‘কুশনওয়ালা চেয়ার, মানে ভেঙেচুরে—’
‘আরে ধ্যত! না ভেঙে কি কুশনওয়ালা চেয়ারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্ভব নয়!’
‘কিন্তু কিভাবে? আমি চোখে অবিশ্বাসের ছাপ একে বললাম।‘
‘ইয়া লম্বা লম্বা সূঁচ চালিয়ে চেয়ারের কুশনগুলোকে বার বার এঁফোড়-ওঁফোড় করে পরীক্ষা করি–ব্যস, কাজ হাসিল।‘
‘তারপর। তারপর কী করলেন?’
‘তারপরের কাজ হল, টেবিলের ঢাকনাটা খুলে পরীক্ষা করা। করলামও তাই!’
‘কারণ কী?’
‘কারণ অবশ্যই আছে।‘ আঙুলের টোকায় চুরুটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে তিনি বললেন।
‘সেটাই তো আমি জানতে চাইছি, টেবিলের ঢাকনা সরাতে যাওয়ার পিছনে কী উদ্দেশ্য ছিল?’
‘শুনুন তবে, অনেক সময় দেখা যায়, টেবিলের ঢাকনা বা অন্য কোনো অংশ সরিয়ে ফেলে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পাতলা জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়। আবার দেখা যায় কোনো একটা পায়ার ভেতরের দিকটা সতর্কতার সঙ্গে খুঁড়ে ফেলে দিয়ে জরুরি ছোট জিনিসটা তার মধ্যে চালান করে নিয়ে আবার ঢাকনাটা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
‘কিন্তু খাটের ব্যাপার?’
‘খাটকে ব্যবহার করা হয়, ছত্রীকে সরিয়ে ফেলে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।‘
‘এখন জিজ্ঞাস্য হচ্ছে, বাইরে থেকে ছোট হাতুড়ি বা এমনকিছু দিয়ে ঠোকাঠুকি করে কী শব্দ শুনে বাইরে থেকে সদ্য তৈরি গর্তটার অস্তিত্বের কথা অনুমান করা সম্ভব হয় কী?’
‘মোটেই না। অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা গর্তের মধ্যে ভরে যদি তাতে আচ্ছা করে তুলা খুঁজে দেওয়া যায়, তবে তো বোঝার কোনো উপায়ই থাকে না।‘
‘তবে আপনি।‘
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তিনি বলতে লাগলেন–‘আমার ক্ষেত্রে তো সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, কোনোরকম শব্দ না করে কাজ হাসিল করা।‘
‘সমস্যা হচ্ছে, আপনি যেভাবে কোনো জিনিস গর্তে খুঁজে দেবার কথা বললেন, তাই যদি হয় তবে তো আপনার পক্ষে ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্রকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া সম্ভব নয়, কী বলেন?
‘সে তো নিশ্চয়ই।
‘আর একটা কথা, একটা চিঠি, মানে একটা কাগজকে তো পাকিয়ে পাকিয়ে একেবারে সঁইয়ের মতো আকৃতিবিশিষ্ট করে একটা খাট বা চেয়ারের পাটাতনের কাঠের ভেতরে চালান করে দেওয়া তো অসম্ভব নয়। সবগুলো চেয়ারকে তো আর আপনাদের পক্ষে ভেঙে দেখা সম্ভব হয়নি, কী বলেন?
‘অবশ্যই তা সম্ভব হয়নি, সে চেষ্টা করিওনি। আমরা কিন্তু আরও ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি।
‘উপায়টা কি, দয়া করে বলবেন কী?
‘উপায়টা হচ্ছে, খুবই শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে আমরা প্রতিটা আসবাবপত্রের জোড়কে তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেছি। নতুন কোনো জোড়া তাপ্পি থাকলে তা কিছুতেই আমাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারেনি। আসলে অতি সূক্ষ্ম কাঠের ঔড়াও অনুবীক্ষণ যন্ত্রটায় আপেলের আকৃতি বিশিষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আঠা লাগাবার সময় সামান্যতম ত্রুটি কিছু থাকলে, আর দুটো কাঠের টুকরো জোড়া দেবার সময় এতটুকুও ফাঁক যদি নজরে পড়ে তবেই আমরা সেটার ক্ষেত্রে জোর পরীক্ষা চালিয়েছি।’
‘তবে আপনার কথায় তো বোঝা যাচ্ছে আপনারা বিছানাপত্র ও বিছানার চাদর, কার্পেট, মশারি আর আয়না ও ফ্রেম–সবকিছুই তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, কি বলেন?
‘তা-তো অবশ্যই করেছি। হ্যাঁ, যে কথা বলতে চাচ্ছি, প্রতিটা আসবাবপত্রকে এভাবে পরীক্ষা করার পর আমরা বাড়িটার দিকে মন দিলাম। প্রথমে গোটা বাড়িটাকে কয়েকটা অংশে ভাগ করে নিয়ে তাদের আলাদা আলাদা নামকরণ সেরে ফেললাম।
নামকরণ?’ আমি মুচকি হেসে বললাম–‘নামকরণের ব্যাপারটা তো ঠিক বুঝতে পারলাম না।’
‘মানে বাড়িটার এক-একটা ভাগকে সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করলাম। উদ্দেশ্য। ভুলবশত যেন কোনো অংশ বাদ না পড়ে যায়। তারপর এক-একটা অংশকে প্রতি বর্গইঞ্চি করে শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রটাকে চোখে লাগিয়ে সাধ্যমত যত্নসহকারে পরীক্ষার কাজে মেতে গেলাম। এমনকি পাশাপাশি দুটো বাড়িকেও তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করতে ছাড়িনি।’
‘পাশাপাশি বাড়ি দুটোকেও পরীক্ষা করেছেন? তবে তো আপনাদের অনেক হাঙ্গামা পোহাতে হয়েছে, তাই না? আমি কপালের চামড়ায় ভজ এঁকে সবিস্ময়ে বললাম।
‘অবশ্যই। তা না করলে চলবেই বা কেন, বলুন? আর পুরস্কারের অর্থমূল্য তো আর কম নয় মি.।’
তবে কী বাড়ির চারদিকের জমিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন নাকি?
‘তা কি আর করা যাবে, বাড়ির চারদিকের জমিই তো পাকা, ইট আর সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। সে জন্যই তো আমাদের পরিশ্রম আর হাঙ্গামা অনেকাংশে কমে গেছে। পুরা অঞ্চলটা নয়, দুটো ইটের জোড়া দেওয়া জায়গাগুলো আমরা কেবলমাত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি। তবে সন্দেহজনক কোনোকিছুই আমাদের নজরে পড়েনি। কাজেই এক্ষেত্রেও হতাশ হতেই হল।
‘আর একটা কথা বড় জানতে ইচ্ছা করছে।
‘বলুন, কি আপনার জিজ্ঞাস্য?
‘মন্ত্রী ডি-র ফাইলপত্র আর গ্রন্থাগারে পুঁথিপত্রও অবশ্যই ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন নাকি?’
‘অবশ্যই। প্রতিটা ফাইল আর প্রতিটা কাগজের মোড়ক থেকে শুরু করে প্রতিটা পুঁথিপত্র পর্যন্ত পাতি পাতি করে খুঁজেছি। অন্য সব তদন্তকারী পুলিশ অফিসারের মতো কেবলমাত্র নাড়াচাড়া বা ঝাঁকাঝাঁকি দিয়ে দেখিনি, বরং প্রতিটা পাতা উলটে দেখেছি।
‘বইগুলোর মধ্যে মোটা বইও নিশ্চয় ছিল–সেগুলোর ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, বলুন শুনি!’
