তখন আমার মন-প্রাণকে ঘিরে ধরল এক বরফের মতো শীতলতা, পানিতে ডুবে যাওয়ার অসহায়, ব্যামোগ্রস্তের দুঃসহ যন্ত্রণা চিন্তার এমন এক প্রতিকারহীন ভয়ঙ্করতা যাকে কল্পনার মাধ্যমেও মহৎ অনুভূতির জগতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়।
কিছুটা সময় স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম, এমন কোন শক্তিতে শক্তিমান যা ‘আশার আলয়’-এর ভাবতে গিয়েই আমার মধ্যে এমন অসহনীয় অসহায়তার মধ্যে ডুবিয়ে দিল?
না, এ রহস্য ভেদ করা সাধ্যাতীত। আর সে ভাবনার জট ছাড়াতে গিয়ে আমি যে সব ঝাপসা কল্পনার জালে জড়িয়ে পড়লাম তাকেও আমি ঠিক ঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারলাম, না।
শেষমেশ নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই আমাকে এ ভালো না লাগা সিদ্ধান্তকেই স্বীকার করে নিতে হল, যদিও খুবই সহজ-সরল স্বাভাবিক ঘটনাবলি বহুক্ষেত্রেই আমাদের মনকে এমন বিধ্বস্ত করে তুলতে পারে তবু সে ক্ষমতাকে বিচার-বিশ্লেষণ করার শক্তি আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত।
আরও মনে হলো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হয়তো আমাদের মন-প্রাণের ওপর তার দুঃখ-যন্ত্রণার প্রভাব অনেকটা কমে যেত, নতুবা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। এরকম ধারণা বুকে নিয়েই ‘আশার আলয়’-এর লাগোয়া হ্রদটার একেবারে তীরে পৌঁছে লাগাম টেনে ধরে ঘোড়াটাকে দাঁড় করালাম। তার ধূসর স্থির পানির দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। কিন্তু পানির দিকে চোখ পড়তেই আমার বুকের ভেতরে হঠাৎ ধড়াস্ করে উঠল। সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল।
আরও আছে, হ্রদটার তীরবর্তী ধূসর তৃন্দ্রাচ্ছাদিত ভূমি, ভূতুড়ে গাছের কান্ডের সারি আর চোখের পাতা খোলা জানালাগুলো–এসব কিছুর ওল্টানো বিকৃত ছবি হ্রদের পানিতে ভাসতে দেখা গেল। আমি ঘোড়ার পিঠে বসেই বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে সবকিছু দেখতে লাগলাম।
এ সত্ত্বেও এবার বিষণ্ণ এ আশার আলোতে দিন কয়েক কাটিয়ে দেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।
রোডিবক আশার আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। তার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের হৃদতার সম্পর্ক। আমাদের মধ্যে শেষবার দেখা হওয়ার পর বেশ কয়েকটা বছর পেরিয়ে গেছে। ইদানিং দেশের একেবারে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসের সময় হঠাৎ তার। একটা চিঠি হাতে পাই। তাতে এমন এক জোরালো বক্তব্য ছিল যার ফলে তার চিঠিটার উত্তর না দিয়ে পারাই গেল না।
