আর তার মাথার রেশমের মতো মিহি আর মোলায়েম চুলগুলো দীর্ঘ অবহেলা অবজ্ঞায় ঘাঢ় ছড়িয়ে পিঠ পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। আর ছোট ছোট কিছু চুল বাতাসে এলোমেলোভাবে মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে অস্বাভাবিক দোল খাচ্ছে।
আমি অপলক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অনেক চেষ্টা করেও তার মুখের আবরণ সুলভ কারুকার্যকে কিছুতেই একটা সহজ সরল প্রকৃতির মানুষের মুখের। সঙ্গে মেলাতে পারলাম না। বার বার চেষ্টা করেও আমাকে হতাশই হতে হল। শেষপর্যন্ত ব্যর্থ প্রয়াস থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।
আমি বন্ধুর সান্নিধ্যে আছি বটে, কিন্তু তার প্রতিমুহূর্তের চালচলন আর কথাবার্তায় কেমন যেন লক্ষ্য করার মতো অসংলগ্নতা, অস্বাভাবিক রকম অসামঞ্জস্য বিরাজ করতে দেখলাম।
আমি কৌতূহল মিশ্রিত আতঙ্কের সঙ্গে তার প্রতিটা মুহূর্ত লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম তার মধ্যে একটা অভ্যাসগত কাঁপুনি ক্রিয়া করে চলেছে। স্নাবিক একটা উত্তেজনাকে জয় করার ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফলেই তার মধ্যে এমন কাণ্ডের প্রকাশ ঘটছে।
তবে এও সত্যি যে, তার চিঠি পাওয়ার পর এরকমই কোনো অদ্ভুত পরিস্থিতি মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমি তৈরি হয়ে তবেই পা-বাড়িয়েছি আর আমি এও লক্ষ্য করলাম। তার যাবতীয় আচরণ আর কাজকর্ম ছিল ফুর্তিতে উজ্জ্বল, আবার পরমুহূর্তেই বিষণ্ণতায় ভরপুর-পাত্র। তার কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ঘটেছে অস্বাভাবিক দ্রুত, আর অস্থিরতার জন্যই অভাবনীয় কাঁপা কাঁপা।
তার মধ্যে যখন তীব্র উত্তেজনা ভর করে তখন মনে হয় সে বুঝি নেশার ঘোরে রীতিমত ঝুঁদ হয়ে রয়েছে, আফিমখোররা মাত্রাতিরিক্ত আফিম সেবন করে বুঝি এমন বেসামাল হয়ে পড়ে।
আমি তার মুখোমুখি বসে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে কিছু ধারণা করে নেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ঠিক তখনই সে একই ভঙ্গিতে অনর্গল বলে যেতে লাগল, যে কেন পত্র মারফৎ আমাকে এখানে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছে। সে নিজের উদ্দেশ্যের কথা আমার কাছে ব্যক্ত করতে গিয়ে বলল–‘বন্ধু, তোমাকে একবারটি চোখে দেখার জন্য বড়ই আগ্রহ–চিত্তচঞ্চল বোধ করছিলাম। কথাটা বলেই সে এক-এক করে বলে যেতে লাগল, আমার কাছ থেকে সে কতখানি সান্ত্বনা প্রত্যাশা করে।
মুহূর্তের জন্য নীরব থেকে আমার মুখের ছাপ কতটুকু বদলে যায়, তার বক্তব্যকে আমি কিভাবে নিচ্ছি বোঝার চেষ্টা করে নিয়ে তারপর নিজের ব্যাধির কথা খোলসভাবে আমার কাছে বলল।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালে সে আবার মুখ খুলল–‘শোন বন্ধু, এটা আমাদের পারিবারিক ব্যাধি। বংশ পরম্পরায় আমাদের এ ব্যাধির শিকার হতে হয়। মৃত্যুও হয় এ ব্যাধির কল্যাণে।
তিনি বিষণ্ণ কণ্ঠে, প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করল–‘তাই বুঝি?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। এ ব্যাধির কবল থেকে অব্যাহতি বা নিরাময়ের সামান্যতম আশাও নেই বন্ধু।
পর মুহূর্তেই আবার বলল–‘তোমাকে বলা হয়নি, রোগটা আসলে স্নায়ুবিক। শীঘ্রই সেরে উঠব।
তার কথায় বুঝলাম, ইন্দ্রিয়গুলোর মাত্রাতিরিক্ত তীক্ষ্ণতার জন্যই সে ভুগছে। সব খাবার তার শরীর বরদাস্ত করতে পারে না। কেবলমাত্র স্বাদহীন খাদ্যবস্তুই সে সহ্য করতে সক্ষম। আর পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারেও বাধানিষেধ রয়েছে। কেবলমাত্র বিশেষ প্রকার হাতের তাঁতে বোনা কাপড়ের পোষাকই ব্যবহার করতে পারে। আরও আছে। যাবতীয় গন্ধদ্রব্য তাকে যারপর নাই কষ্ট দেয়। আলোক রশ্মি তার কাছে বড় পীড়াদায়ক। এমনকি মৃদু আলোও তার চোখ দুটো বরদাস্ত করতে পারে না। কিছু সংখ্যক বিশেষ ধরনের শব্দ এবং তার নিজের যন্ত্রর বাজনা ছাড়া অন্য যে কোনো শব্দ তাকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে, আতঙ্কে সে কুঁকড়ে যায়।
আমি তার ব্যাপার স্যাপারের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে এ সত্যই উপলব্ধি করতে পারলাম, সে যেন এক বিশেষ আতঙ্কের কবলে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছে।
আমি তার শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাব, কিন্তু আমাকে সে সুযোগ না দিয়েই সে-ই আবার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ এঁকে বলল–জান বন্ধু, আমি মরে যাব! মরেই যাব। এ শোচনীয় বোকামিই আমার অনিবার্য মৃত্যু ঘটাবে।
আমি তাকে প্রবোধ দিতে গিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করতেই সে-ই আবার বলল– ‘হ্যাঁ, আমি মরেই যাব। এ ভাবেই হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই। অন্য কোনো ভাবে অবশ্যই নয়। তাদের ফলাফলকে নিয়ে আমার যত ভয়, যত আতঙ্ক। আমার মনের ও অসহনীয় ক্ষোভের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারার মতো কোনো ঘটনাই কেবল নয়, অতি সামান্য কোনো ঘটনার কথা আমার মনের ওপর উঁকি দেওয়ামাত্র আমি আতঙ্কে চমকে উঠি, একেবারে কুঁকড়ে যাই।
মুহূর্ত কাল নীরবতার মধ্য দিয়ে সে লক্ষ্য করল, তার কথাগুলোকে আমি কিভাবে নিচ্ছি। তা বোঝার চেষ্টা করে সে আবার মুখ খুলল–‘হ্যাঁ বন্ধু, যে কোনো ঘটনা, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা আমার মনের কোণে উঁকি দিতেই আমার অন্তরাত্মা যেন শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে যায়। একটা কথা কি জানো, সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে আমি অবজ্ঞার চোখে দেখি না, একমাত্র ভয়কেই আমি দারুণ ঘৃণা করি।
আমার ভয়ঙ্কর স্নায়বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, আজ বা কাল যেদিনই হোক এক নির্মম অপচ্ছায়া যাকে লোকে আতঙ্ক আখ্যা দিয়ে থাকে, তার সঙ্গে লড়াই চালাতে চালাতেই জীবন আর যুক্তি-বুদ্ধির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতেই হবে। মোদ্দা কথা, আতঙ্কই আমাকে চরম পরিণতির মুখে ঠেলে দেবে, বুঝলে?
