আমি ইচ্ছে করেই আমার সোনার নস্যির কৌটাটা টেবিলের ওপর ফেলে রেখে মন্ত্রী ডি-র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামলাম।
নস্যির কৌটাটা তখন অবশ্যই মন্ত্রী মশাইয়ের চোখে পড়েনি। তা যদি পড়তই তবে তিনি সে ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ যে করতেন, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই।
পরদিন সকালে নস্যির কৌটাটা আনার জন্য আবার মন্ত্রী ডি-র বাড়ি হাজির হলাম।
ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসেই আমি অত্যুত্র আগ্রহের সঙ্গে গতদিনের প্রসঙ্গটা পাড়লাম।
আমাদের আলোচনা কিছুটা এগোতে এগোতেই হোটেলের জানালার ঠিকনিচ থেকে আচমকা একটা শব্দ, ঠিক যেন পিস্তলের আওয়াজের মতো তীব্র আওয়াজ আমার কানে এলো। পর মুহূর্তেই একই দিক থেকে ভয়ার্ত মানুষের আর্তস্বর ভেসে এলো। আতঙ্কিত বহু মানুষের চিত্তার চ্যাঁচামেচি–ঠিক যেমনটা শোনায়–অবিকল সেরকমই আওয়াজ শুনতে পেলাম।
মন্ত্রী ডি কিছু সময় উকর্ণ হয়ে আওয়াজটা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে জানালার কাছে গিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
ব্যস, আমিও মওকা পেয়ে গেলাম। যন্ত্রচালিতের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত তাসের তাকটার কাছে চলে গেলাম। ব্যস্ত-হাতে বাঞ্ছিত চিঠিটা কোটের পকেটে চালান। করে দিয়ে অবিকল একই রকম একটা চিঠি যে জায়গায়টায় রেখে দিলাম। পর মুহূর্তেই আবার নিজের চেয়ারে ফিরে এলাম। একটা ভাঁজ-করা কাগজের গাটে ‘ডি’ অক্ষরটা নকল করে বাড়ি থেকেই কাজ সেরে কোটের পকেটে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এবার বাঞ্ছিত কাজটা পুরোপুরি মেটাতে পেরে ভেতরে ভেতরে যারপরনাই খুশিই হলাম।
সদর রাস্তায় এক আধ-পাগলা বন্দুকধারীর খেয়ালের জন্যই এমন একটা গণ্ডগোল বেঁধে গেল। সে লোকটা একদল নারী-পুরুষকে তাক করে বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়েছিল। পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল, তার বন্দুকে একটাও গুলি ছিল না। তাই লোকটাকে হয় মাতাল, না হয় পাগল এরকমই কিছু একটা ভেবে সেখান থেকে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হল।
মন্ত্রী ডি-এবার জানালা থেকে ফিরে নিজের চেয়ারে এসে বসলেন।
আমি আরও দু-চারটি মামুলি কথাবার্তা বলে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামলাম।
আসলে পাগলের ভান করে হঠাৎ গুলি ছোঁড়ার জন্য আমি কিছু টাকা দিয়ে নিয়োগ করেছিলাম।
এ পর্যন্ত বলে বন্ধুবর দুঁপে থামলে আমি বললাম–সবই তো বুঝতে পারলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মাথায় আসছে না। নকল একটা চিঠি সেখানে রেখে দেবার কি এমন জরুরি ব্যাপার ছিল? গোড়াতেই সবার চোখের সামনে চিঠিটা নিয়ে এলেই তো ল্যাটা চুকে যেত, আর সমস্যাই বা এমনকি ছিল?
‘ছিল। সমস্যা অবশ্যই ছিল। মন্ত্রী ডি-বড়ই দুঃসাহসি পুরুষ। আর তিনি গায়ে শক্তিও ধরেন যথেষ্টই, আরও একটা কারণ অবশ্যই ছিল।
‘কারণ? আরও একটা কারণ? কিন্তু কী সে কারণ, জানতে পারি কি?