তার হস্তাক্ষরে স্নায়বিক উত্তেজনা খুবই স্পষ্ট ছিল। চিঠিটার বন্ধুবর নিজেই বলেছে, সে কঠিন ব্যামোগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যের অভাবের ব্যথা-বেদনা, তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ও প্রিয় আর একমাত্র বন্ধুও ঘনিষ্ঠতার তাগিদে আমাকে একবারটি চোখের দেখা দেখে শান্তি লাভের কথা। আর সে শেষ চেষ্টা করে দেখতে অত্যুগ্র আগ্রহী সে আমার সক্ষম লাভের ফলে তার কঠিন ব্যামো কিছুটা কমে কিনা। এসব কথার মাধ্যমে সে যেভাবে আকুল আর্তি জানিয়েছে, আরও অনেক কথা বলে আমাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছে যে আমার পক্ষে তা উপেক্ষা করার সামান্যতম সুযোগও ছিল না। তাই তো চিঠিটা হাতে পাওয়া মাত্র তার সনির্বন্ধ অনুরোধ রক্ষা করতে এখানে ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছি।
আমার বাল্যকালের অন্তরঙ্গ বন্ধু, ঘনিষ্ঠজন হওয়া সত্ত্বেও তার সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা নেই। স্বভাব বসত যে নিজেকে পর্দার আড়ালে রাখতেই বেশি উৎসাহি ছিল। সত্যি কথা বলতে কি এ ব্যাপারে সে যা-কিছু করত তাকে মাত্রাতিরিক্তই বলা চলে। তবে আমার এটুকু জানা ছিল সে স্মরণাতীত কাল থেকেই তার পরিবারের বিশেষ মেজাজ মর্জির জন্য চারদিকে যথেষ্ট নামডাক ছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ তার প্রকাশ ঘটেছিল শিল্পকলার অগণিত কারুকার্যের মাধ্যমে। আর ইদানিং কালে বিভিন্ন দরাজ হাতের কাজকর্ম আর জটিলতর সংগীতের প্রতি অত্যন্ত প্রীতি ও চর্চার মাধ্যমেও তারা কম খ্যাতি অর্জন করেনি।
আরও একটা বিশেষ উল্লেখযোগ্য তথ্য বিশেষভাবে আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়েছিল–সবার শ্রদ্ধাভাজন এ আশার বংশের প্রধান কাণ্ডটা থেকে কোনোদিনই স্থায়ী কোনো ডালপালা সৃষ্টি হয়নি। কথাটাকে অন্যভাবে, আরও সহজ করে বললে, পুরো। পরিবারটা আজ অবধি মোটামুটি একটা মাত্র বংশকেই ধরেই বয়ে চলেছে। আর একারণেই একের পর এক শতক ধরে বংশ পরম্পরায় একটা পারিবারিক ধারাই প্রবাহিত হচ্ছে বিশালায়তন এ আশার আলয়টাকে কেন্দ্র করে। তাই তো বাড়িটার পরিচয় যা-ই থাক না কেন, নিকটবর্তী পল্লীবাসীদের কাছে বাড়িটা ‘আশার আলয়’ নামটাই বেশি পরিচিত। আর এ নামটার মাধ্যমেই তাদের বংশের এবং বাড়িটার পরিচয় প্রকাশ পাচ্ছে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমি আবার চোখ ফিরিয়ে বাড়িটার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।
বাড়িটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য অতি প্রাচীনত্ব। কালের প্রভাবে বাড়িটা আর জীর্ণ আর বিবর্ণ হয়ে পড়েছে।
শ্যাওলার আস্তরণ জমেছে প্রাচীরের এখানে-ওখানে–সর্বত্র। তবে এমন কথা কিন্তু ভুলেও বলা যাবে না যে, বাড়িটা ধ্বংসের মুখে। চুন-বালির আস্তরণ ঘষে পড়েছে। এমন জায়গা ধরতে গেলে চোখেই পড়ে না। তবে কেবলমাত্র দু-চারটি পাথর খসে পড়তে চলেছে। ব্যস, এর বেশি কোনো লক্ষণ চোখে পড়ে না যাতে করে ভাবা যেতে পারে বাড়িটা ধ্বংসোনুখ।
তবে একটা কথা খুবই সত্য যে, রীতিমত অনুসন্ধিৎসু চোখে দেখলে নজরে পড়বে সামনের ছাদ থেকে একটা খুবই চিড়ধরার চিহ্ন দেওয়াল বেয়ে নেমে গিয়ে আরও এগোতে এগোতে হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ব্যস, এ পর্যন্তই।
