আইনজীবির স্ত্রীর দেহটাকে কফিন-বন্ধ অবস্থায় রেখে যাওয়ার সময় কফিন বাহকরা ভুল করে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ রেখে যায় কবরস্থানে ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে।
প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাওয়ার পর, সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে সে আইনজীবির স্ত্রী জ্বলন্ত প্রদীপটাকে হাতে করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এসেছিল। তারপর ভাঙা কফিনটার
কাঠ দিয়ে লোহার দরজার পাল্লায় বার বার আঘাত হেনে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারো সাড়াই পাননি। কিন্তু কাজ যা হলো তা হচ্ছে– সিঁড়ির ওপর কফিন ভাঙা কাঠ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। এদিকে দীর্ঘ চেষ্টার পরও কারও সাড়া না পেয়ে মহিলাটি অন্তহীন আতঙ্কের শিকার হয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে সিঁড়ির ওপরই লুটিয়ে পড়েছিলেন। অথবা শেষমেষ মরাই যান। আর সাদা কাপড়? সেটা লোহার দরজার পাল্লার গায়ে খোঁচা লেগে আটকে যাওয়ার জন্য কাপড়ে জড়ানো দেহটা তিন তিনটা বছর ধরে ঝুলে থাকার ফলে সাদা কঙ্কালে পরিণত হয়ে গিয়েছে।
অত্যাশ্চর্য ঘটনাকে ইংরেজিতে আখ্যা দেওয়া হয় সত্য কপাল কল্পিত গল্পের চেয়ে ভয়ঙ্কর।’ ঠিক এরকমই এক সত্য ঘটনাকে লেখনির মাধ্যমে প্রকাশ না করে পারছি না।
১৮১০ খ্রিস্টাব্দের কথা।
সে বছর ফরাসির এক অপরূপ দেহ গ্রাম্য কবরখানায় কবরস্থ করা হয়েছিল। অপরূপা সে কিশোরী বিয়ের আগে এক গরিব সাহিত্যিক সাংবাদিককে ভালোবাসত। সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে তো আর লেখকের গলায় বরমাল্য দিয়ে বংশের মুখে কালি দিতে পারে না। তাই সে সমাজের মাথা এক টাকার কুমিরকে বিয়ে করে পতিত্বে বরণ করে নিয়েছিল।
বিয়ের পর সে অপরূপার বরাতে স্বামীর কাছ থেকে আদর সোহাগ তো দূরের ব্যাপার, অসম্মান আর বল্গাহীন নির্যাতন ছাড়া কিছুই জোটেনি। আর বুকে অনেক জ্বালা যন্ত্রণা নিয়ে সে ইহলোক ত্যাগ করে, শহর থেকে দূরে, বহু দূরে তার মৃতদেহ কবরস্থ করা হয়। ব্যস, তার সবকিছু মিটে গেল।
ভালোবাসার কাঙাল সে সাহিত্যিক সাংবাদিক যুবকটা এক গভীর রাতে হাঁটতে হাঁটতে কবরস্থানে হাজির হয়েছিল। তার ইচ্ছা ছিল, কবর খুঁড়ে তার প্রেমিকার মাথার চুল কেটে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দেবে। আমৃত্যু সেগুলোকে দেখে দেখেই তাঁকে না পাওয়ার বেদনা ভুলে থাকবে।
কিন্তু সে কবর খুঁড়ে প্রেমিকার মাথার চুল কাটার জন্য কাঁচি চালাতে গিয়েই আচমকা থমকে যায়। সে দেখল, অপরূপার চোখ দুটো খোলা, সে চোখ মেলে তারই দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
