মুহূর্তের জন্য থেমে বন্ধুবর দুঁপে এবার বলল–একটা কথা, কিছুদিন আগে ডি ভিয়েনায় আমার একটা ক্ষতি করেছিল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমি তখনই তাকে রসিকতার ছলে সতর্ক করে দিয়েছিলাম–দেখুন, এ ব্যাপারটা আমার স্মরণ থাকবে। সে জন্যই যে, যেহেতু আমার ভালোই জানা ছিল যে, কৌশল আর বুদ্ধির খেলায় তাকে এভাবে হারিয়ে দিয়ে নাকানিচোবানি খাইয়েছে, তা জানার আন্তরিক আগ্রহ তাঁর মধ্যে জাগবেই জাগবে। আর এ কারণেই মনস্থ করে ফেললাম, সেটা বুঝতে পারার মতো কোনো সূত্র না দিলে তো সেটা খুবই মর্মান্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আর এও আমি ভালোই জানি আমার হাতের লেখার সঙ্গে তার যথেষ্ট পরিচয় আছে। অর্থাৎ দেখামাত্রই বুঝতে পারবেন, কাজটা কার দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। এরকম বিবেচনা করেই ওই কাগজটাতে এ কথাটা লিখে দিয়েছিলাম যা ক্লেবিনের ‘আত্রি’ তে পাওয়া যাবে। ‘….Undessein is friends be Sil n’est digue d’ atvee, est diague de Thieste.’
দ্য প্রিম্যাচিওর বেরিয়াল
এমন কিছু কিছু বিষয় আছে যা দেখে বা শুনে মানুষ ভয়ে আবিষ্ট না হয়ে পারে না। কিন্তু সেগুলো এমনই ভয়ঙ্করতায় ভরপুর যে সেগুলোকে নিয়ে গল্প-উপন্যাস রচনা করাও সম্ভব নয়।
ইতিহাসের পাতা ঘাটাঘাটি করলে বহু রোমহর্ষক ঘটনা চোখে পড়বে, যেমন– লন্ডনে মহামারীরূপে প্লেগের প্রাদুর্ভাব, লিসবনের ভয়াবহ ভূকম্পন আর কলকাতার নারকীয় হত্যাকাণ্ড অন্ধকূপ হত্যা যেখানে একশ তেইশজনকে দম আটকে মারা হয়েছিল। তবে খুবই সত্য যে, এসব ঘটনা, ব্যাপার স্যাপার বিতৃষ্ণার সঙ্গে দূরে সরিয়ে রাখাই শ্রেয় এবং বাঞ্ছনীয়।
সে যা-ই হোক, জীবন্ত সমাহিত হওয়ার মতো র্দৈব-মর্মান্তিক ঘটনা মানুষের বরাতে যেন না জোটে; অথচ তা কিন্তু প্রায়শই ঘটে চলেছে। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা সে সব খবরাখবর রাখেন বলে তাচ্ছিল্যভরে দূরে সরিয়ে রাখতেও পারেন না।
যে প্রাচীরটা জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে অবস্থান করছে তা আজও পরিষ্কার নয়–ঝাপসা ধারণার মাধ্যমেই গড়ে তোলা হয়েছে। ঠিক কোনখানে যে একটার শেষ আর কোনখানে যে অন্যটা আরম্ভ হয়েছে, কেউ সঠিকভাবে তা জানেন না, আমাদের ধারণাই বা দেবেন কিভাবে?
