রোগীর শরীরে পচন শুরু না হওয়ার দরুণ, আর ইতিপূর্বেও এরকম মৃত্যুর মতো দশা লক্ষিত হয়েছে বলে তার আত্মজন ও হিতাকাঙ্খী বন্ধু-বান্ধবরা তার জীবন্ত সমাধি কোনোরকমে বিলম্বিত করতে থাকে, ঠেকিয়ে রাখে।
তবুও ভাগ্য ভালো যে, এ ব্যাধির লক্ষণ ও প্রকোপ খুবই ধীরে ধীরে এবং ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। আক্রমণ করার পর পরই এ ব্যাধি আক্রান্ত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণরূপে মৃতের মতো করে তোলে না। অল্প-অল্প করে, ধাপে ধাপে প্রকোপ বাড়তে থাকে। কিন্তু সে অদৃষ্টবিড়ম্বিত ব্যক্তির গোড়াতেই, ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ামাত্র প্রকোপ চূড়ান্তভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তা ঘটেও থাকে। তখন রোগাক্রান্ত হতভাগা একেবারে হঠাই মড়ার মতো হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে তো তাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করতেই হয়। এ ছাড়া উপায়ও তো কিছু থাকে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান গ্রন্থে রোগটার বর্ণনা যে রকম দেখা যায় ঠিক সেরকমই ছিল আমার ব্যাধি আর লক্ষণগুলো।
আমি মাঝে মধ্যেই প্রাণচঞ্চল আত্মজন–প্রাণ চঞ্চল বন্ধু-বান্ধব মাঝখানে অর্ধ সংজ্ঞাহীনভাবে এলিয়ে পড়ে থাকতাম। সবার মুখেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ আর আমার মধ্যে ব্যাধির প্রকোপ। তারপরই হঠাৎ আমি সংজ্ঞা ফিরে পেতাম, যাকে সম্পূর্ণ সংজ্ঞা ফিরে পাওয়া বলে।
আবারও আমি ব্যাধির শিকার হয়ে পড়তাম। অল্প অল্প করে ব্যাধির লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকত। তারপর আবার হঠাই রেহাইও দিয়ে দিত। আবার হয়তো হঠাৎ ব্যাধিটা আমাকে জড়িয়ে ধরত, আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলত। আমি ঠাণ্ডায় ঠক্ঠক্ করে কাঁপতে আরম্ভ করতাম, শরীর এলিয়ে পড়ত, অনবরত পুঁকতাম, মাথা ঝিমঝিম করত। থেকে থেকে চক্কর মারত। সে মুহূর্তে টান টান হয়ে শুয়ে পড়া ছাড়া উপায়ই থাকত না। দু-এক মুহূর্ত বা দু-এক ঘণ্টা নয়, একের পর এক সপ্তাহ আমার যাবতীয় সত্তা যেন অন্তহীন স্তব্ধতায়, নিঃসীম অন্ধকারের অতল গহ্বরে তালিয়ে যেত। একইভাবে পড়ে থাকত হত ব্যাধির কবলে নিজেকে অসহায়ভাবে সঁপে দিয়ে।
সেনিদারুণ ব্যাধিগ্রস্ত অবস্থায় আমার কাছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব সম্বন্ধে কোনো ধারণাই থাকত না। আমি খুবই ধীরে ধীরে সংজ্ঞা ফিরে পেতাম। নচ্ছাড় ব্যাধিটা যেন নিতান্ত অনিচ্ছায় আমার দেহটা ছেড়ে খুবই ধীর-পায়ে বিদায়নিত। আর হতভাগা আমার আত্মাটা যেন অন্ধকার জগৎ থেকে ক্রমে আলোয় ফিরে আসত।
