আমি মুচকি হেসে তার কথাটা সমর্থন করলাম।
সে কিন্তু থামল না। তার বক্তব্যের জের টেনে এবার সে বলল–‘যে কথা বলছিলাম, অন্য পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো করে যে কোনো ব্যাপার নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে। কিন্তু কোনো অপরাধীর বুদ্ধিমত্তা বা মানবিক গঠন যদি তাদের বুদ্ধিমত্তা বা চরিত্র থেকে সতন্ত্র হয় তবে তারা তাদের কাছেই হার মেনে যায়। মন্ত্রী ডি-র ব্যাপারটাকে আমার বক্তব্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে মনে করা যেতে পারে।
একটা ব্যাপার ভেবে দেখুন, পুলিশের বড় অফিসারের সহযোগিরা সবকিছুকে নাড়াচাড়া করেছেন, খোঁজাখুঁজি করেছেন, ছিদ্র করে করে দেখেছেন, অনুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কম করেননি। আবার বাড়ির বাইরের সম্পূর্ণ চত্বর তারা বর্গইঞ্চি হিসেবে মেপে মেপে পরীক্ষাও করেছেন, ঠিক কিনা?
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম–ঠিক। সবই ঠিক বলেছ।
দুঁপে পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বলল–‘আসলে এসব ব্যাপার স্যাপার কি জানেন? আরে, পুলিশের বড় অফিসার বছরের পর বছর ধরে নিজের কর্ম-অভিজ্ঞতা সম্বল করে কিছু সংখ্যক ছক বাধা রুটিন মাফিক কাজ করতেই কেবল জানেন, আর এটাই তার পক্ষে স্বাভাবিক। ফলে কার্যত তিনি প্রথম থেকেই গোলক ধাঁধায় অন্ধের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফায়দা কিছুই হয়নি। তার ব্যর্থতার মূল লুকিয়ে আছে তার ধারণার মধ্যে, তিনি প্রকৃতই একটা আহাম্মক, কারণ কবি হিসেবে তার নাম-যশ রয়েছে। তার মতে নির্বোধরাই কবি, আর দুনিয়ায় যত কবি রয়েছে সবাই নির্বোধ।
‘আচ্ছা, তিনি সত্যি একজন বড় কবি? আমি বললাম–‘আমি তো জানতাম তারা দুই ভাই। আর উভয়েই পণ্ডিত। আমার বিশ্বাস ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস’ নিয়ে মন্ত্রী ডি–বহু পড়াশুনা করেছেন। অতএব তিনি কবি নন, একজন গণিতজ্ঞ। তিনি আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই দুঁপে বলে উঠল–‘ভুল! তুমি যা জান সবই ভুল। আমি খুব ভালোই জানি–তিনি কবি ও গণিতজ্ঞ উভয়ই। কোনো কবি যদি গণিত বিষয়ে পণ্ডিত হন তবে তার বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনাশক্তি খুবই প্রখর হয়। তার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু যদি কেবলমাত্র গণিতজ্ঞ হতেন তবে কিছুতেই তার বুদ্ধি এমন তীক্ষ্ণ হত না। আর তার পক্ষে পুলিশ বিভাগের এত উঁচু পদে, মানে বড় অফিসার হওয়া কিছুতেই সম্ভব হত না, হত কি?
‘ভায়া এমন কথা বলে আপনি কিন্তু আমাকে খুবই অবাক করলেন মি. দুঁপে। সত্যি বলছি, আপনার কথাগুলো পৃথিবীর সবাই যা বলে ঠিক তার বিপরীত। শত শত বছর ধরে প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে তো আপনি এক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন না। সবাই তো জানে, আর স্বীকারও করে যে, গাণিতিক বুদ্ধিই হচ্ছে আসল বুদ্ধি, আপনিও আশা করি মেনে নিচ্ছেন?
‘আরে ধৎ! ওসব তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এখন শিকেয় তুলে রাখুন। আমরা আলোচ্য বিষয় থেকে দুরে সরে না গিয়ে বরং সে প্রসঙ্গেই আলোচনায় লিপ্ত থাকি। আমার বক্তব্য হচ্ছে, মন্ত্রী ডি–যদি কেবলমাত্র একজন গণিতজ্ঞ হতেন তবে তাকে ওই চেকটা তুলে দিতে হত না। আমি নিসন্দেহ ছিলাম, তিনি কবি ও গণিতজ্ঞ দুই-ই। আর এ কথা মাথায় রেখেই আমি তার বিচার করেছি। তিনি যে একজন মন্ত্রী এবং সাহসি চক্রান্তকারী, আমি ভালোই জানতাম। আর এ কারণেই আমি আরও নিসন্দেহ ছিলাম, এরকম একজন ঘাঘু মানুষ কিছুতেই পুলিশের কাজকর্ম সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ থাকতে পারেন না। আর এরই জন্য তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, পুলিশ তাকে যে কোনো সময় পথের মাঝে পাকড়াও করবে, বাস্তবেও তা-ই ঘটেছিল।
শুধু কি এ-ই? তিনি তো জানতেনই যে, তার বাড়ি-ঘর গোপনে তল্লাসি করা হবেই হবে, কার্যক্ষেত্রে হয়েছেও তা-ই। তাই কোনো বস্তু লুকিয়ে রাখার সাধারণ ও সম্ভাব্য জায়গাগুলো যে তিনি মন থেকে মুছে ফেলে দেবেন এ-তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই না?
আমি ছোট্ট করে প্রায় অনুচ্চারিত স্বরে বলে উঠলাম–হুঁম্’!’
সে আবার বলতে লাগল–‘আমি ধরেই নিয়েছিলাম, তার বিচার-বুদ্ধি এত ভোতা হতে পারে না যে, হোটেলের যে কোনো জটিল ও গোপন স্থানই পুলিশের বড় অফিসারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়বেই পড়বে। আর এ ব্যাপারে তিনি শতকরা একশো ভাগই নিসন্দেহ ছিলেন। তার ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি আরও অনুমান করি, মন্ত্রী মশাই যেভাবেই হোক, সোজাপথ ধরেই তিনি অগ্রসর হবেন। পুলিশের বড় অফিসারের বুদ্ধি খুবই ভেঁতা। তাই তার বুদ্ধিতেই কুলায়নি যে, মন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটাকে একেবারে সবার চোখের সামনে রেখে দিতে পারেন। কিন্তু সেটাকে সবার চোখের আড়ালে রাখাই উচিত পথ।
আমার এবার প্রথম ও প্রধান কাজ হল, মন্ত্রী ডি-র অসীম সাহস, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং কর্মক্ষমতার কথা ভাবনা-চিন্তা করা। দীর্ঘসময় ধরে ভেবে আমি এ-সিদ্ধান্তেই পৌঁছলাম যে, গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটাকে তিনি সর্বদা হাতের নাগালের মধ্যেই রাখবেন। আমি যখন গভীর ভাবনায়, তলিয়ে গেলাম, পুলিশের বড় অফিসারের নিরবচ্ছিন্ন তল্লাসি এটাই প্রমাণ করেছিল, চিঠিটা এমন কোনো জায়গায় অবশ্যই নেই যেখান থেকে তার পক্ষে সেটাকে বের করা সম্ভব হবে। অতএব আমি আরও নিশ্চিত হলাম যে, মন্ত্রী ডি চিঠিটাকে কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি, আর করবেনও না।
