‘যে সব বইয়ের সাধারণ মলাট দেয়া, আগে সেগুলোর কথা বলেছি, তাদের মলাট খুলে খুলে পরীক্ষা করেছি। আর যে সব মোটাসোটা বই বোর্ড-বাঁধানো তাদের আসল বাঁধাইয়ের ওপর কোনোরকম জোড়াতাপ্পি আছে কিনা খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে কসুর করিনি। তেমন কিছু নজরে পড়ামাত্র অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষায় মেতে গেছি।’
‘কিন্তু কার্পেটের আরও নিশ্চয়ই অভিযান চালিয়েছেন, তাই না?
‘সে তো অবশ্যই। প্রতিটা কার্পেট তুলে যেখানে-সেখানে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নল লাগিয়ে পুরোদমে পরীক্ষায় মেতে গেছি।’
‘কিন্তু দেওয়ালে সাঁটা কাগজপত্রের ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন?
‘কার্পেটের মতোই কাগজ তুলে তুলে অনুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেছি।
‘মাটির তলার ঘরগুলোও নিশ্চয়ই বাদ দেননি, কী বলেন?
‘না, বাদ অবশ্যই দেইনি।
‘তাই যদি সত্যি হয় তবে তো দেখছি, আপনাদের হিসেবেই ভুল হয়ে গিয়েছিল। আমি নির্দিধায় বললাম।
পুলিশের বড় অফিসার ভ্রূ কুঁচকে বললেন–‘ভুল? হিসেবে ভুল?
‘হ্যাঁ, ভুল অবশ্যই ছিল। আসলে আপনাদের বাঞ্ছিত চিঠিটা তো আর তার বাড়িতে অবশ্যই ছিল না।
‘এবার আপনি একটা খুবই ভালো কথা বলেছেন। এবার বন্ধুবর দুঁপে-র দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন–‘মি. দুঁপে, আপনিই বলুন, এ-পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? আপনার পরামর্শের দাম আমি অবশ্যই দেব।’
মি. দুঁপে বললেন–‘আমি কিন্তু বলব, বাড়িটাকে আরও ভালো করে প্রীক্ষা নিরীক্ষা করা দরকার।
‘তাতে কোনো ফায়দাই হবে না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, চিঠিটা অবশ্যই হোটেলে নেই। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার ধড়ে প্রাণের অস্তিত্ব আছে, যেমন সত্য ঠিক তেমনই সত্য চিঠিটা হোটেলে নেই।
মি. দুঁপে আমতা-আমতা করে বললেন–‘কিন্তু এর চেয়ে ভালো কোনো পরামর্শ তো আমি দিতে পারছি না। তবে অবশ্য চিঠিটার সঠিক বিবরণ আপনি অবশ্যই পেয়ে গেছেন, তাই নয় কী?
‘হ্যাঁ, তা অবশ্যই পেয়েছি বটে।
কথাটা বলতে বলতে পুলিশের বড় অফিসার পকেট থেকে একটা ছোট দিনলিপি বের করে একের পর এক পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। সে পাতায় লেখা খোয়া-যাওয়া চিঠিটার, আর তার বাইরের বিস্তারিত বিবরণ আমাদের পড়ে শোনালেন।
চিঠিটার বক্তব্য পড়া শেষ করে দিনলিপিটা ভাঁজ করে কোটের পকেটে চালান দিতে দিতে চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়েই ব্যস্ত-পায়ে চোখের পলকে আমাদের দৃষ্টির বাইরে চলে গেছেন।
প্রায় এক মাস আর পুলিশের বড় অফিসার মি. জি-র সঙ্গে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হলো না। তারপর হঠাৎ একদিন তিনি আবার ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেন।
আমি একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে তাকে বসতে বললাম।
চেয়ারটায় আয়েশ করে বসে তিনি একটা চুরুট দুঠোঁটের ফাঁকে আটকে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন। তারপর একগাল ধোয়া ঘরময় ছড়িয়ে দিয়ে কিছু প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু করলেন।
আমিই শেষপর্যন্ত কথাটা পাড়লাম–‘মি. জি–সেই চিঠি-চুরির ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত কী হল, বলুন তো? দীর্ঘদিন ধরে তল্লাসি চালিয়ে কোনো ফায়দা হচ্ছে না দেখে কী আপনি মন্ত্রীকে নিয়ে টানা হেঁচড়া করার চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন?
