‘একা?’ একদম একাই ছিলেন?’ আমি তার কথার মাঝখানে বলে উঠলাম।
‘হ্যাঁ, একদমই একা ছিলেন। তারপর কি হলো শুনুন–মহিলাটি যখন সে চিঠিটার ওপর অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে চোখ বুলাচ্ছিলেন ঠিক সে মুহূর্তেই অন্য সম্মানীয় ব্যক্তিটি ব্যস্ত পায়ে সে ঘরে ঢুকলেন। তবে তার কাছে চিঠিটা গোপন রাখাই মহিলাটির একান্ত ইচ্ছা ছিল।’
‘কিন্তু সে সুযোগ তিনি আর পেলেন না, এই তো?’ আমি আবার তার কথার মাঝখানে বলে উঠলাম।
‘চেষ্টার ত্রুটি তিনি করেননি। কিন্তু তার চেষ্টানিস্ফেল হয়েছিল।
যেমন?
‘মহিলাটি যন্ত্রচালিতের মতো ব্যস্ততার সঙ্গে হাতের চিঠিটাকে একটা ওয়ারের মধ্যে চালান দিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন। ব্যর্থ হলেন। ফলে উপায়ান্তর না দেখে তিনি হাতের চিঠিটাকে টেবিলের ওপর ফেলতে বাধ্য হলেন।
‘হ্যাঁ, পরিস্থিতি এমন হলে তার পক্ষে এ ছাড়া তো করারও কিছু ছিল না।’
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। তবে চিঠির গায়ে লেখা ঠিকানাটা ও পরের দিকে থাকার ফলে চিঠিটার বক্তব্য গোপনই রয়ে গেল। আর ঠিক তখনই চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে এলে মন্ত্রী ডি।
তাকে দেখেই মহিলাটি থতমত খেয়ে গেলেন। আর এদিকে ঘরে পা দেওয়ামাত্র মন্ত্রী ডি-র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পড়ল টেবিলের ওপরে রক্ষিত চিঠিটার ওপর।
ব্যস, মুহূর্তে তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। কারণ, চিঠির গায়ে লেখা ঠিকানার হস্তাক্ষরটা চিনতে তিলমাত্রও ভুল হলো না।’
‘তারপর? তারপর কী হল?
‘সে মুহূর্তেই মহিলাটির ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠা আর চোখ মুখের ভাব দেখেই তিনি চিঠিটার গুরুত্ব অর্থাৎ গোপনীয়তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন।
‘এবার ব্যস্ততার সঙ্গে স্বভাবসুলভ মামুলি দু-চারটি কথা সারতে সারতে টেবিলে রক্ষিত চিঠিটার মতোই অন্য আর একটা চিঠি কোটের পকেট থেকে বার করে গভীর মনোযোগের ভান করে পড়তে লাগলেন। পর মুহূর্তেই হাতের চিঠিটাকে ঝটপট ভাঁজ করে টেবিলে রেখে টেবিলের চিঠিটাকে কোটের পকেটে চালান করে দিলেন।
এবার মুখের ভাবভঙ্গি আমূল পরিবর্তন এনে আর প্রায় মিনিট পনের ধরে সরকারি কাজকর্মের আলোচনা করলেন।
এখানে বলে রাখা দরকার মন্ত্রী ডি–চিঠিটা বদলে নেবার সময় চিঠির মালিক আঁড়চোখে ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন। কিন্তু ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিতির জন্য সবকিছু দেখেও মুখ খুললেন না। আসলে তার সাহসে কুলায়নি।
কোনোরকম প্রতিবাদের মুখোমুখি না হয়েই মন্ত্রী ডি-বাজে চিঠিটা রেখে টেবিল থেকে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটা বাগিয়ে নিয়ে ব্যস্ত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন।
