যে সব পথিক সে উপত্যকায় এখন অবস্থান করছে তারা রঙিন খোলা-জানালা দিয়ে দেখছে, বিচিত্র বেসুরো বাজনার তালের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে অতিকায় সব মূর্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে নেচে চলেছে। আর? হ্যাঁ, আরও আছে বিষণ্ণ খোলা-দরজা দিয়ে অধিকতর কদাকার একেবারেই বীভৎস সব মানুষ দল বেঁধে উত্তাল উদ্দাম আর দ্রুতগামী নদীর মতো ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের মুখে সরব হাসি, অট্টহাসিতে তারা ফেঁটে পড়ার জোগার। তবে এও খুবই সত্য যে, তাদের মুখে আর কোনোদিন মিষ্টি মধুর হাসির রেখা দেখা যাবে না কোনোদিনই না।
বন্ধুবর আশার এক সন্ধ্যায় একেবারেই আচমকা আমাকে লেডি ম্যাডেলিনের মৃত্যু সংবাদ দিল। আর সে সঙ্গে আমার কাছে প্রস্তাব রাখল, তার মৃতদেহটা এক পক্ষ কালের জন্য তাদের প্রাসাদের প্রধান প্রাচীরটার ভেতরের অগণিত মাটির তলার কামরাগুলোর মধ্যে একটাতে সাময়িকভাবে রেখে দেওয়া হবে।
তার কথাটা আমার কাছে কেমন যেন অস্বাভাবিকই মনে হল। তবুও কি-ই বা। বলব ভেবে না পেয়ে বিষণ্ণ মুখে তার দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকলাম।
সে-ই আবার বলতে লাগল। তবে গৃহীত এ বিশেষ ব্যবস্থাটার সমর্থনে সে যে পার্থিব যুক্তির অবতারণা করল, আমি ইচ্ছে করেই তার বিরুদ্ধে কিছু বলিনি, এতটুকুও প্রতিবাদ করিনি।
আপত্তি তো করিনি বরং বন্ধুর অনুরোধে লেডি ম্যাডেলিনের মৃতদেহের এ সাময়িক সমাধি-কাজে তাকে সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতাই করেছি।
মৃতদেহটাকে কফিনের ভেতরে রেখে আমরা উভয়ে মিলে ধরাধরি করে সমাধিস্থলে নিয়ে গেলাম। মাটির তলার যে কামরাটায় সেটাকে রাখা হলো সেটা খুবই ছোট। তারপর সেটা একেবারে সঁতসেঁতে ও আলো ঢোকার মতো কোনো পথই নেই।
প্রাসাদটার যে অংশে আমার শোবার জায়গা তারই ঠিক নিচে, অনেক তলায় সে কামরাটা। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বহুকাল আগে সামন্ততন্ত্রের আমলে এ কামরাটাকে বিপদের মুহূর্তে আশ্রয় নেবার কাজে ব্যবহার করা হত। একবার কোনোরকমে সেখানে আশ্রয় নিতে পারলে তার হদিস পাওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।
এর পরবর্তীকালে গোলা-বারুদ এবং অন্যান্য দাহ্য পদার্থের গুদামঘর হিসেবে এ কামরাটাকে ব্যবহার করা হত। আর এজন্যই কামরাটার অংশ বিশেষ আর সুড়ঙ্গ পথটার আগাগোড়া তামার পাত দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। আর দরজাটাকে তৈরি করা হয়েছে পেটা লোহার পাত দিয়ে, কামরাটাকে অধিকতর সুরক্ষিত করা হয়েছে।
পেটা লোহার দরজাটা এতই মজবুত আর ভারী যে, হাঁসকলের ওপর তার পাল্লাটাকে ঘুরিয়ে খোলা বা বন্ধ করার সময় বিশ্রি ধাতুর ক্যাচু ক্যাম্ আওয়াজ করে। আর টানাটানি করতে দম বেরিয়ে যাবার জোগাড় হত।
