আর যা-কিছু ব্যবস্থা করেছিলাম তা হচ্ছে, আমার জন্য যে কফিনটা তৈরি করে রেখেছি তার মধ্যে পানীয় জল খাবার দাবার রাখার ব্যবস্থা এমন জায়গায় করা ছিল যাতে সেগুলোকে হাতের নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়। আর কফিনের ভেতরে তুলা বিছিয়ে নরম গদি তৈরি করার ব্যবস্থাও করে রেখেছিলাম। আর তাতে স্প্রিংগুলো এমন কায়দায় বসানো হয়েছিল যাতে স্প্রিংয়ে সামান্য চাপ লাগামাত্র কফিনের ডালাটা খুলে যেতে পারে। একটা ঘণ্টার দড়িকে সমাধিক্ষেত্রের ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রেখে দিলাম। তার একটা প্রান্ত ছিল কফিনটার ভেতরে, মৃতদেহের একটা কবজিতে যাতে বাঁধা সম্ভব হয় সে রকম দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ছিল দড়ির প্রান্তটা।
ভাগ্য! সবই ভাগ্যের ফের। নইলে এত কিছু সুচিন্তিত পাকাপাকি ব্যবস্থা করে রাখা সত্ত্বেও আমাকেই মৃত্যুযন্ত্রণার থেকে অনেক, অনেক বেশি যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল। সে যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা তার উল্লেখ না-ই বা করলাম।
একটু একটু করে আমার ঘোর কাটতে শুরু করেছে। চোখের পাতা খোলাও সম্ভব হচ্ছে না। কিছুই মনে নেই। বহু চেষ্টা করেও একটা কথাও মনে পড়ছে না। পাথরের মতো ভারি হয়ে যাওয়া মগজে এসব অনুভূতি তিলে তিলে জেগে ওঠায় শুধুমাত্র এটুকুই বুঝতে পেরেছিলাম, ব্যাধিটা আবার চেপে বসতে শুরু করেছে তা না হলে আমার এমন দশা কেনই বা হবে।
দুরু দুরু বুকে জোর করে চোখ মেলে তাকিয়ে ছলাম। না, বৃথা চেষ্টা। জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই আমার চোখে পড়েনি। মনে হলো আমি বুঝি অন্ধকার যক্ষপুরীতে অবস্থান করছি।
ভাবলাম চিল্লাচিল্লি করি। বৃথা প্রয়াস। তবুও সাধ্যাতীত প্রয়াস চালাতে লাগলাম। তাতেও ফায়দা কিছুই হলো না। কণ্ঠনালী দিয়ে সামান্যতম আওয়াজ বেরল না। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বুকের ওপরে কে যেন অতিকায় একটা পাথর চাপিয়ে রেখেছিল। শ্বাসক্রিয়া চালাতেও রীতিমত কষ্ট হচ্ছিল।
ভাবলাম, গলা ছেড়ে চিল্লাচিল্লি করার চেষ্টা করে দেখি। সে চেষ্টা করতেই চোয়াল দুটোকে নাড়াতে হয়েছিল। ব্যাপারটা এবার মাথায় গেল। আরে, চোয়াল দুটোকে তো পাটি দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল। মৃতদেহের চোয়াল যে এভাবেই শক্ত করে বেঁধে রাখাই প্রচলিত রীতি।
এবার লক্ষ্য করলাম, আমি যে শক্ত কোনো বস্তুর ওপর শুয়ে রয়েছি। আর দুধারেও শক্ত বস্তু অবস্থান করছে। আর হাত দুটোকে বুকের ওপর আড়াআড়ি ভাবে রেখে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছিল, এখনও বাধাই রয়েছে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত দুটোকে ওপরে তোলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কিন্তু তামার মতোই শক্ত বস্তু ওপরের দিকেও হাতে ঠেকল। এবার বুঝতে আর কোনো অসুবিধাই হলো না। আমাকে কফিনের ভেতরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। নিচে কফিনের কাঠের শক্ত পাটাতন আর ওপরেও কাঠের ডালা যার জন্য শক্ত বোধ হচ্ছিল। কফিন! হ্যাঁ, এ অভাগাকে কফিনের ভেতরেই শুইয়ে দেওয়া হয়েছে বটে। তৎক্ষণাৎ আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠেছিল, এরকম সম্ভাবনার কথা ভেবে আমার আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ব্যাপার স্যাপারগুলোর কথা। ব্যবস্থাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য এবার তৎপর হওয়া দরকার।
আমি কিন্তু আমার মন্দ ভাগ্যের কথা ভেবে একটুও অবাক হইনি এবং হতাশায় ভেঙেও পড়িনি। শরীরের সর্বশক্তি নিয়োগ করে কফিনের ডালাটার গায়ে দমাদম ধাক্কা মারতে লাগলাম। স্প্রিংগুলো কাজ করেনি, ডালাটা খোলাও সম্ভব হলো না।
এবার ঘণ্টার দড়ির প্রান্তটাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে হাতড়ে বেড়াতে লেগেছিলাম।
আমি যখন দড়ির প্রান্তটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম ঠিক তখনই মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে অনুভব করেছিলাম।
আতঙ্ক! নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্ক তখন আমার মধ্যে ভর করেছিল। শরীরের রক্ত ক্রমেই হিম শীতল হয়ে পড়ছিল। এবার আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল–আমি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম, আমি অপরিচিত লোকের মাঝে ব্যামোটার শিকার হয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিলাম। ফলে যা আশঙ্কা করে ছিলাম, ঘটেছিলও ঠিক তাই। তারা ধরেই নিয়েছিল আমার আত্মা দেহ ছাড়া হয়ে গেছে–অবশ্যই মৃত্যু ঘটেছে।
আমাকে মৃত ভেবে কফিন বন্দি করে অন্য দশজনের কবরখানার মাটি খুঁড়ে তলায় চালান করে দিয়ে শবযাত্রীরা কর্তব্য পালন করে বিদায় নিয়েছে।
কিন্তু কোথায়? জায়গাটা কোথায়? কোন কবরখানায় আমাকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে তা আমার পক্ষে কিছুতেই বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। মাটির তলায়, অন্ধকার পাতালপুরীতে অবস্থান করে তা কি করেই বা বুঝতে পারব, একেবারেই যে অসম্ভব ব্যাপার। আমি এবার কণ্ঠনালী দিয়ে বুক ফাটা চিৎকারের মাধ্যমে জমাটবাধা আতঙ্ককে প্রকাশ করার চেষ্টা চালাতে লাগলাম। যাকে বলে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালানো। আমার সে চিৎকারে পাতাল রাজ্যের মাটি বুঝি বার বার কম্পনের মাধ্যমে শিউরে শিউরে উঠছিল।
প্রথমবার আর্তনাদ করতে পারিনি। কিন্তু দ্বিতীয় আর্তনাদ শুরু করে আর যেন থামাতেই পারছিলাম না। এমন ভয়ঙ্কর বুকফাটা আর্তস্বর যে আমার গলা দিয়ে অনবরত বেরিয়ে আসতেই থাকে তা আমি স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি।
ঠিক তখনই আমার কানের কাছে কর্কশ এক ধমক শুনেছিলাম–‘আরে এমন ষাঁড়ের মতো হেড়ে গলায় চিল্লায় কে? কে? কে চিল্লাচ্ছে?
