মুহূর্তের মধ্যেই গলাটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল। সে গলা নামিয়ে এবার বলল–কে আমি?
‘হ্যাঁ, স্পষ্ট ভাষায় বল, কে তুমি?
‘শোন, আমি যেখানকার বাসিন্দা সেখানে আমার কোনো নাম নেই। সেখানে কারো নাম ধরে সম্বোধন করার কোনো ব্যাপারই নেই।’
আমি বিস্মিত হয়ে বলে উঠলাম সে কী! এরকম জায়গা আবার কোথাও আছে
আছে। আগে আমি মরলোকের বাসিন্দা ছিলাম আর এখন আমি পিশাচ। এক সময় আমি দারুণ নির্মম ও নিষ্ঠুর ছিলাম এখন কিন্তু আমি মরমী। আমার দশা দেখেই তো বুঝতে পারছ, দারুণভাবে কাঁপছি। আর এও হয়তো লক্ষ্য করছ, দাঁতে দাঁত লেগে কেমন ঠক্ ঠক্ আওয়াজ হচ্ছে। আমার এ-কম্পন, এ-শিহরণ অন্তহীণ। কেন? এ নিশ্চিদ্র অন্ধকার আর নিঃসীম শৈত্যের জন্য ভাবছ? না, অবশ্যই নয়। কী অসহ্য, গা জ্বালা এবং কদাকার।
‘হুম!’ আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম।
আমি অবাক হচ্ছি, এমন নিশ্চিন্তে বা প্রশান্তিতে ঘুমোচ্ছ কী করে? নিদারুণ মর্মবেদনা, হতাশা আর হাহাকারের মধ্যে আমার চোখে তো মুহূর্তের জন্যও ঘুম আসছে না। তার ওপর যা-কিছু দেখছি তা যে আমার পক্ষে কিছুতেই সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। আচ্ছা! একেবারেই অসহ্য। এবার আগের মতোই অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলে উঠল–তোমার ব্যাপারটা কি! তখন থেকে বলছি, উঠে এসো। আর তুমি কিনা পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল-নিথরভাবে বসেই রয়েছ! কি হল–ওঠো। বাইরের রাতে এসো। তোমার সামনেই কবরের দরজা খুলে দিচ্ছি। দ্যাখো–ভালো করে দ্যাখো। এর চেয়ে ভয়ানক, এর চেয়ে অসহনীয় দুঃখের দৃশ্য আর কোনোদিন দেখেছ কোথাও? ওঠ।
আমি দেখলাম, স্পষ্টই দেখলাম। অদৃশ্য সে হাত আমার কবজিটাকে সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরে রেখেই মানুষের সব কটা কবরের দরজা মুহূর্তের মধ্যেই দমাদম খুলে দিল।
সব কয়টা কবরের দরজা অপাটে খোেলা। আর সব কটা থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে পচনের ক্ষীণ ফসফরাস আলোর রশ্মি। তাই ভেতর পর্যন্ত দেখতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না। বরং স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচিছ, সাদা কাপড়ে মোড়া একের পর এক মূর্তিকে ছোট-বড় পোকায় ছেয়ে রেখেছে। তারা সবাই চিরন্দ্রিায় শায়িত। সারিবদ্ধ লক্ষ লক্ষ এ শবের সবাই কিন্তু ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে নেই। তবে শক্ত হয়ে আসা দেহগুলো যে অবস্থায় কফিনের ভেতরে শুইয়ে দিয়ে কবরস্থ করা হয়েছিল তারা কিন্তু এখন আর সে অবস্থায় নেই। বেশ কয়েকটা দারুণভাবে পরিস্থিতির রদবদল করে ফেলেছে। আবার কোনো কোনো কফিনের ভেতর থেকে অস্পষ্ট একটা খস খস আওয়াজ ভেসে আসছে। উকৰ্ণ হয়েও তার একটা বর্ণও বোঝা গেল না।
