চিকিৎসকরা এবার নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে স্থির করলেন, রোগীর শরীরে যখন পচনের কোনো চিহ্ন লক্ষিত হচ্ছে না তখন চার্জ দেওয়া অবশ্যই চাই-ই চাই।
দেখা গেছে, গ্যালভানিক চার্জে মড়া মানুষও হুড়মুড় করে উঠে পড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে হুড়মুড় করে ওঠার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্য রকমই মনে হল। জীবন্ত মানুষ যেমন ধড়ফড় করে ঠিক সেরকমই তাকে করতে দেখা গেল।
রাত বাড়তে বাড়তে গম্ভীর হয়ে এলো। চিকিৎসকদের পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ চলতেই লাগল। ক্রমে পূব-আকাশ ফর্সা হয়ে এলো। চিকিৎসকদের ধৈর্য ফুরিয়ে আসার যোগাড় হল।
এক যুবক চিকিৎসক তখন নিজস্ব একটা পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়েছিল। সে রোগীর বুকের কাছের কিছুটা মাংস চিড়ে তার মধ্যে গ্যালভানিক ব্যাটারির চার্জ দিতে না দিতেই স্টেপলটন আগে ছটফট না করে হঠাৎ উঠে সোজাভাবে বসে পড়েছিলেন।
তিনি একেবারে হঠাৎ-ই টেবিল থেকে নেমে যুবক চিকিৎসকের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তারপর স্পষ্ট অথচ ভাঙা ভাঙা জড়িত স্বরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। দুম করে পড়ে গেলেন। মেঝেতে শরীর এলিয়ে পড়ল।
আকস্মিক এ ব্যাপারটায় সবাই তো রীতিমত তাজ্জব বনে গেলেন। ব্যস, সবাই সে মুহূর্তেই ছুটাছুটি দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন। সবাই ব্যস্ত কিন্তু পর মুহূর্তেই নিজেদের সামলে নিয়ে আবার জায়গামতো ফিরে এলেন। স্টেপলটনকে কয়জন মিলে। জাপ্টে ধরে আবার টেবিলে শুইয়ে দিলেন। দেখা গেল তিনি বেঁচে থাকলেও সংজ্ঞা নেই। মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংজ্ঞা লোপ পেয়েছিল।
সংজ্ঞাহীন স্টেপলটনের নাকে ইথারের শিশি ধরা হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন। এবার তাকে আত্মজনের হাতে তুলে দেওয়া হল। সবাই খুশি। তবে কিভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন এ-কথা আর তাকে বা তার আত্মীয়জনদের বলা হয়নি।
ঘটনাটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর ব্যাপার হচ্ছে–‘স্টেপলটন কি প্রথম থেকে শেষ অবধি জানতেন, তাকে নিয়ে, মানে তার শরীরে কি কি করা হয়েছে–তার সে সংজ্ঞা সম্পূর্ণ লোপ পায়নি এ-কথা আর বলার অপেক্ষা করে না। তবে পুরো ব্যাপারটা তার মাথায় কেমন যেন জট পাকিয়ে গিয়ে তাকে রীতিমত বে-সামাল করে দিয়েছিল।
আর এও সত্য যে, অস্পষ্টভাবে হলেও তিনি বুঝতে পারছিলেন, চিকিৎসকরা তাকে মৃত সাব্যস্ত করে গেছেন। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তাকে সমাধিস্থলে নিয়ে গিয়ে যথাযথভাবে ও সমারোহের সঙ্গে সমাহিত করা হয়। দুই দিন আর দুই রাত তিনি কবরখানার কাঁকড়মুক্ত গুঁড়ো মাটির তলায় কদিন বন্দি হয়ে অসহায়ভাবে পড়ে রইলেন।
তারপর কবর থেকে উদ্ধার করে তাকে শুইয়ে দেওয়া হলো পোস্টমর্টাম-ঘরের টেবিলের ওপর। উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় তার বুকে তড়িৎ প্রবাহিত করে দেওয়ায় অচিরেই মোহগ্রস্ত অবস্থাটা কেটে যায়। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে টেবিল থেকে নেমে এলেন। প্রায় স্বাভাবিক কণ্ঠেই উচ্চারণ করলেন ‘বেঁচে আছি! আমি তো দিব্যি বেঁচে আছি! এই তো আমি।’ কথাটা শেষ করার আগেই তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন।