আমার মধ্যে সমাধিস্থ হয়ে যাওয়ার একটু-আধটু প্রবণতা যা ছিল তা ছাড়া আমার শরীর স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালোই ছিল। তবে ঘুম থেকে জাগার পর সবকিছু কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেত, চট করে কিছু স্মৃতিতে আনতে পারতাম না। মিনিট কয়েক কোনো কর্তব্যই স্থির করতে পারতাম না। আর অনুভূতি শক্তিকে নতুন করে আয়ত্বে আনতে অনেকক্ষণ লেগে যেত। মোদ্দা কথা, আমার বেহাল অবস্থা স্বাভাবিকতা ফিরে পেতে অনেকটা সময় লেগে যেত।
তবে একটা কথা খুবই সত্য যে, তখন আমি শরীরে কোনোরকম যন্ত্রণা উপলব্ধি করতাম না। তবে মনটা অস্বাভাবিকভাবে বিষিয়ে থাকত, পীড়িত হত। কবরের চিন্তা সর্বক্ষণ আমাকে বিভোর করে রাখত। আমার ভাবনা কবর, কফিন, পোকা আর সমাধি স্তম্ভ ও ফলকের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ত।
অস্বীকার করব না। বীভৎস এ মৃত্যুর ভীতি আর বিপদের আশঙ্কা আমাকে দিন রাত সারাক্ষণ অস্থির করে রাখত। ঘুমানোর আগে মাথার মধ্যে একটা চিন্তা দানা বাঁধত, ঘুম থেকে জেগে উঠে অবশ্যই দেখতে পাব আমি কফিনের ভেতরে, কবরে শুয়ে রয়েছি। কোনোক্রমে যদিও ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি, দুঃস্বপ্ন আমাকে সারারাত বদ্ধপাগল না হলেও আধপাগল করে রাখত। উফ্! সে যে কী অবর্ণনীয় অস্থিরতা তা কেবলমাত্র নিজস্ব উপলব্ধির ব্যাপার, অন্য কাউকে বুঝিয়ে বলে তার মধ্যে সম্যক ধারণা জন্মানো সম্ভব নয়।
আমার দেখা অগণিত দুঃস্বপ্নের মধ্য থেকে আমি একটাই এখানে উল্লেখ করছি। কবরস্থ হওয়ার পর একটা বরফ শীতল হাতের ছোঁয়ায় হঠাৎ-ই আমার ঘোর কেটে যায়। কপালে হাত ঠেকিয়ে অস্থির অথচ ক্ষীণ ও জড়িত কণ্ঠে বলে ওঠে–‘ওঠ জাগ, উঠে পড়।
যন্ত্রচালিতের মতো ঝট করে খাড়াভাবে বসে পড়লাম। এমন ঘুটঘুঁটে অন্ধকার যাকে একমাত্র নিশ্চিদ্র বলে বর্ণনা করা চলে। যার হাতের স্পর্শে আমার ঘুম টুটে গেছে, যার হুকুম তামিল করতে গিয়ে আমি উঠে বসে পড়েছি তাকে কিছুতেই দেখতে পেলাম না, এমনকি তার ছায়াও না।
আমি যে কখন শুয়েছিলাম, কখন ঘুমের কোলে আশ্রয় নিয়েছিলাম, ঘোরের মধ্যে কতক্ষণ কাটিয়েছিলাম–এসবে বিন্দুবিসর্গও আমি স্মৃতিতে আনতে পারছি না। এমনকি আমি কোথায় যে রয়েছি তা-ও খেয়াল মাত্র নেই।
নির্বাক নিস্পন্দভাবে হৃতস্মৃতিকে জাগ্রত করার জন্য আমি মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। আবার বরফ-শীতল হাতটা আমাকে স্পর্শ করল। না, কেবল স্পর্শ করল বললে ঠিক বলা হবে না। কারণ, সে হাতটা এবার আমার কবজিটাকে সাঁড়াশির মতো চেপে ধরেছে। আর সে ধরা স্বাভাবিক ধরা অবশ্যই নয়, নির্মমভাবে চেপে ধরা যাকে বলে।
কবজিটা ধরেই সে বার-কয়েক দারুণ ঝাঁকুনি দিয়ে বলল–‘কি হে চুপ করে বসে আছ যে বড়! ওঠ উঠে এসো!’
আমি আর নিজেকে সামলে সুমলে রাখতে না পেরে বাজখাই গলায় বলে উঠলামকে? কে তুমি? কোথাকার মাতব্বর?
