চারদিকের দৃশ্যের ওপরে চোখ বুলাতে বুলাতে পাকা রাস্তাটা পেরিয়ে বাড়িটার সদর দরজায় হাজির হলাম।
চাকর দরজায়ই অপেক্ষা করছিল। আমাকে দেখেই ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে এসে ঘোড়ার লাগামটা হাতে ধরেনিল।
আমি সদর-দরজা দিয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে গথিক রীতিতে তৈরি মিলানের তলা দিয়ে হলঘরটায় হাজির হলাম।
ঠিক তখনই খানসামা নিঃশব্দে হলঘরে ঢুকে আমাকে নিয়ে এ ঘর-ও ঘরে ফাঁক দিয়ে অন্ধকার বারবার বাঁক নেওয়া পথ ধরে মালিকের স্টুডিওর দিকে হাঁটতে লাগল। আমি তাকে অনুসরণ করে স্টুডিওর দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
পথ চলতে চলতে বাড়িটায় যা-কিছু আমার চোখে পড়ল তাতে আমার আগেকার ধারণাই অনেকাংশে বেড়ে গেল। ঘর আর বাইরের দেওয়ালের কারুকার্য, দেওয়ালে ঝুলন্ত জীর্ণ পর্দাগুলো, আবলুশ কাঠের রঙের মতো মেঝের কুচকুচে কালো রঙ, আর বিচিত্র কর্মচর্মের বিজয় স্মারকনিদর্শন প্রভৃতির সঙ্গে সেই ছেলেবেলা থেকেই আমার পরিচয়, খুব ভালোই চেনা। তবুও পরিচিত সব বস্তু আমার কল্পনায় কেমন একটা একেবারেই অপরিচয়ের রহস্যের পর্দার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে আমার চোখের সামনে হাজির হলো যা আমার মধ্যে অন্তহীন রহস্যের সঞ্চার ঘটাল।
একটা সিঁড়ির কাছে গিয়ে একজনের ওপর চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পারিবারিক চিকিৎসক। তার চোখের তারায় ধূর্ততা আর বিমূতার মিশ্র অনুভূতির ছাপটুকু আমার নজর এড়াল না।
চিকিৎসক ভদ্রলোক আমাকে দেখেই ভয়ে ভয়ে অভিবাদন জ্ঞাপন করে লম্বা-লম্বা পায়ে সেখান থেকে কেটে পড়লেন। আমি সবিস্ময়ে তাঁর ফেলে-যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার পথপ্রদর্শক খানসামাটা এবার আরও কয়েক পা এগিয়ে একেবারে মালিকের টেবিলের সামনে হাজির করল।
ঘণ্টা বেশ বড়সড়, ছাদও খুবই উঁচু। জালাগুলো লম্বা হলেও তুলনামূলকভাবে চওড়া কম।
ওক কাঠের ঘন কালো মেঝে থেকে জানালাগুলোর উচ্চতা এতই বেশি যে ভেতরের মেঝে থেকে সেখানে ওঠা কিছুতেই সম্ভব নয়।
জানালাগুলোর জাফরি কাটা কাঁচ ভেদ করে দিনের শেষের রক্তিম ঘরে ঢুকে এক মনোরম দৃশ্যের সঞ্চার করেছে।
আলোর ছোঁয়া পাওয়ার ঘরের ভেতরের সবকিছু দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও আমি ঘরটার কোনোগুলো আর খিলান দেখতে পেলাম না। ব্যাপারটা আমাকে যার পর নাই অবাক করল।
ঘরে আসবাবপত্রের সংখ্যা যথেষ্টই। তবে সবই সাবেকি আমলের। জীর্ণ দশা সবই প্রায় ভাঙাচোরা। তবে সেগুলো খুবই আরামদায়ক স্বীকার করতেই হবে। আর ঘরের এখানে-ওখানে বহু বইপত্র আর ছোট বড় ও হরেক আকৃতি বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্র ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। যত্নের অভাবে সেগুলোর যে কী হাল হয়েছে ভাষার প্রকাশ করা অসাধ্য!
