এরকম ভাবনা-চিন্তার ওপর নির্ভর করে আমি এক সকালে একেবারে হঠাৎই মন্ত্রী ডি-র হোটেলে চলে গেলাম।
কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। মন্ত্রী ডি-ঘরেই রয়েছেন দেখলাম।
আমি তার ঘরে ঢুকতেই তিনি এমন হাব ভাব দেখাতে লাগলেন যে, ক্লান্তি অবসাদে তার শরীর যেন আর চলছে না। আমাকে যেন তিনি এটাই বোঝাতে চাইছেন, বিশ্বের জীবিত মানুষগুলোর মধ্যে তার কর্মক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ব্যাপারটা মিথ্যা নয়। কিন্তু কখন তার কর্মক্ষমতা অসাধারণ থাকে? যতক্ষণ তিনি সবার নজরের বাইরে থাকেন ততক্ষণই।
আমি স্বগতোক্তি করলাম–‘আমার কর্মক্ষমতাই কোন অংশে কম? আমার চোখে তখন একটা সবুজ চশমা। আমি স্লান হেসে চোখের রোগ দেখা দেওয়ার জন্যই এ চশমাটা ব্যবহার করতে হয়েছে, মন্ত্রী ডি’র কাছে নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করলাম।
মন্ত্রী ডি-র সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে আমি সবুজ চশমার আড়াল থেকে তার ঘরটায় অনুসন্ধিৎসু চোখের মণি দুটোকে বুলাতে লাগলাম। আমার একমাত্র লক্ষ্য, গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটা কোথায় পাওয়া যেতে পারে।
আমি অনুসন্ধানের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলাম অদূরবর্তী বড় লোহার টেবিলটাকে। দেখলাম তার ওপরে কিছু চিঠি আর কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর কয়েকটা বই ও দু-একটা বাদ্যযন্ত্রও রাখা আছে। দূর থেকে খোঁজা খুঁজি করে সন্দেহ করার মতো কিছুই আমার চোখে পড়ল না।
এবার টেবিলটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে ঘরের সর্বত্র চোখ বুলাতে বুলাতে এক সময় একটা তাস রাখার তাকের ওপর আমার দৃষ্টি স্থির হল। সেটাকে ময়লা এক টুকরো নীল ফিতের সাহায্যে ম্যান্টেল-পিসের মধ্যবর্তী একটা পিতলের বোতামের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেটার তিন-চারটি খেপে পাঁচ-ছয়টি ভিজিটিং কার্ড আর একটামাত্র চিঠির দিকে আমার নজর গেল। অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে লক্ষ্য করলাম, চিঠিটা দোমড়ানো-মোচড়ানো আর খুবই ময়লা। আর ছিঁড়ে কয়েকটা টুকরো করে ফেলা হয়েছে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, সেটাকে নষ্ট করে ফেলার জন্যই ইচ্ছে করে বুঝি ছেঁড়া আরম্ভ করা হয়েছিল। হঠাৎ সে ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটে, ছেঁড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আমি মন্ত্রী ডি-র সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে প্রায় সর্বক্ষণই সবুজ চশমাটার আড়াল থেকে ওই চিঠিটার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে লাগলাম। এবার চিঠিটার ওপরের ‘ডি’ অক্ষরাট আমার দৃষ্টিতে পড়ে গেল। ডি-র নামে মেয়েলি হাতে ঠিকানাটা লেখা হয়েছে। তা-ও আমি সহজেই বুঝতে পারলাম।
‘ডি’ অর্থাৎ স্বয়ং মন্ত্রীর নামেই যে চিঠিটা লেখা হয়েছে, এ বিষয়ে আমার আর তিলমাত্র সন্দেহও রইল না।
এবার আমি আবিষ্কার করলাম, যেন চিঠিটাকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করে, নিতান্ত অবহেলায় চিঠিটাকে ওই খোপটায় ছুঁড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে।
আমি চিঠিটাকে প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারলাম, এ-অমূল্য সম্পদের খোঁজেই তো এখানে হানা দিয়েছি। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিসন্দেহ যে, চিঠিটা পুলিশের বড় অফিসার আমাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন, এটা সেটা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এর গায়ের মোহরটা অধিকতর বড় আর কালো, আর তার গায়ে ‘ইউ’ অক্ষরটা লেখা, তাতে মোহরটা ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট এবং লাল। তার গায়ে এস-পরিবারের হাতে লেখা। এখানে মেয়েলি হাতের লেখা ছোট ছোট হরফে, লেখা হয়েছে মন্ত্রী ডি-কে; আর যেখানে স্পষ্ট হরফে রাজপুরুষকে লেখা হয়েছে। একমাত্র আকারের দিক থেকে উভয় চিঠির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গেছে।
সাদৃশ্যের তুলনায় বৈসাদৃশ্যগুলো খুবই বেশি প্রত্যক্ষ; ছেঁড়া, ময়লা অবস্থাটা মন্ত্রী ডি-র গোছগাছ ছিমছাম স্বভাবের খুবই বিরোধী আর চিঠিটা যে একেবারেই মূল্যহীন সেটা সবার কাছে প্রমাণ করার জন্য তিনি এরকম চেষ্টায় উৎসাহি হয়েছেন। আর চিঠিটাকে এমন খোলামেলা ও হাতের নাগালের মধ্যে এমন একটা জায়গায় রাখা হয়েছে যাতে কেউ ঘরে ঢুকেই সেটাকে দেখতে পাবে–যা আমার পূর্ব সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। আমি এবার মনকে শক্ত করে বাঁধলাম।
এখানে আমার আগে। প্রথমের দিকে আমার মনে যে সন্দেহ ছিল এখন তা আরও অনেকগুণ বেড়ে গেল।
মন্ত্রী ডি-র ঘরে আমি নানা অজুহাতে যত বেশি সময় সম্ভব কাটাতে লাগলাম। আর একমাত্র চিঠিটার দিকে নজর রাখাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।
এবার আমি মন্ত্রী ডি-র সঙ্গে তারই প্রিয় একটা বিষয় নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা শুরু করলাম। আর আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে আমি চশমার সবুজ কাঁচের ভেতর দিয়ে চিঠিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।
শেষমেশ এমন একটা বস্তুর দিকে আমার নজরে পড়ল, যাতে আমার মনে যেটুকু সন্দেহ ছিল তা-ও নিঃশেষে উবে গেল। ব্যাপারটা হচ্ছে, লক্ষ্য করলাম, চিঠিটার ধারগুলো ঘষায় ঘষায় এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেছে। ব্যাপারটা এমন যে, মোটা একটা কাগজকে একবার ভাঁজ করে আবার সেটাকেই বিপরীত দিকে ভাঁজ করলে কোণগুলো যেমন অমসৃণ হয়ে যায় এটাও ঠিক সেরকমই হয়ে গেছে।
ব্যাপারটা নিয়ে আরও কয়েক মুহূর্ত ভাবনা-চিন্তা করার পর আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, চিঠিটাকে পুরোপুরি উলটে দিয়ে নতুন করে ঠিকানাটা লেখা হয়েছে এবং তার গায়ে মোহর আঁকা হয়েছে।
