দ্বিতীয় কণ্ঠের কথা কানে এলো–‘আর্তনাদ! ভূতটুত দেখে এমন বুকফাটা আর্তনাদ করছে নাকি?
তৃতীয় কণ্ঠ শোনা গেল–‘বেরোও, বাইরে বেরোও।
এবার চতুর্থ কণ্ঠ কানে এলো। গভীর রাতে, এমন হেড়ে গলায় চিল্লাচিল্লি কেন, বুঝছি না তো? তার বক্তব্য শেষ হতে না হতেই হঠাই চারদিক থেকে অনেকগুলো হাত এগিয়ে এসে আমাকে একেবারে সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরল। তারপরই আমাকে এমন জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল যে মাথার ঘিলু পর্যন্ত নড়ে উঠল। ব্যস এবার সবকিছু বিদ্যুতের ঝলকানির মতোই মুহূর্তের মধ্যে এক এক করে আমার মনে পড়ে গেল।
ভার্জিনিয়ার অন্তর্গত রিচমন্ড শহরের কাছে ঘটনাটা ঘটেছিল। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে জেমস নদীর তীরবর্তী এক জঙ্গলে বন্দুক কাঁধে শিকার করতে গিয়েছিলাম।
তখন আমরা জঙ্গলে ছিলাম। একটু রাত হতে তুমুল ঝড় উঠল। আমাদের নৌকাটা পাড়ের কাছেই নোঙর করা হয়েছিল। একটা কেবিনে আমাদের থাকার। জায়গা। নৌকায় বাগান তৈরির প্রয়োজনীয় সামগ্রি ঠাসা ছিল।
ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়েই আমরা হুটোপাটা করে নৌকায় ফিরে এলাম।
নৌকার পাটাতনের ওপর সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর নৌকার দুটোমাত্র বার্থের একটার ওপর আমি ঘুমিয়েছিলাম। বার্থ বলতে কাঠের পাটাতন ছাড়া আর কী-ই বা বলা চলে? কারণ, বিছানার নামগন্ধও ছিল না। এতটুকু একটা নৌকার বার্থ তো আর বেশি চওড়াও হতে পারে না। তাই মাত্র ফুট দেড়েক জায়গায় বুকের ওপরে হাত দুটো রেখে কোনোরকমে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। আর নৌকার পাটাতন বলতে যাকে বোঝাতে চাচ্ছি সেটা আমার মাত্র দুই ইঞ্চি ওপরে ছিল।
আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে বিভোর হয়ে পড়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল তারপর বেশ কিছুক্ষণ কিছু স্মৃতিতে আনতে না পারার জন্য আর জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়ার। নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কের জন্য আমার মনে হচ্ছিল আমি বুঝি কফিনবন্ধ হয়েই পড়ে রয়েছি।
নৌকার খালাসিরা এটা-ওটা ধরে নাড়ানাড়ি করার ফলে যে গন্ধ বাতাসে মিশে গিয়েছিল তাতে আমার বোধ হয়েছিল বুঝি বা এটা কবরের ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। আসলে যে ওটা মালপত্রের গন্ধ তা আমার মাথায়ই আসেনি। তখন আমার ভেতরে যে আতঙ্ক যেমন দানা বেঁধেছিল তাতে এসব কথা কিছুতেই আমার মনে আসার কথাও ছিল না। এবারে চোয়ালে বাঁধা পট্টির কথা বলছি, আসলে সেটা আমার নিজেরই সিল্কের রুমাল। সেটা দিয়ে মুখ জড়িয়ে নিয়ে নাইটক্যাপের অভাব পূরণ করেছিলাম। কার্যত দেখা গেল, সবই আমার মনের ভুল, আকস্মিক আতঙ্কের ফল ছাড়া কিছুই নয়।
কিন্তু আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে যে আকস্মিক আতঙ্ক জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল, তার ফল হলো অদ্ভুত রকমের।
বার্থ থেকে নেমে সোজা ডেকের ওপরের উঠে গেলাম। কিছুক্ষণ ধরে আচ্ছা করে শরীরচর্চা করলাম। তারপর নদীর পানিতে আচ্ছা কওে গোসল করার পরই শরীরও মন চনমনে হয়ে উঠল। ফিরে পেলাম পূর্বের স্বাভাবিকতা।
মৃত্যুর আগেই কবরের অন্ধকার গহ্বরে আশ্রয় নেবার আতঙ্ক মন থেকে মুছে গেল। চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত যাবতীয় পুঁথিপত্র ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পর মানসিক স্বস্তি আরও অনেকাংশে ফিরে পেলাম।
সমাধিস্থলের যা-কিছু চিন্তা-ভাবনা মনের কোণে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছিল তাও ঝেড়ে মুছে পরিস্কার করে নিলাম। অবান্তর চিন্তা-ভাবনা আর আমাকে বিভোর করে রাখতে পারল না।
দিন কয়েকের মধ্যেই আমি সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে গেলাম। ব্যস, অদ্ভুত সে ব্যামোটা আমাকে চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে গেছে। সেটা আর কোনোদিনই আমার দেহে আশ্রয় নেয়নি। আমি এবার অন্য দশজনের মতোই একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ।
দ্য ফল অব দ্য হাউস অব আশার
হেমন্তকাল!