দুঁপে এবার ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল–‘কি হে, তোমার যা-কিছু জানার আগ্রহ ছিল সবই তো বলা হল। এবার নিশ্চয় ব্যাপারটা বুঝতে পারলে, যার চিঠি বেহাত হয়েছে, তিনি যে চোরকে চিনতে পেরেছেন, সেটা চোর তো জানতেই পারলেন। তাই খেলাটা যে এবার পুরোপুরি চোরের কজায় চলে গেছে, এতে আর কোনো সন্দেহই নেই।
পুলিশের বড় অফিসার মি. ডি বললেন–‘অবশ্যই, আর এ-কাজের মাধ্যমে যে অসীম ক্ষমতা ও সুযোগ তার হাতে এলো তারই ফলে কয়েক মাস ধরে তিনি জব্বর জব্বর রাজনৈতিক মুনাফা বল্গাহীনভাবে লুটে চলেছেন।
আরও আছে। যার চিঠিটা বেহাত হয়ে গেছে তিনি প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তেই সে চিঠিটা ফিরে পাবার গুরুত্ব সম্পর্কে যারপরনাই সচেতন হয়ে চলেছেন। কিন্তু কিভাবে তার উদ্দেশ্যটাকে বাস্তবায়িত করা যাবে? প্রকাশ্যে তো অবশ্যই করা সম্ভব নয়।’
আমি বললাম–‘কিন্তু এতে আপনার ভূমিকা–
‘আরে,নিজে কিছুতেই কার্যোদ্ধার করতে পারবেন না এ-ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েই তিনি আমার ওপর চিঠিটা উদ্ধার করার দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে রয়েছেন।
চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে দুঁপে এবার বলল–‘এর কারণও আছে যথেষ্টই।’.
পুলিশের বড় অফিসার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—’কারণ?’
কারণ বলতে আপনি কীসের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন, বলবেন কি?
‘মি. ডি, আপনার চেয়ে যোগ্যতর, মানে এমন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোক আর কে-ই বা আছে যার ওপর এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন?
‘মি. দুঁপে, আপনি যে আমাকে ‘গ্যাস দিচ্ছেন অন্তত এটা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার অবশ্যই আছে। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তিনি বললেন– কিন্তু এমনও তো হতে পারে, অনেকের কাছে আমার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার মূল্য আছে।’
আমি মি. জি-র দৃষ্টি আমার দিকে ফিরিয়ে এনে বললাম–তবে আপনার কথা থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে–’
‘কোন ব্যাপারটার কথা বলছেন, বলুন তো।
‘বলতে চাইছি, নিসন্দেহ হওয়া যাচ্ছে যে, চিঠিটা মন্ত্রী ডি’র জিম্মাতেই এখনও রয়েছে, ঠিক কিনা?
‘হ্যাঁ, আর আমি এ-ব্যাপারে শতকরা একশো ভাগই নিসন্দেহ। আর এ-চিঠিটা দখলই যখন তার ক্ষমতার একমাত্র উৎস, তখন চিঠিটা উপযুক্ত কাজে ব্যবহার করামাত্রই ক্ষমতাও নিশেষ হয়ে যাবে।’
আমার কথাটা সমর্থন করতে গিয়ে মি. জি বললেন–‘সম্পূর্ণ সত্য কথা। এরকম বিশ্বাস নিয়েই আমিও কাজ করে চলেছি। কাজে নামার পর আমার প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল, মন্ত্রী মহোদয়ের হোটেলটাকে চিরুণি তল্লাসি চালানো। কিন্তু কাজে নেমে দেখলাম, তারই অজান্তে কাজটা করাই মহাসমস্যা হয়ে দাঁড়াল। আরও অসুবিধার ব্যাপার হচ্ছে, এ ব্যাপারে আমি যদি কোনোক্রমে তার সন্দেহভাজন হয়ে পড়ি তবে। আমাকে চরম বিপদের মুখোমুখি যে হতে হবে, কোনোই দ্বিমত নেই। আর এ-সম্বন্ধে : আমাকে হিতাকাঙ্খীদের অনেকেই সতর্ক করেও দিয়েছেন।’
