আমি তার কথার কি উত্তর দেব ভেবে না পেয়ে নীরব চাহনি মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
আমি তার প্রতিটা কথা, প্রতিটা মুহূর্তের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে লাগলাম। তার উক্ত কথাবার্তা ছাড়াও আমি তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে, টুকরো টুকরো আকার ইঙ্গিত থেকে তার মানসিক পরিস্থিতির আর একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে পারলাম। সে যে বাড়িটায় বাস করছে দীর্ঘ দিনের মধ্যে সে বাড়ির বাইরে আসেনি সে পারিবারিক প্রাসাদোপম বাড়িটাই দিনের পর দিন বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন আকারে তার মনের ওপর নিজের অশুভ ছায়াপাত করেছে। এ জীর্ণ বাড়িটার ধূসর দেওয়ালগুলো, সারিবদ্ধ গম্বুজ আর ছায়া-ছায়া হ্রদটার স্থির জলে তাদের প্রতিচ্ছবি! এ সবই শেষপর্যন্ত তাকে বিপর্যস্ত, সম্পূর্ণরূপে বিপন্ন করে তুলেছে। আজ সে চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে সহজে না হলেও, দীর্ঘ ইতস্ততের পরই সে এ-কথাটাও মেনে নিয়েছে, তার এ অদ্ভুত বিষণ্ণতার পিছনে আরও একটা স্বাভাবিক ও সহজবোধ্য কারণ রয়েছে।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম। আমার জিজ্ঞাসা দূর করতে গিয়ে সে এবার যা বলল–‘কি সে কারণ, এটাই তোমার জিজ্ঞাস্য? সে কারণটা হচ্ছে, আমার বোন, বড় স্নেহের বোন, আমার বহু বছরের একমাত্র সাক্ষী। এ পৃথিবীতে আমার সর্বশেষ আর একমাত্র আত্মীয়ার বহুদিন ধরে কঠিন ব্যাধি, মৃত্যু, হ্যাঁ, মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তার অনিবার্য অন্তিম পরিণতি।
যে বিষণ্ণতার কথাটা সে আমার দিকে ছুঁড়ে দিল তা কোনোদিনই আমার মন থেকে মুছে যাবে না।
সে এবার একই রকম তিক্ততার সঙ্গে বলল–‘তার বিচ্ছেদ, তার মৃত্যু সুপ্রাচীন আশার বংশের সর্বশেষ বংশধর করে আমাকে রেখে যাবে।
ম্যাডেলিন তার বোনের নাম। লেডি ম্যাডেলিন নামেই সে পরিচিত। আমার বন্ধুবর যখন আমার কাছে কথাগুলো বলতে লাগল তখন লেডি ম্যাডেলিন ঘরটার এক প্রান্তে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে লাগল। সে ঘরে আমার উপস্থিতি লক্ষ্য না করেই সে ধীরে-মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দৃষ্টির একেবারে বাইরে চলে যায়।
তাকে দেখামাত্রই আমার ভেতরে দেখা দিল আতঙ্ক মিশ্রিত অসীম বিস্ময়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, তার কোনো কারণই আমার মাথায় এলো না।
আর তার ক্রমে দূরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পা দুটোর দিকে চোখ পড়তেই আমার মন কেমন একটা অবর্ণনীয় ঘোর নেমে এলো। আমি যে কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম তা নিজেই বুঝে উঠতে পারলাম না। অন্যকে কি বুঝাব?