সে বছরের হেমন্তের এক বিকাল।
হেমন্তের বিকাশে মেঘরাশি যখন আকাশ ছেড়ে অস্বাভাবিক নিচে নেমে শূন্যে ঝুলে পড়েছে ঠিক এমনই এক ঘেয়ে মেঘলা, নিঃঝুমনিস্তব্ধ দিনে আমি একা, একদম একা ঘোড়ায় চেপে নিরানন্দময় গ্রাম্য পথে কিছুটা সময় অতিবাহিত করেছিলাম।
এক সময় সারাদিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা একটু একটু করে পশ্চিম-আকাশের গায়ে হেলে পড়তে আরম্ভ করল। তারই চারদিকে আঁকা হয়ে গেল বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম ছোপটুকু। শেষপর্যন্ত এক সময় একটু একটু করে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতে লাগল গ্রাম্য পরিবেশটার গায়ে।
চারদিকে আবছা অন্ধকারে চাপা পড়তেই আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল বিন্ন এক বাড়ি। তার সামনে বড় বড় হরফে লেখা ‘আশার আলয়’ কথাটা আমার চোখে পড়ল।
কেনআর কিভাবেই বা হয়েছিল আমি বলতে পারব না। তবে এটুকু অন্তত জোর দিয়েই বলতে পারি, বাড়িটাকে দেখার প্রথম মুহূর্ত থেকেই নিতান্তই অসহনীয় একটা বিষণ্ণতা আমার বুকের মধ্যে চেপে বসেছিল। অসহনীয় বলার কারণ এই যে কোনো ভীষণতা বা নির্জনতার কোনো সুকঠোর মূর্তির সামনে–একেবারে সামনা সামনি দাঁড়িয়ে পড়তে হলেও সে অর্ধসুখদায়ক ছন্দময় কাব্যিক ভাব আমাদের মনকে। প্রভাবিত করে এতে তা-ও তিলমাত্র ছিল না।
সামনের প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম। বাড়িটার চারদিকে দৃশ্যাবলীর ওপর নজর বুলাতে লাগলাম। বাড়িটার নিকট ও দূরবর্তী অতি সাধারণ গ্রাম্য-দৃশ্য প্রাচীন, জীর্ণও বিষণ্ণ প্রাচীর, উন্মুক্ত বাহ্নায়ণ, তৃষ্ণাচ্ছাদিত জলজভূমি আর মরা গাছের কয়েকটা কাত্রে ওপর আগ্রহী চোখের মণি দুটোকে বুলোতে বুলোতে এমন এক বিষণ্ণতা আমার মন-প্রাণকে ভারাক্রান্তি করে তুলল যার একমাত্র তুলনা চলতে পারে আফিমের নেশাগ্রস্থের স্বপ্নালু ভাব কেটে যাবার পর তার মানসিক পরিস্থিতির সঙ্গে, আর রঙীন স্বপ্ন ভঙ্গের পর জীবনের বাস্তবতার তিক্ততায় ফিরে যাওয়ার সঙ্গে।