আমাদের শোক দুঃখের বোঝা কফিনটাকে সে ভয়-ভীতির রাজ্যে নামিয়ে রেখে তার-ঢাকনাটাকে সামান্য খুললাম। এবার মৃতার মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তার মুখটাকে বার বার দেখে ভাই-বোনের মুখের আদলের অস্বাভাবিক মিল খুঁজে পেলাম। আর এদিকে এবারই প্রথম আমার নজর পড়ল। আর আমার তখনকার মানসিক পরিস্থিতিটার কথা ভেবেই হয়তো বন্ধু আশার আমার আসাকে লক্ষ্য করে এমনকিছু বক্তব্য রাখল, যা আমি ইতিপূর্বে শোনা তো দুরের ব্যাপার স্বপ্নেও ভাবিনি। সে বলল, মৃতার মুখে তার মুখের ছাপ খুঁজে পাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ তারা দুজন ছিল যমজ ভাই-বোন। আর দুজনের একজনের প্রভাব অন্যের মধ্যেও পড়ত। এ দুর্বোধ্য প্রকৃতির প্রভাব শেষপর্যন্তই লক্ষিত হয়েছে।
তবে এও সত্য যে, মৃতার মুখের দিকে দীর্ঘ সময় দৃষ্টিকে আবদ্ধ রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হলো না। সত্য গোপন না করলে বলতেই হয়, কেমন যেন একটা ভয় ভীতির অনুভূতি আমাদের মনকে ক্রমেই দুর্বল করে দিতে লাগল।
সে ভয়ঙ্কর ব্যাধি ভরা যৌবনকালেই হতভাগিনীকে নিষ্ঠুর সমাধিক্ষেত্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। তার স্বাভাবিক ফলস্বরূপই তার মুখ ও বুকে রক্তিম এক আভা প্রকাশ পেয়েছে। আরও আছে, তার ঠোঁট দুটোতে এমন একটা ভয়ঙ্কর রহস্যময় হাসির প্রলেপ ছড়িয়ে পড়েছে যাতে মৃতার মুখর মুখটাকে অধিকতর ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। মুহূর্তের জন্য সে দিকে তাকালেই আতঙ্কে বুকের মধ্যে ধড়াস্ করে ওঠে, শরীরের রক্ত হিম হয়ে আসতে চায়।
আমরা ব্যস্ত-হাতে ঢাকনাটাকে কফিনের ওপর নামিয়ে রাখলাম। তারপর এক এক করে ভ্রু কটা লাগালাম। এবার টানাটানি করে লোহার দরজার পাল্লাটা বন্ধ করে দিলাম। এবার বহু পরিশ্রম করে বাড়ির ওপর তলায় উঠালাম। মৃতদেহসহ কফিনটা রইল আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, অনেক নিচে।
আমরা উভয়ে অসহনীয় শোক-তাপের মধ্য দিয়ে দিন-কয়েক কাটিয়ে দিলাম।
এবার আমার বন্ধুবর আশার-এর মধ্যে মাথার দোষের কয়েকটা উল্লেখযোগ্য লক্ষণ প্রকাশ পেতে লাগল। সেগুলোর কোনোটাই আমার নজর এড়াল না। আর আমি এও লক্ষ্য করলাম, তার মধ্য থেকে স্বাভাবিক কথাবার্তা আর চালচলন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
আমি তাকে যতই দেখছি, ততই অবাক হতে লাগলাম। বন্ধুর স্বাভাবিক কাজকর্মের প্রতি দারুণভাবে অনীহা প্রকাশ পাওয়াটাও আমার নজর এড়াল না। আর ইদানিং তার সব কাজে সে কেমন ভুল করে বসছে। আরও আছে। সে লম্বা-লম্বা পায়ে, অসমানভাবে পা ফেলে ফেলে আর বিনা উদ্দেশ্যে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়।