‘কারণটা হচ্ছে, হোটেলে তার পক্ষের লোকের সংখ্যাও নেহাৎ কম ছিল না। তুমি যা বলছ, আমি ঠিক সে পথ গ্রহণ করলে আমাকে আর ধড়ে প্রাণ নিয়ে ফিরতে হত । আর এরই ফলে প্যারিসের অধিবাসীরা হয়তো আর আমার নামটাও শুনতে পেত । তবে এছাড়া অন্য আর একটা উদ্দেশ্য আমার ছিল।
‘উদ্দেশ্য? অন্য আর একটা উদ্দেশ্য!’
‘হ্যাঁ। আমার রাজনৈতিক কার্যকলাপের কথা তো আর তোমার অজানা নয়। রাজনৈতিক কার্যকলাপের দিক থেকে আমি ওই মহিলাটির দলেরই একজন।
মন্ত্রী ডি-গত আঠারো মাস যাবৎ ওই মহিলাটাকে নিজের হাতের মুঠোয় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। এবার পরিস্থিতির পুরো পরিবর্তন ঘটে গেছে। মওকা বুঝে ওই মহিলাই মন্ত্রী মশাইকে পুরোপুরি বাগে এনে হাতের মুঠোয় করে নিয়েছেন। কারণ, ওই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটা যে আদৌ তাঁর হাতে নেই, এ-কথাটা তিনি জানতে না পারার জন্য তিনি তো এমন হাবভাবই দেখাবেন যেন চিঠিটা তার দখলে, হাতের মুঠোয়ই রয়েছে। আর এরই জন্য, এ পথেই তিনি নিজেই নিজের রাজনৈতিক সর্বনাশ, নিজের পতনকে অনিবার্য করে তুলবেন।
তবে এও সত্য যে, তার এ সর্বনাশ-পতন আকস্মিক তো হবেই, কিন্তু তার চেয়ে বিসদৃশ হবে অনেক, অনেক বেশি।
এবার কাতালীন সঙ্গীতের ব্যাপারটা সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। এ সম্পর্কে যা-কিছু মন্তব্য করেছেন, যে কোনো আরোহণের ব্যাপারেই তা প্রযোজ্য সম্পূর্ণ সত্যি। ব্যাপারটা এ রকম যে, যত সহজে ও শীঘ্র ওপরে ওঠা যেতে পারে তত সহজে কিন্তু নামা সম্ভব হয় না। অন্তত এক্ষেত্রে যিনি নামবেন, মানে পতনের মুখে এগিয়ে যাবেন, তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আন্তরিকতা নেই, করুণার তো প্রশ্নই ওঠে না।
কেন? আর যা-ই হোক লোকটা তো বিবেক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন এক ব্যক্তি। স্বীকার করতে আমার দ্বিধা নেই, আসল চিঠিটা কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে ওই তাসের তাকের ওপর যে চিঠিটা রেখে এসেছি, সেটা পড়ার পর তার চোখ-মুখের কী পরিবর্তন হবে তা দেখার জন্য আমি বড়ই আগ্রহী। আর এর জন্য মানসিক অস্থিরতাও কম অনুভব করছি না।
আমি বন্ধুবর দুপেঁ-র দিকে সামান্য ঝুঁকে অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে বলে উঠলাম–‘আগ্রহী? আগ্রহী কেন? সে চিঠিটায় তুমি এমনকি লিখেছ, যার জন্য তোমার মধ্যে।
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই দুঁপে এবার বলল–‘বন্ধু, একটা কথা তো অবশ্যই স্বীকার করবে, যে চিঠিটা আমি ওই তাসের তাকের ওপর রেখে এসেছি তার পরিবর্তে সেখানে কিছু না লেখা, মানে সাদা একটা কাগজ রেখে আসাটা কী উচিত হত? আমি মনে করি তাতে তাকে অপমান করার সমানই হয়ে দাঁড়াত।
