায় অন্য সবকিছুই আমার কাছে বরণীয়ই মনে করলাম। আর যা-ই হোক না কেন, বন্ধুর উপস্থিতিতে আমি বড়ই স্বস্তি পেলাম। ঠিক এমনকিছুই যেন আমি প্রত্যাশা করছিলাম।