শেষপর্যন্ত কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলেই আমার চোখ দুটো যন্ত্রচালিতের মতো তার ভাইয়ের মুখের ওপর গিয়ে পড়ল। কিন্তু ইতিমধ্যেই সে হাত দুটো দিয়েনিজর মুখটাকে ঢেকে ফেলেছে।
আমি তার মুখটা দেখতে পেলাম না। কেবলমাত্র এটুকুই লক্ষ্য করলাম, তার যারপরনাই ক্লান্ত, ফ্যাকাশে বিবর্ণ কাঁপা-কাঁপা শীর্ণ আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে অনেক ব্যথা-বেদনার অশ্রু ফোঁটা ফোঁটা করে ঝরে পড়ে মেঝেটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা লেডি ম্যাডেলিনের রোগের উপশম ও তার রোগমুক্তি ঘটাতে দীর্ঘদিন যাবৎ বৃথাই কঠিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন।
সে ক্রমেই শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়ে পড়তে লাগল আর সে সঙ্গে শক্তি সামর্থ্য হারিয়ে একেবারেই কাহিল হয়ে পড়ল। এতদিন ধরে সে যে রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই কঠিন ব্যাধির যাবতীয় বোঝা বহন করে বেরিয়েছে, প্রাণপনে লড়াই করেছে–ভুলেও কোনোদিন বিছানা আশ্রয় নেয়নি।
কিন্তু সে প্রাসাদোপম জীর্ণ বাড়িটায় আমার উপস্থিত হওয়ার প্রথম দিনই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, অন্ধকারে সবকিছু তলিয়ে গেলে সে সবটুকু শক্তি নিয়োগ করে আত্মনিবেদন করে দিল। তার ভাই সে রাতেই অন্তহীন দুঃখের মধ্যে আমার কাছে কথাটা ব্যক্ত করেছিল। তার মুখ থেকে শোনা বিবরণটুকু ছাড়াও আমি জানতে পেরেছিলাম, সেদিন মুহূর্তের জন্য তাকে সে আমি দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম, সেটাই তাকে আমার প্রথম দেখা, আর যা-ই হোক, অন্তত জীবিত অবস্থায় তাকে আর আমার পক্ষে দেখা সম্ভব হবে না, কোনোদিনই না।
সে ঘটনার পর এক-এক করে বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। আমার বন্ধুবর আশার বা আমি তার সম্বন্ধে আলোচনা করা তো দূরের ব্যাপার, তার নামটাও মুখে উচ্চারণ করলাম না।
আমি বন্ধু আশার-এর মন থেকে দুঃখের বোঝাটিকে লাঘব করতে না পারলেও কিছুটা অন্তত হালকা করার জন্য নিজেকে লিপ্ত রাখলাম।
আমার বন্ধুর মনকে একটু আধটু চাঙা করে রাখার উদ্দেশ্যে কখনও তাকে নিয়ে ছবি আঁকতে বসি, আবার কখনও বা পাশাপাশি বসে পুঁথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করি। আবার এমনও করি যে গিটারে মনগড়া সুরের মূৰ্ছনা তুলে আর আমি চোখ বুজে তন্ময় হয়ে শুনি।
এভাবে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের আন্তরিকতা ক্রমে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়ে উঠতে লাগল। আর সে-ও আমার কাছেই একটু-একটু করে এমন সহজ হয়ে উঠতে লাগল যে তার মনের জানালাগুলো এক এক করে আমার কাছে খুলে দিতে লাগল। আমার কাছে কোনো কথা ব্যক্ত করতে তিলমাত্র দ্বিধাও সে করে না।
আর আমি তার বেদনাভরা মনের দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে ক্রমেই বেশি করে উপলব্ধি করতে লাগলাম যে, এমন প্রাণকে আনন্দ ফুর্তিতে ভরপুর করে তোলার যাবতীয় প্রয়াসই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। এর কারণ, বুকের অন্ধকার কন্দর থেকে উৎসারিত অন্তহীন এক বিষণ্ণতার স্রোত তার দৈহিক ও দেহের বাইরের বিশাল জগৎকে চিরদিনের মতো হতাশার পর্দা দিয়ে আবৃত করে দিয়েছে। অন্ধকার, চরমতম নৈরাশ্যের সাগরেনিমজ্জিত হয়ে সে এখন হাবুডুবু খেয়ে চলেছে।
