হতভাগ্য সে চাষীটা সদ্য কবর দেওয়া অফিসারের ঠিক কবরটার ওপরে। সে পরিষ্কার শুনতে পেয়েছে, কবরের মাটির তলায় কে যেন জোর ধস্তাধস্তি করছে।
চাষীটার কথায় গোড়ার দিকে কেউ কান দেয়নি। কিন্তু চাষীটা তবুও চেঁচিয়ে বার বার একই কথা বলায় তখন আর সবাই তার কথার গুরুত্ব না নিয়ে পারল না। তার স্বাভাবিক আতঙ্কও সবার মন ঘুরে যেতে বাধ্য হয়। তাড়াতাড়ি কোদাল, গাঁইতি আর শাবল আনার জন্য হুকুম দেওয়া হল।
তাড়াতাড়ি কবর দেওয়ার কাজ সেরে ফেলা হয়েছিল বলে তখন মাটি বেশি গর্ত করা হয়নি। তাই কিছুটা খোঁড়াখুড়ি করতেই কফিনের ডালাটা নজরে পড়ে গেল।
হায়! এ কী রকম হল! কফিনের ডালাটা যে আধ খোলা! একটা দিক, কজার বিপরীত দিকটা সামান্য উঁচু হয়ে রয়েছে। আর যে অফিসারকে কবরস্থ করা হয়েছিল তিনি বসে। না, বসা বলাটা ঠিক হবে না, বরং আধবসা বলাই উচিত। তিনিনির্ঘাৎ মাথা দিয়ে ঠেলেঠুলে কোনোরকমে সে দিকটা সামান্য উঁচু করে বসেছেন তবে মাটির পরিমাণ কম আর আলগা থাকার জন্যই তার পক্ষে এমনটা করা সম্ভব হয়েছে। তবে তার হুঁশ নেই। আর খুব বেশিক্ষণ আগে সংজ্ঞা লোপ পেয়েছে বলেও মনে হলো না।
সংজ্ঞা পেলইবা লোপ। মুহূর্তমাত্র দেরি না করেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন অফিসার ভদ্রলোক জীবিত। অবশ্যই মারা যাননি। দম বন্ধ হয়ে রয়েছে মাত্র। ঘণ্টখানেক সেবা-যত্নের ফলে তিনি ধীরে ধীরে শ্বাসক্রিয়া চালাতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখেই শ্বাসক্রিয়া চালাবার পর তিনি চোখ মেলে তাকালেন। চোখের মণি দুটোকে বার কয়েক উপস্থিত সবার মুখের ওপর বুলিয়ে নিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মুখে বিষাদের হাসির রেখা ফুটে উঠল। ভাঙা ভাঙা গলায় প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলেন ‘যন্ত্রণা!’
উপস্থিত সবাই তার মুখের ওপর সামান্য ঝুঁকলেন।
কেউ কিছু বলার আগেই অফিসার ভদ্রলোক আগের মতোই যন্ত্রণাকাতর গলায় প্রায় অস্ফুট স্বরে আবার উচ্চারণ করলেন যন্ত্রণা! খুব যন্ত্রণা! কবরবাসের যন্ত্রণা!
জানা গেল, কবরস্থ করার সময় তার নাকি ভালোই জ্ঞান ছিল। সবই শুনতে পাচ্ছিলেন, বুঝতেও পারছিলেন সবই। ব্যস, তারপরই ক্রমে সবকিছু অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে। তারপর যে কি হলো কিছুই তার মনে নেই। জমাটবাধা আতঙ্কই তার মন থেকে সবকিছু নিঃশেষে মুছে দিয়েছে।
কফিনের ওপর কাকড়ের মতো গুঁড়ো মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। ফলে কবরের ভেতরে অনেক বাতাসই ছিল। এটাই রক্ষা। কবরের ওপরে বহু লোকের হাঁটাহাঁটি দাপাদাপি চলছে। ব্যাপারটা যখন তিনি বুঝতে পেরেছেন তখনই হুটোপাটা করে উঠে বসতে গেলেন। তখন কফিনে মাথাটা ঠেকে যায়। ব্যস, মুহূর্তমাত্র দেরি না করে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে সেটাকে ওপরের দিকে চাপ দিয়ে ডালাটাকে ওপরের দিকে তুলে ফেলেন।
রোগী অফিসারটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পেলেও শেষের দিকে কিছু আনাড়ি চিকিৎসকের খপ্পরে পড়ে যান। তার ওপর হরেক রকম চিকিৎসার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হতে থাকে। এমনকি গ্যালভানিক ব্যাটারির প্রয়োগও করা হয়।
এ অবস্থায় চিকিৎসা চলাকালীন খিচুনি হতে থাকে। আর খিচুনিটা মাঝে মধ্যেই দেখা দিতে লাগল। একবার এরকম অস্বাভাবিক খিচুনিতে তিনি প্রাণ হারান। দেখা গেল খিচুনির ব্যাপারটাই শেষপর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়।
প্রসঙ্গক্রমে গ্যালভানিক ব্যাটারির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে হঠাৎ লন্ডনের এক অ্যাটর্নির কথা মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে। তাকে দু-দুটো দিন কবরখানায় কফিনের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছিল দেখা গেল, গ্যালভানিক ব্যাটারি তার শরীরে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে এ ঘটনাটি ঘটেছিল। শহরের বিভিন্ন মহলে ব্যাপারটা নিয়ে রীতিমত তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
এডোয়ার্ড স্টেপলটন সে ভদ্রলোকের নাম ছিল। টাইফাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটা নাম না জানা বিশেষ লক্ষণ তার মধ্যে লক্ষ্য করে চিকিৎসক সমাজ বিশেষ কৌতূহলাপন্ন হয়ে পড়েছিলেন।
চিকিৎসকরা মৃত স্টেপলটনের বন্ধুদের কাছে তার দেহটা পোস্টমর্টেম করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সে অনুমতি দেয়নি।
অনুমতি না পাওয়ায় চিকিৎসকরা কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন না। অনুরোধে যখন কাজ হলই না তখন বাঁকা পথ নিতেই হবে। পথটা কি, তাই না। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় এরকম গোপনে কবর খুঁড়ে
মরাটাকে তুলে আনবেন। যে করেই হোক, উদ্দেশ্য সিদ্ধ তাদের করতেই হবে।
লন্ডন এক বিচিত্র শহর। সেখানে যখন হরেক রকম জাঁকজমকের ব্যবস্থা রয়েছে। ঠিক তেমনি করবচোরদেরও অভাব নেই। প্রচুর নগদ অর্থের বিনিময়ে তারাই কাজটা সেরে ফেলল। মৃতদেহটাকে রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে তুলে নিয়ে এলো। তারপর সেটাকে খুবই গোপনে নিয়ে একটা বেসরকারি হাসপাতালের অপারেশন রুমের টেবিলের ওপর শুইয়ে দিল।
কবরে আশ্রয় পাবার তৃতীয় রাতে কফিনের লোকটা আবার টেবিলে এসে হাজির হল।
চিকিৎসকরা এবার গ্যালভানিক ব্যাটারির চার্জ দেওয়ার জন্য তার তলপেটের চামড়া চিড়ে দুভাগ করে ফেললেন।
