‘আশার আলয়’-এর মালিকের সঙ্গে এভাবে একা যে নিরানন্দময় মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করছিলাম, সে গভীর স্মৃতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে চির জাগরুক রাখব। ইচ্ছা করলেও আমি অবশ্যই তাকে অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পারব না।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, সে স্মৃতির যর্থাথ রূপটা কোনোদিনই আমি উদ্ধার করতে পারব না। ফলে কারো কাছেই প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।
অথচ সত্যি কথা বলতে কি, আমার মধ্যে সম্পূর্ণ নিরাকার একটা ধারণা যেন সবকিছুর ওপর গন্ধকের আলোকশিখা ছড়িয়ে দিয়েছে। তার দীর্ঘ কাল্পনিক বিষণ্ণ নীতিগুলো চিরটাকাল ধরে আমার কর্ণকুহরে গুনগুন স্বরে বেজে বিষ-জ্বালায় জর্জরিত করবে।
অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে একান্ত দুঃখ-বিষাদেই অন্তরের গোপন করে তার ইচ্ছানুযায়ী রূপ দেওয়া ভন বেবার-এর দ্বৈত নৃত্যের বিকৃত আর বাড়িয়ে বাড়িয়ে রূপদান করা মাধুর্যকে সযত্নে পুষে রেখেছি।
আমি অত্যন্ত মনযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করে উপলব্ধি করেছি, রঙ-তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসের গায়ে মনোলোভা ছবি ফুটিয়ে তুলতে গিয়েই তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা-উদ্দামতা প্রকাশ পেত। তুলির সাহায্যে রঙের ওপর রঙের পোচ দিতে দিতে এক সময় তার ছবিটা কোনো এক অস্পষ্টতার জগতে উন্নীত হয়ে যায়। আর চোখের সামনে সেটাকে প্রত্যক্ষ করার ফলে উত্তেজনায় আমার মধ্যে অবর্ণনীয় কম্পনের উদ্ভব হত।
আমার বন্ধুবরের সহজ-সরল মানসিকতা আর খোলামেলা পরিকল্পনার ফলেই আমার মন অল্পতেই আকৃষ্ট হয়। কেউ যদি কোনোদিন তুলির টানে ভাবনার ছবি ফুটিয়ে তোলে তবে মনে করতে হবে সে অবশ্যই রডেরিক আশার ছাড়া কেউ নয়।
এবার আমি তার এ অদ্ভুত মানসিকতার ছোট দুটো নজির তুলে ধরছি। ছোট একটা ছবিতে একটা চৌকো মাটির তলায় ঘর দেখানো হয়েছে, সুড়ঙ্গের ভেতরের অংশটাও হতে পারে। তারনিচু-নিচু দেওয়ালগুলো খুবই তেলতেলে। রঙ সাদা আর কারুকার্যবিহীন। অনুসন্ধিৎসু নজরে দৃষ্টিপাত করলে এসব স্পষ্ট নজরে পড়ে। শুধু কি এ-ই! রঙ আর তুলির আঁচড়ে খুব চমৎকারভাবেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, পৃথিবীর সমতল ক্ষেত্র থেকে অনেক, অনেক গভীরে মনন কাৰ্যটা চালানো হয়েছে।
আলো-বাতাস ঢোকার উপযোগি কোথাও কোনো ফাঁক বা গর্ত করা নেই, আবার কোনো কৃত্রিম আলো, এমনকি মশালের ব্যবহারও নেই। তবুও একটা আলোকচ্ছটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সম্পূর্ণ অঞ্চলটাকেই আলোকিত করে দিয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, একটা ভৌতিক আলো, একটা অনুপযোগি উজ্জ্বলতা যেন সবকিছুকেই তলিয়ে দিয়েছে।