দেহ থাকলে রোগ ব্যাধি হবেই। কিন্তু এমন বহু রোগের কথা আমাদের জানা আছে যা দেহের যন্ত্রপাতিগুলোকে এমন অকেজো করে দেয় যে আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পুরো যন্ত্রটাই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে যন্ত্রপাতির এরকম। নিষ্ক্রিয়তা সাময়িক ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়। কিছু সময়ের জন্য দুর্বোধ্য যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। তারপর হঠাই কি এক রহস্যজনক নিয়মে আবার ঘড়ির কাটার মতো টিক্ টিক্ করে চলতে থাকে। আবার চাকায় চাকায় লেগে যায়। যাদু যন্ত্র চলতে আরম্ভ করে।
রূপার সুতো দিয়ে বাঁধা আত্মা দেহখাঁচা থেকে বেরিয়ে যায় না ঠিকই। কিন্তু যখন যন্ত্রপাতি স্তব্ধ হয়ে তাকে তখন আত্ম কোথায়? কি অবস্থায় থাকে, সেটাই তো জিজ্ঞাসা? কিন্তু এত প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজ-অবধি পাওয়া যায়নি।
এখন এরকমই একটা ঘটনা এখানে তুলে ধরছি। বাল্টিমোরে এক বিখ্যাত আইনজীবী ছিলেন। তার সহধর্মিনী হঠাৎ-ই অত্যাশ্চর্য এক রোগের কবলে পড়ে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন। বাইরে থেকে লক্ষণ দেখে তাকে মৃত বলেই মনে হয়েছিল।
সে মৃত চোখের মণি দুটো নিশ্চল-নিথর আর নিষ্প্রভ, ঠোঁটদুটো স্বেতপাথরের মতো সাদা, গায়ে হাত দিলে উত্তাপের লেশমাত্রও মেলেনি আর নাড়ির গতিও স্তব্ধ হয়ে গেছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা তাদের জ্ঞান বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে তো রায় দেবেনই, রোগী আর জীবিত নেই।
চিকিৎসকরা রায় দেবার পরও মৃতদেহটাকে তিন-তিনদিন রেখে দেওয়া হয়েছিল। তার শরীর শক্ত হয়ে পাথর বনে গিয়েছিল। তারপর পচন শুরু হবার লক্ষণ দেখা দিতেই তাকে কবরস্থ করার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ, মিথ্যা আর মৃতদেহটাকে পচিয়ে লাভই বা কী?
এ পরিবারেরনিজস্ব কবর ছিল ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে। কফিনে মৃতদেহটাকে রেখে সেটাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর কফিনটাকে সেখানকার একটা তাকের ওপর রেখে সবাই বাইরে বেরিয়ে আসে। লোহার দরজাটা বন্ধ করে বাড়ি ফিরে আসে।
তারপর তিন বছর পেরিয়ে যায়। ইতিমধ্যে আর কোনো মৃতদেহ সে কবরখানায় নেওয়া হয়নি।
তিন বছর পর ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে আর একটা মৃতদেহ কফিন ঢোকাবার জন্য লোহার দরজাটা খোলার জন্য সজোরে টান দেওয়া মাত্রই কড়কড় শব্দ করে সাদা চাদর জড়ানো পুরো একটা নরকঙ্কাল এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পত্নীহারা সে আইনজীবির বাহু দুটোর ওপর। কার কঙ্কাল, তাই না? সে আইনজীবির মৃত স্ত্রীর।
মৃতা স্ত্রীর মৃতদেহটাকে তো কফিনে ভরে কবরখানার তাকটার ওপর রেখে আসা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এসে লোহার দরজার ওপরে ঝুললেন কি করে? ব্যাপারটা তো তাজ্জব বনে যাওয়ার মতোই বটে। উত্তরটা। শোনার পর সবারই মাথার চুল সজারুর কাঁটার মতো একদম খাড়া হয়ে যায়।
ব্যাপারটা এরকম–কবরস্থ করার দিন দুই পরই মরা বলে চিহ্নিত, মড়ার মতো। দেখতে দেহটার ভেতরে প্রাণচাঞ্চল্য জেগে ওঠে। জীবন্ত মানুষ। প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পেয়ে সেনির্ঘাৎ হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু করে দেয়। ফলে কফিনসমেত দেহটা নিচে পড়ে যায়। আছাড় খেয়ে কফিনটা যায় ভেঙে।
