‘একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না-’
‘কি? কোন ব্যাপারটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, বলুন তো?
‘বলছি কি, এ রকম তদন্ত করার অধিকার তা আপনার অবশ্যই আছে মঁসিয়ে জি’।
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।
‘তাছাড়া প্যারিসের পুলিশ তো ইতিপূর্বে বহুবারই এ-কাজ করেছে বলে আমি জানি।
‘হ্যাঁ, তা অবশ্যই করেছে। আর এ যুক্তিতেই আমি পিছিয়ে যাইনি। আরও আছে, মন্ত্রী ডি-র আচরিত কয়েকটা অভ্যাস আমার বড় রকমের সুযোগ করে দিয়েছে।’
‘অভ্যাস? কী ধরনের অভ্যাস, জানতে পার কী?
‘অবশ্যই। যেমন ধরুন, প্রায়ই তিনি সারারাত বাড়ি থাকেন না, বাইরে কাটান। আর তার দাস-দাসীরাও সংখ্যায় বেশি নয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, মনিবের থাকার ঘর থেকে বেশ কিছুটা দূরে তাদের থাকার ব্যবস্থা। সেখানেই তারা দিনের বেশ কিছু সময়, বিশেষ করে রাত কাটায়। তা ছাড়া নেপসের লোকরা এমনিতেই নেশা ভাঙ একটু বেশিই করে। আর এও তো আপনার অজানা নয় যে, আমার পকেটে এমন চাবি আছে যা ব্যবহার করে প্যারিসের যে কোনো ঘর বা আলমারি অনায়াসেই খোলা সম্ভব।’
‘হ্যাঁ, তা জানি বটে।
‘তারপর শুনুন, গত তিনমাসে এমন রাতও বাদ যায়নি যে, আমি মন্ত্রী ডি. হোটেলের ঘরগুলো ঘাটাঘাটি করিনি। সত্যি কথা বলতে কি, এ ঘটনাটার সঙ্গে আমার সম্মান জড়িয়ে রয়েছে। মুহূর্তের জন্য নীরবে ভেবে তারপরই তিনি আবার মুখ খুললেন। আর একটা কথা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না, তবু বলছি–কাজটা হাসিল করতে পারলে পুরস্কারস্বরূপ যা পাওয়া যাবে, সে অঙ্কটাও কিন্তু বেশ বড়ই।’
‘তাই বুঝি?’ আমি মুচকি হেসে বলে উঠলাম।
‘হ্যাঁ, রীতিমত লোভনীয় পুরস্কার! তাই তো চিঠি-চোর আমার চেয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ধরে এ-সম্বন্ধে নিশ্চিত না হওয়া অবধি আমি তার হোটেলটা তল্লাসি চালাবার কাজ বন্ধ করিনি। আমার কিন্তু বিশ্বাস, হোটেলটার এমন কোনো কোণা ঘুপছি বাদ নেই, যেখানে আমি চিরুণি তল্লাসি চালাইনি।
‘আপনার সব কথা মেনে নিয়েই আমি বলছি, এমনটা হওয়াও তো অসম্ভব নয় যে, মন্ত্রী চিঠিটাকে নিজের বাড়িতে না রেখে অন্য কোনো গোপন স্থানে রেখে দিয়েছেন, একেবারেই অসম্ভব কী? আমি বেশ জোর দিয়েই কথাটা বললাম।
দুঁপে আমার বক্তব্যটাকে সমর্থন করতে গিয়ে বলল–এমনটা হওয়া একেবারে যে অসম্ভব। এমন কথা বলা হয়তো ঠিক হবে না। তবে ব্যাপারটা বিচারালয়ে যা দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে মন্ত্রী ডি যেসব ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছেন বলে শুনেছি, তাতে করে এ-মুহূর্তে দলিলটা বাগিয়ে নেওয়া–এক মিনিটের নোটিশে সেটাকে তল্লাসি চালিয়ে বের করে দেওয়া দলিলটাকে নিজের জিম্মায় রাখার মতোই সমান জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘আপনি, বের করে দেওয়া বলতে কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?’ আমি আগ্রহান্বিত হয়ে বলে উঠলাম।
দুঁপে কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ এঁকে বলল–‘আপনি কী বলতে চাইছেন, চিঠিটা নষ্ট করে দেওয়ার সন্দেহ রয়েছে!