‘এরকমটা মনে করতে পারে বটে। তবে মি. দুঁপে-র পরামর্শ অনুযায়ী তল্লাসিটা চালাতে ত্রুটি করিনি। তবে সব চেষ্টাই বিফলে গেছে। অবশ্য আমি জানতাম কোনো ফায়দাই তাতে হবে না।’
দুঁপে বলল–‘আপনি যেন সেদিন পুরস্কারের অর্থমূল্য কত বলেছিলেন?
‘আরে পুরস্কারটা বেশ বড় অঙ্কেরই ছিল। তবে সঠিক পরিমাণটা আমি বলতে রাজি নই। কিন্তু এটুকু অন্তত বলতে পারি কেউ যদি ওই চিঠিটা আমার হাতে তুলে দেয় তবে তার বিনিময়ে আমি তাকে হাসিমুখে পঞ্চাশ হাজার যঁ-র চেক দিয়ে দেব।
আমি বললাম ‘পঞ্চাশ হাজার ফ্রা!
‘হ্যাঁ, পঞ্চাশ হাজারই দিতে রাজি। একটা কথা কি জানেন, দিন যতই যাচ্ছে ওই চিঠিটার গুরুত্ব ততই বেড়ে যাচ্ছে। আর সে সঙ্গে পুরস্কারের মূল্য লাগিয়ে বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।
‘দ্বিগুণ!
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। তবে এও সত্য যে, তিনগুণ হয়ে গেলেও আমি যা-কিছু করতে পেরেছি তার বেশি এক তিলও করতে পারতাম না, এতে কোনোই সন্দেহ নেই।
‘অবশ্যই–তা তো অবশ্যই। দুঁপে চুরুটে ধোয়া ছেড়ে কথাটা বলে উঠল ‘তবে আমার কি বিশ্বাস, জানেন মি. জি?
‘কী? কোন কথা বলতে চাইছেন?’
‘আমি কিন্তু বলব, ব্যাপারটা নিয়ে সম্পূর্ণরূপে সক্রিয় হননি।
পুলিশের বড় অফিসার চোখের তারায় জিজ্ঞাসার ছাপ এঁকে দুঁপে-র মুখের দিকে তাকালেন।
দুঁপে পুর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলতে লাগল আমার বিশ্বাস আপনি আরও সচেষ্ট হলে অনেক কিছুই করতে সক্ষম হতেন।
কপালের চামড়ার ভাঁজ এঁকে এবার পুলিশের বড় অফিসার বললেন–সে কি, আরও অনেক কিছু করতে পারতাম, আপনি বলছেন! কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব হত অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
‘আপনি তো সোর্স বা গোয়েন্দা কি নিয়োগ করতে পারতেন না? আচ্ছা, এবারে নেটির গল্পটা আপনার মনে নেই?
‘আরে ধৎ’! না, ওসব গল্পটল্প আমার মনে নেই। এবার নেটির গল্পে কথা ছাড়ান দিয়ে কাজের কথা কিছু থাকলে বলুন।
‘হ্যাঁ, সে-তো অবশ্যই। তাকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দিন। কিন্তু একবার এক ধনী কৃপন লোক এবার নেটির কাছে গিয়ে ডাক্তারি পরামর্শের জন্য তাকে জোর তোয়াজ শুরু করে দিয়েছিল। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে তার বাড়ি গিয়ে হরেকরকম কথাবার্তার ফাঁকে এক সময় নিজের ব্যামোর কথাটাকে এক কাল্পনিক লোকের ব্যামো বলে বর্ণনা করে ফেলেছিল।