ঘরটার ভেতরের সবকিছুর ওপর চোখ বুলিয়ে নেওয়ার পর আমার স্পষ্ট মনে হল, আমি যেন এক বিষাদপূর্ণ পরিবেশে অবস্থান করছি। আর সে বিষণ্ণতা কঠিন আর রূঢ় বাস্তবে ভরপুর।
আমার বাল্যবন্ধু আশার কে একটা সোফার ওপর পা ছড়িয়ে আয়েস করে শুয়ে থাকতে দেখলাম।
আমাকে দরজায় দেখেই সে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত সোফার আশ্রয় ছেড়ে উঠে বসে পড়ল। ঠিক একইরকম ব্যস্ততার সঙ্গে সোফা থেকে নেমে দরজায় এগিয়ে এসে আমাকে অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেল। তার অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের মধ্যে আমি এত বেশি বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করলাম যাতে পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে নিতান্ত অসঙ্গত মনে হল।
তবে মুখ তুলে তার চোখ মুখের দিকে দৃষ্টি পাত করতেই আমার বিস্ময়টুকু উঠে গেল। নিঃসন্দেহ হলাম, তার আচরণের মধ্যে কোনোরকম খাদ তো নেই-ই বরং আন্তরিকতায় ভরপুর।
আমরা এগিয়ে গিয়ে সোফার ওপারে উভয়ে পাশাপাশি বসলাম।
আমি আসন গ্রহণ করার পর কয়েক মুহূর্ত সে টু-শব্দটিও করল না। ভালো-মন্দ কোনো কথাই তার মুখ দিয়ে বের হলো না। তার নীরব মূর্তির দিকে চোখ পড়তেই অর্ধেক ঘৃণা আর অর্ধেক করুণায় আমার বুকটা কানায় কানায় ভরে উঠল।
রডেরিক আশারের আগে আর কেউ-ই কখন এমত অত্যল্পকালের মধ্যে এমন ভয়ঙ্করও অভাবনীয় পরিবর্তনের শিকার হয়ে মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়নি বলে জানা যায়।
আমি বহু চেষ্টা করে আমার মনের দ্বিধাটুকু দৃঢ় করে বোঝাতে পারলাম, আমার মুখোমুখি বসে থাকা লোকটা আমার বাল্যবন্ধু। এক সময় গভীর হৃদ্যসম্বন্ধ ছিল আমাদের উভয়ের মধ্যে।
তবে একটা কথা, তার মুখের আদল সেই ছেলেবেলা থেকেই খুবই উল্লেখযোগ্য। চোখ দুটো ছিল বেশ বড় বড় ও গোলাকার, চোখের তারা দুটো অত্যুজ্জ্বল, চকচকে, মুখটা ফ্যাকাশে বিবর্ণ। আর ঠোঁট দুটো যেন রক্তহীন, ফ্যাকাশে ও পাতলা। ঠোঁটের বাকাটা কিন্তু বড়ই দৃষ্টিনন্দন ছিল–একেবারেই অতুলনীয় নাকটার গড়ন হিব্রুদের মতোই সুন্দর। সুঢৌল থুতনিটা তার আর্থিক অভাব অনটনের লক্ষণ প্রকাশ করত। তার সে মুখটা যেন আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। আর তার আজকের মুখটা। সেদিনে সে আকর্ষণীয় মুখটার সঙ্গে তার আজকের মুখটার সামান্যতম সাদৃশ্যও নেই। আজ এতদিন পর তার মুখোমুখি বসে তার মুখটার ওপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আমি ভাবছি, আমার সামনে এটা কার মুখ? আমি কার সঙ্গেই বা কথা বলছি।
তার চেহারার আর সবকিছু ছেড়ে দিয়েও তার গায়ের বর্তমান চামড়ার অস্বাভাবিক, ভৌতিক পাতা আর চোখের তারা দুটোত অলৌকিক উজ্জ্বলতা আমাকে যারপর নাই হকচকিয়ে দিল। শুধু কি এই? আমি ভয়ে মূচ্ছা যাবার উপক্রম হলাম।