আমি মুহূর্তের জন্য ভেবে নিয়ে বললাম-–ঠিক কথা, চিঠিটা তবে ওই বাড়িতেই রয়ে গেছে। তা যদি হয় তবে সেটা মন্ত্রীর দখলে আছে, এরকম ভাবাটা তো নিতান্তই অযৌক্তিক।
‘হ্যাঁ, সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। পুলিশের বড় অফিসার বললেন–একবার নয়, দু দুবারই তাকে পথের মাঝে ধরে আমারই সামনে তার সর্বাঙ্গ তল্লাসি চালানো হয়।
‘আপনি নিজে কিন্তু এতখানি কষ্ট না করলেই পারতেন বলে আমি মনে করি। আমার ধারণা, ডি অবশ্যই বোকা হাঁদা নন, আমার বন্ধুবর দুঁপে বলল–‘অতএব তাকে যে, যে কোনো মুহূর্তে, এমনকি পথের মাঝখানে আটকে তল্লাসি চালানো হতে পাওে, তা তিনি ভালোই জানতেন, ঠিক কিনা?
‘না তিনি যে বোকা নন, এ ব্যাপারে তিলমাত্র সন্দেহও নেই। তবে—
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আমি বলে উঠলাম–‘তবে? তবে কি?
তবে তিনি একজন কবিও বটে। তাই যেহেতু কবিতার পোঁকা তার মাথায় বাসা বেঁধেছে, তখন তিনি যে একজন নিরেট বোকা, বোকার চেয়ে এক ডিগ্রিও পরে এও মিথ্যে নয়।’
‘আরে গুটি কয়েক কবিতা মানে ফালতু কবিতা তো আমার কলম দিয়েও বেরিয়েছে।
আমি এবার বললাম–‘যাক গে, এবার আসল কথা, মানে তল্লাসির ফলাফলের কথা কিছু অনুগ্রহ করে বলবেন কী?
ফলাফল? আরে মি., তল্লাসি বলতে, আমরা প্রচুর সময় ব্যয় করে সব জায়গায় চিরুনি তল্লাসি চালিয়েছি। এসব কাজে আমার অভিজ্ঞতা খুবই, মানে দিনের পরনি এ ধরনের কাজে লেগে থেকে চুল পাকিয়ে ফেলেছি। যাকগে, যে কথা বলতে চাইছি, বাড়িটার এক-একটা ঘর এক একদিন, সারাটা রাত ধরে একেকটা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। এভাবে সারাটা সপ্তাহ কেটেছে।
‘হ্যাঁ, তা-তো হবেই। আর বাড়িটাও তো কম বড় নয়। বাড়ি মানে, প্রাসাদ বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। যাক গে, আসল কথায় আসা যাক, সারারাত ধরে ঘরের আসবাবপত্র তল্লাসি করেছি। প্রতিটা ড্রয়ার খুলে সাধ্যমত ঘাটাঘাটি করেছি।’
‘হ্যাঁ, এসব তো সবার আগেই করা চাই।
‘অবশ্যই। আপনার তো আর অজানা নয় যে, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশের কাছে গোপন ড্রয়ার বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়। এ রকম একটা তল্লাসি চালাতে গিয়ে গোপন কোনো ড্রয়ার যদি কারো নজর এড়িয়ে যায়, তবে আমি বলব সে একটা আস্ত গাধা।
তারপরের কাজের কথা আশা করি আর বলার দরকার নেই। আলমারির কাজ মিটিয়ে আমরা চেয়ারগুলোকে নিয়ে মেতে যাই, খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