আমি যখন একের পর এক এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে দেখে চলেছি ঠিক তখনই আমার কানের কাছে মুখ এনে একেবারে ফিস ফিস করে সে বলতে লাগল–‘বল, তুমিই বল, এমন করুণ, এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য মুহূর্তের জন্যও সহ্য করা যায়? অসহ্য!নিদারুণ অসহ্য! চোখের সামনে এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করা ছাড়া কিছু তো করারও নেই।
কল্পনা, নিছকই কাল্পনিক বিভীষিকা। আর রাতের এ কাল্পনিক বিভীষিকা কেবলমাত্র রাতের সীমিত গণ্ডির মধ্যেই যে আটকা পড়ে রইল তা নয়। তা এবার থেকে দিনের বেলায়ও সক্রিয় হয়ে দেখা দিল। আমার স্নায়ুগুলো এমনভাবে আহত হয়েছে, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে যে তা আর বলার নয়। জাগ্রত অবস্থায় আমি বিভীষিকার আতঙ্কে সর্বদা কুঁকড়ে থাকি। নিরবচ্ছিন্ন বিভীষিকা।
তখন বাড়ি থেকে বেশি দূরে যেতে মন চাইত না। যেতামও না। আমার মৃগী ব্যারামের কথা যাদের জানা ছিল তাদের কাছছাড়া হতে ভরসা হত না। ভুলেও সে চেষ্টা করতাম না। কারণ, যদি হঠাৎ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ি, যদি সংজ্ঞা হারিয়ে এলিয়ে পড়ি তবে তো কেলেঙ্কারীর সীমা থাকবে না। আরও কারণ অবশ্যই ছিল। যারা আমার ব্যামোটার কথা জানে তাদের সামনে রোগাক্রান্ত হয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়লে অবশ্যই জীবন্ত অবস্থায় কবরস্থ করে দেবে না।
একটা আতঙ্ক আমার মনটাকে প্রতিক্ষণ এমন আতঙ্কিত করে রাখত যে, আচমকা আর এমন বাকা পথ ধরে আমাকে আক্রমণ করে ফেলতে পারে যখন আমার লক্ষণ দেখে ধরেই নেওয়া যেতে পারে আমি আর ইহলোকে নেই। ইহ জীবনে এ ব্যামো আমার দেহটাকে কোনোদিনই ছেড়ে যাবে না।
হ্যাঁ, আশঙ্কা অনেকেরই ছিল। আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধব এমন একটা মওকা হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে আমার মতো এক মূর্তিমান আপদকে বিদায় করবে, মাটির তলায় চালান করে দিয়ে চিরদিনের জন্য ল্যাটা চুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যদি কওে, তাতে তো অবাক হবার কিছু নেই। আমার মনের অবস্থা সম্বন্ধে অনেকেই যে কম বেশি অনুমান করতে পারেনি তা-ও নয়। তাই কেউ কেউ কৌশলে আমাকে প্রবোধ দিতেও ভোলেনি। মিছেই আমি এমন অমূলক আতঙ্কের শিকার হয়ে কষ্ট পাচ্ছি।
আমি আগেই সব কয়জনকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিলাম, এ রকম শঙ্কটে যদি কোনোদিন পড়ি, যদি নিতান্তই নিস্তব্ধ হয়ে যাই তবে শরীরে পচন ধরার আগেই যেন আমাকে সমাহিত, মাটির তলায় চালান দেওয়া না হয়। তবু আমার মন থেকে আতঙ্ক। কিন্তু একেবারে দূর হয়নি। তাই কিছু কিছু ব্যবস্থাও আমি আগেভাগেই করে রেখেছিলাম।
সে ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, পারিবারিক সমাধিক্ষেত্র যাতে ভেতর থেকে খোলা সম্ভব সে ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। লোহার দরজাটা যাতে সামান্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই খোলা যেতে পারে এ রকম একট লম্বা লোহার দণ্ড যোগাড় করলাম। আর সেটাকে সমাধির ভেতরে অনেকখানি ঢুকিয়ে রেখে দিলাম। আলো বাতাসের অভাব যাতে না ঘটে সেদিকেও নজর দিতে ভুলিনি।
