‘হুম!
‘কৃপণ ধনী লোকটা কাল্পনিক রোগীর রোগ-যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে যে এবার নেটিকে বলেছিল, মনে করুন, তার শরীরে এই লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপনি তাকে কোন ওষুধ ও পথ্যের ব্যবস্থা দেবেন বলুন তো?’
এবার নেটি চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন–ওষুধের কথা জানতে চাইছেন কী ভাই,!
‘কেন? ব্যামো হয়েছে, ওষুধ দেবেন না?
‘আরে ভাই,, আগে ডাক্তারের পরামর্শ তো নেবেন। তারপর তো ওষুধের বিবেচনা করা হবে।’
গল্পটা শুনে পুলিশের বড় অফিসার জিহকচকিয়ে উঠে বললেন–‘কিন্তু আমার কথা তো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমি তো পরামর্শ নিতে এবং বিনিময়ে মূল্য দিতেও এক পায়ে খাড়া, যে বা যারা আমাকে উপযুক্ত সাহায্য করবেন, তাকে পঞ্চাশ হাজার ফ্রা হাসিমুখে দিতে রাজি আছি।’
তার মুখের কথাটা শেষ হতে না হতেই দুঁপে ব্যস্ত হাতে ড্রয়ারটা খুলে একটা চেকবই বের করল। সেটা পুলিশের বড় অফিসারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল–‘বহুৎ আচ্ছা! তবে ওই পরিমাণ ফ্রা-র একটা চেক আমার নামে লিখে দিন।
তার কাণ্ডকারখানা দেখে আমি যেন একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মুখ দিয়ে কোনো রা সরল না। কেবল নীরব চাহনি মেলে ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
দুঁপে এবার যা বলল সেটা অনেক বেশি বিস্ময়কর। সে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল– চেকটা লিখে দিন। লেখা শেষ করে এটা আমার হাতে তুলে দেওয়ামাত্র আমি আপনার বাঞ্ছিত চিঠিটা আপনার হাতে তুলে দেব, কথা দিচ্ছি।
আমি চোখ দুটো কপালে তুলে সবিস্ময়ে বলে উঠলাম–‘তুমি দুঁপে!’
‘তুমি এ কী অদ্ভুত কথা শোনাচ্ছ!’
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি।’ সে এবার আরও দৃঢ়স্বরে কথাটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিল।
তার কথায় আমি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। আর পুলিশের বড় অফিসার জি, তো রীতিমত ভিমরী খাবার যোগাড় হলেন।
সত্যি কথা বলতে কি, কথাটা শুনেই তার বাকশক্তি যেন রোহিত হয়ে গেল। চোখের তারায় অবিশ্বাসের ছাপ এঁকে তিনি আমার বন্ধুবর দুঁপে-র দিকেনিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার হাবভাব দেখে মনে হল, তার চোখের মণি দুটো বুঝি কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনি নিজেকে একটু সামলে সুমলে নিয়ে কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দুঁপের কাছ থেকে চেকবই আর কলমটা নিলেন। তারপরও কিছু সময় নির্বাক নিস্পন্দভাবে কাটিয়ে চেকটা লিখলেন। সেটার গায়ে পঞ্চাশ হাজার ফ্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় লেখাঝোকা সেরে যথাস্থানে স্বাক্ষরও করলেন। তারপর চেকের পাতাটা ছিঁড়ে সেটাকে টেবিলের ওপর দিয়ে দুঁপের দিকে এগিয়ে দিলেন।
দুঁপে স্বাভাবিকভাবেই তার হাত থেকে চেকটা নিল। মুখের সামনে ধরে মুহূর্তের জন্য সেটার গায়ে চোখ বুলিয়ে নিয়ে কোটের ভেতরের পকেটে চালান করে দিল। এবার ড্রয়ারটা খুলে বহু আকাঙ্ক্ষিত চিঠিটা বের করে নিঃশব্দে পুলিশের বড় অফিসারের হাতে তুলে দিল।
চিঠিটা হাতে পাওয়ামাত্র তিনি নিতান্ত ব্যস্ততার সঙ্গে সেটার ভাজ খুলে দ্রুত চোখ বুলাতে লাগলেন। পর মুহূর্তেই কাঁপা-কাঁপা পায়ে অতি কষ্টে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর এক দৌড়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে, তারপর বাড়ি থেকেও বেরিয়ে গেলেন।
আশ্চর্য ব্যাপার! বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে তিনি আমাদের সঙ্গে একটা কথাও বললেন না।
তিনি চলে যাবার পর বন্ধুবর দুঁপে ব্যাপারটা আমার কাছে ব্যক্ত করল।
তাদের বিচারে পুলিশের লোকরা খুবই কর্মঠ ও দক্ষ। তারা খুবই অধ্যবসায়ী। কায়দা কৌশলও ভালোই বোঝে। আর নিজেদের কর্তব্যের ব্যাপারেও তাদের সচেতনতার ঘাটতি নেই।
তাই তো পুলিশের বড় অফিসার জি–যখন মন্ত্রী ডি-র হোটেলে তার তদন্তের বিবরণ আমাদের শোনালেন, তখনই আমি নিঃসন্দেহ হয়ে পড়লাম, তার তদন্ত নির্ঘাৎ আশানুরূপ হয়েছে। অবশ্য সে সঙ্গে এও বলছি, তার পরিশ্রমের ফলে সাফল্য যতটা হওয়া সম্ভব ঠিক ততটাই হয়েছে।
আমি আগ্রহান্বিত হয়ে বললাম–‘ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। এর অর্থ কি বল তো?’
‘তারা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, সেগুলো কেবলমাত্র যে সঠিক ছিল তা-ই নয়, সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনও করেছিল। তাই মনে করা যেতে পারে, চিঠিটা যদি তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে থাকত তবে সেটা তারা অবশ্যই পেয়ে যেত। এমন একটা কথা তো বাচ্চা ছেলেও-‘
‘হুম অস্পষ্ট একটা উচ্চারণ করা ছাড়া আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথাই বেরোল না। ফলে তার কথাটা শুনে আমি কেবলমাত্র ঠোঁট দুটোর ফাঁক দিয়ে ছোট্ট করে হাসলাম। তবে এও সত্যি, তার কথাগুলো খুবই গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ ছিল।
বন্ধুবর দুঁপে আবার মুখ খুলল–‘দেখুন, তারা যে পদ্ধতিটা অবলম্বন করেছিল আর সেটাকে রূপদান করার জন্য তারা যে পথ ধরেছিল–উভয়ই ভালো। কিন্তু একটা ব্যাপারে তাদের মারাত্মক একটা ত্রুটি ছিল আর লোকটা সম্পর্কে তার অপপ্রয়োগে পুলিশের বড় অফিসার এবং তার সহকারীরা যে প্রায়ই আহাম্মক বনে যায় এর মুখ্য কারণ-ই হচ্ছে যাকে নিয়ে সমস্যা তার বুদ্ধি ও ক্ষমতার কোনো খোঁজই তারা রাখে না। কাজে নামার পর তারা কেবল মাত্র নিজেদের বুদ্ধিসত্তার ও কৌশলটাকেই বড় করে দেখে।
আমি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে কথাগুলো শুনতে লাগলাম। দুপে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল–আরও আছে, তারা কোনো গোপন জিনিস ও গোপন তথ্য খুঁজে বের করার সময় কেবলই তাকে, নিজেরা কোন কায়দায় কোন জিনিস লুকিয়ে রাখে।