উপরোক্ত ঘটনাগুলো থেকে অবশ্যই বিশ্বাস করা যায় আর সিদ্ধান্তও নেওয়া চলে যে, বহু ক্ষেত্রেই মানুষকে মৃত্যু না হতেই সমাহিত করা হয়েছে। মাটি খুঁড়ে, কবরে এমন ঘটনাও বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে। দেহটা কঙ্কালসহ যেভাবে থাকার কথা ছিল, অবিকল সেভাবে নেই। তবে কি ঘটনাটা খুবই সন্দেহযোগ্য নয়? তা-ই যদি স্বীকার করে নেওয়া হয় তবে বলা যেতে পাওে, জীবন্ত মানুষ মাটির তলায়, কবরে অবস্থানকালে কোনো মানুষ যখন উপলব্ধি করতে পারে, ছোট খুপড়িটা থেকে তার আর কোনোদিনই, অর্থাৎ ইহজীবনে আর মুক্তি পাবার সামান্যতম আশাও নেই। আর অনন্যোপায় হয়েই বেশ কিছু সময় ধরে তাকে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ শুঁকতে হবে। তারপর? তারপর? পোকা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে, আক্রমণ করবে। তার প্রাণবন্ত দেহটাকে দিয়ে মৌজ করে ভোজ সারবে। সে হতভাগ্য মানুষটার মন তখন কী ভয়ঙ্কর হাহাকারের শিকার হয়ে পড়ে, ভাবা যায়! উফ! এর চেয়ে মর্মান্তিক, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু হতে পারে? অথচ, এমন একটা দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার সে জীবন্ত মানুষটাকে মুখ বুজে, দাঁতে দাঁত চেপে হজম করতেই হয়।
এমন এরকমই একটা দুর্বিষহ ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছিল। কোথায়, কিভাবে সেটা ঘটেছিল? বলছি–
অত্যাশ্চর্য একটা ব্যাধি বছর কয়েক আগে আমার শরীরে ভর করে দাপাদাপি করেছে। আর সে ব্যাধিটা কেবলমাত্র আমাকে যে দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে রেখেছে তা-ই নয়, চিকিৎসকদেরও ধোয়ার আস্তরণের মধ্যে রেখে কম বিভ্রান্তিতে ফেলেনি। সংক্ষেপে বলতে গেলে তাদের একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।
আমার ওপর দীর্ঘ পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে ব্যাধিটার কোনো হদিস করতে না পেরে কোনো উপায় না থকাতে তার মৃগীরোগ নাম দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করেছিলেন। মৃগী রোগের কারণ এর নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করতে না পারলেও ব্যাধিটার লক্ষণ আর চরিত্রটা কেউই অবিদিত নয়। ব্যাধির কম-বেশি লক্ষণ ধারা সম্ভব হয় মাত্রা ভেদের জন্যই।
ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি কখনও কিছু সময় আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প অল্প সময় করে প্রায় সারাটা দিন আলসে মানুষের মতো বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকে, তবে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় সত্য। বাহ্যিক জ্ঞান থাকে না। কিন্তু হৃদযন্ত্রের ক্ষীণ নড়াচড়ার মাধ্যমে বোঝা যায়, গায়ে উচ্চতাও সামান্য হলে উপলব্ধি করা যায় আর গাল দুটোর কেন্দ্রস্থলে হালকা লাল আভাও চোখে পড়ে। আর? ঠোঁটের সামনে একটা আয়না রেখে অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় নির্দিষ্ট ছন্দ মাফিক না হলেও ফুসফুস দুটো মৃদুভাবে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে, কখনও বা মাসের পর মাস ধরে সংজ্ঞাহীনতার ঘোর। অব্যাহত থাকে। তার তখনকার পরিস্থিতি দেখে দক্ষ চিকিৎসকও অবধারিত মৃত্যু আর জীবন্ত অবস্থার মাঝে বস্তুগত পার্থক্যটুকু বুঝতে পারেন না। তারা উপায়ান্তর না দেখেনিদারুণ হতাশার শিকার হয়ে পড়েন।