তার এ কল্পনাশক্তিকে অসংযত ছাড়া অন্য কোনো আখ্যা দেওয়া যায় বলে জানা নেই। তার এরকম কল্পনাশক্তি প্রকাশের ব্যাপারেও কম প্রকটিত নয়, ভাবা যেতে পারে। তার ঠিক এমনই উদ্দাম ও অসংযত রচনার কথা আজও আমার স্মৃতির পাতায় গাঁথা রয়েছে।
কেন আজও আমি মনের গোপন কন্দর থেকে তার সে রচনাটা ধুয়ে মুছে ফেলতে পারিনি, তাই না? সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, তার রচিত কবিতা মাত্র একবার পাঠ করেই আমি অনুধাবন করে নিয়েছিলাম যে, তার মেধাশক্তি যে নিজের সিংহাসনের ওপরেই হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে–সে ব্যাপারে আমার বন্ধুবর আশারের পরিপূর্ণ চিন্তাধারা সেখানেই স্পষ্ট হয়ে উঠে, ধরা পড়ে। আর কবিতাটার শিরোনাম দেওয়া হয়েছিল ভুতুড়ে অট্টালিকা। আর তার বক্তব্য মোটামুটি এরকম–
পরীরা দল বেঁধে আমাদের সবুজ উপত্যকায় বাস করত। একদিন সেখানে গড়ে তোলা হলো আকাশচুম্বী সুদৃশ রাজপ্রাসাদ। তার অবস্থিতি হলো চিন্তা-মহারাজার রাজ্যে। এমন নির্মল মনোলোভা আকাশে কোনো দেবদূতই কোনোদিন মেলেনি।
প্রাসাদটার শীর্ষদেশে হলুদ, সোনালি আর অত্যুজ্জ্বল পতাকাগুলো বাতাসে অনবরত উড়ে বেড়াত। প্রাচীনকালের বহু যুগ পূর্বের এ কাহিনী। সে মনোরম দিনগুলোতে মৃদুমন্দ বাতাস যখন ধূসর সুউচ্চ প্রাচীরের গা বেয়ে প্রবাহিত হত তখন সুমিষ্ট একটা বাতাস যেন পাখায় ভর দিয়ে দূর থেকে দূরান্তের উদ্দেশে নেচে নেচে হেলে দুলে পাড়ি জমাত।
সে সুখদায়ক উপত্যকার পথ ধরে যেসব পথিক আসত, তারা আলোকিত দুটো খোলা জানালা দিয়ে পরীর দলকে দেখত, বাঁশির সুরের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মনোরম ভঙ্গিতে নাচছে। আর তারা নাচছে পাথরের মূর্তির মতোই নিশ্চল-নিথরভাবে। সে রাজ্যের রাজা ঝলমলে পোশাক পরে সিংহাসন আগলে বসে রয়েছেন।
সুসজ্জিত ও সুদৃশ্য সে রাজপ্রাসাদের প্রতিটা দরজায় মণিমুক্ত সর্বদা দ্যুতি ছড়াত, ঝলমল করত।
আর যে রাজপথ দিয়ে সুসজ্জিত সৈন্যদের প্রতিধ্বনিতে আকাশ মুখরিত হয়ে উঠত। আর হবে না-ই বা কেন? গান গাওয়াই যে তাদের এক কাজ। কিন্তু তারা কি গায়, কোন গানে মাতোয়ারা হয়ে থাকে, দেশের রাজার অনন্য বুদ্ধিমত্তা আর অফুরন্ত জ্ঞানের কথা গানের কলির মাধ্যমে তারা তুলে ধরত।
কিন্তু সুদিনের হাসি-আনন্দ উঠে গিয়ে রাজ্য জুড়ে নেমে এলো দুঃসময়। দুঃখ দুর্দশার রূপ ধরে দুর্দিন এলো। রাজা মশাইয়ের রাজ্য আক্রান্ত হল। হায়! এসো আমরা এ অভাবনীয় দুঃসময়ের জন্য শোক প্রকাশ করি। কেন? কারণ তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন আর কোনোদিনই নতুন প্রভাতের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হবে না।
তার প্রাসাদটাকে ঘিরে যে গৌরবের ফুলগুলো ফুটে থাকত আজ তা নিছকই স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। আর আজ সেটা মহাকালের সমাধিতে সমাহিত হয়ে নজরের আড়ালে চলে গেছে।