সে অসম সাহসি লেখক সাংবাদিক কিন্তু আকস্মিক আতঙ্কে অস্বাভাবিক ঘাবড়ে গেলেও দৌড়ে পালায়নি। সে তার প্রেমিকাকে এক সরাইখানায় নিয়ে আসে। নিজের ঘরে রেখে দেয়। এবার সালসাটালসা খাইয়ে তাকে রীতিমত চাঙা করে তোলে।
সে কিশোরীটি সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে এলে প্রেমিক-প্রেমিকা আমেরিকায় পালিয়ে যায়।
কিশোরীটি হিসেবী বলে অখ্যাতি থাকলেও হৃদয়হীন কিন্তু অবশ্যই নয়। যে স্বামী তাকে জীবন্ত অবস্থায় কবরস্থ করেছিল তার সঙ্গে আর সংসার করতে সে উৎসাহি হয়নি, রাজিও হয়নি। লেখক-সাংবাদিক যুবকের সঙ্গে বিশ বছর সংসার করেছে।
তারপর তার ধারণা হয়েছিল, এবার ফ্রান্সে ফিরতে আর কোনো সমস্যা নেই। দীর্ঘ বিশ বছরে চেহারার অনেক রদবদল হয়ে গেছে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের স্বামী এখন তাকে সামনে দেখলেও চিনতে পারবে না। অতএব ফ্রান্সে ফেরার কোনো সমস্যাই নেই।
কিন্তু টাকার কুমির আইনজীবি বিশ বছর পরও প্রথম একঝলক দেখেই তার মৃতা-স্ত্রীকে চিনে ফেলেছিল। স্ত্রী বলে দাবি করতেও ছাড়েনি। আদালতে মামলা দাখিল করল। কিন্তু আদালত তার দাবি স্বীকার করে নেয়নি। কারণ, দীর্ঘ বিশ বছরে তার স্বামীত্বের অধিকার আইনগতভাবেই চলে গেছে। অতএব স্ত্রীকে ফিরে পাবার প্রশ্নই ওঠে না, পাওয়াও যায়নি।
আরও একটা গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা মাথার ভেতরে এসে জড়ো হয়ে গেছে। অতএব লেখনির মাধ্যমে তা তুলে না ধরে পারছি না।
ভদ্রলোক গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসারের পদে বহাল ছিলেন। লম্বা-চওড়া-পেটা চেহারা। বাগ-না-মানা এক তেজি ঘোড়ার পিঠ থেকে আচমকা মাটিতে আছড়ে পড়ে গিয়েছিলেন। মাথায় ভীষণ আঘাত পান। ছিটকে পড়ামাত্র পথের মাঝেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।
আছাড় খেয়ে পড়ায় তার মাথার খুলিটা সামান্য ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটেছিল। কিন্তু সে মুহূর্তে জীবনের কোনো আশঙ্কা দেখা দেয়নি।
চিকিৎসকরা মাথার খুলি ছিদ্র করে রক্তক্ষরণ করেছিলেন। এ ছাড়াও চিকিৎসার মাধ্যমে আরও বহুরকম স্বস্তির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু তবুও দেখা গেল, অফিসার ভদ্রলোক ক্রমেই ঝিমিয়ে পড়তে লাগলেন। শেষমেশ যখন একেবারেই এলিয়ে পড়লেন, তখন নিঃসন্দেহ হওয়া গেল তিনি মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিয়েছেন। শেষ! সব শেষ!
তখন খুব গরম পড়েছিল। তাই দেরি না করে তাড়াতাড়ি অফিসারটির দেহটাকে সাধারণ কবরখানায় কবরস্থ করা হল।
বৃহস্পতিবার তার পারলৌকিক কাজকর্ম চুকিয়ে ফেলা হল। তাই সঙ্গত কারণেই পরের রবিবার কবরখানায় ভিড় জমে গিয়েছিল।
সবাই যখন তার কবরস্থলে দাঁড়িয়ে তখন ভিড়ের ভেতর থেকে এক চাষী গলা ছেড়ে কেঁদে ওঠে। আকুলি বিকুলি করে কাঁদতে আরম্ভ করে। তাকে কান্না না বলে আর্তনাদ বলাই হয়তো শ্রেয়।
