পাইপে একটা লম্বা টান দিয়ে ঘরময় ধোঁয়া ছড়িয়ে দিয়ে বললাম–‘মি. জি, আবার এমনকি সমস্যা দেখা দিল যে, ভর সন্ধ্যেবেলায় আপনাকে ছুটে আসতেই হল? আশা করি নতুন কোনো খুনের ব্যাপারে
আমাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে পুলিশের বড় অফিসার বন্ধু জি বলে উঠল ‘আরে, না। খুবই সহজ-সরল একটা ঘটনা।
‘সহজ-সরল ঘটনা?
‘অবশ্যই। আর তার মীমাংসা আমরা বেশ ভালোভাবেই করে ফেলতে পারব বলেই আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ, তা সত্ত্বেও মনে হলো মি. দুঁপে হয়তো পুরো ব্যাপারটা শুনলে খুবই খুশি হবেন।’
‘মি. দুঁপে খুশি হবেন?
‘মনে তো হচ্ছে। কারণ, সম্পূর্ণ ঘটনাটা যারপরনাই বিচিত্র প্রকৃতির।
‘সহজ-সরল আর বিচিত্র প্রকৃতির?
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। আবার ও দুটোর একটাও যথাযথ নয়। সত্যি কথাটা কি, জানেন? ঘটনাটা এত সহজ-সরল হওয়াতেও আমরা কেউ-ই অনুধাবন করতে না। পারার জন্যই কেমন যেন জটিলতর হয়ে পড়েছে, ধন্ধে পড়ে গেছি। এমন সহজ একটা ব্যাপার–’
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে স্টুপে বলে উঠল–এমনও হতে পারে যে, ঘটনাটা খুবই বেশি রকম সহজ-সরল বলেই আপনারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, আমার অন্তত এটাই বিশ্বাস।
পুলিশের বড় অফিসারটি সরবে হাসতে হাসতে বললেন–আপনি যে কী অবান্তর কথা বলেন!
দুঁপে এবার বলল–‘রহস্যময় ঘটনাটা হয়তো খুব বেশি সহজ-সরল! ‘হায় ঈশ্বর! এ আবার কি ধরনের কথা মি.?
‘একটু বেশি রকম স্পষ্ট, এ ছাড়া আর কিছু নয়।’
আগম্ভক পুলিশের বড় অফিসার গলা ছেড়ে হাসতে আরম্ভ করলেন। এক সময় হাসি থামিয়ে বললেন আপনার কথা শুনে হাসতে হাসতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসার যোগাড় হয়েছে মি. দুঁপে!
আমি পুলিশের বড় অফিসার মি. জি-র দিকে সামান্য ঝুঁকে আগ্রহ প্রকাশ করে বললাম–তবে আসল ব্যাপারটি কী, বলুন তো মি. জি?
পুলিশের বড় অফিসার চুরুটে একটা লম্বা টান দিয়ে এক গাল ধোয়া ছেড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসতে বসতে বললেন–সবই বলব, কিছুই বাদ দেব না। কিন্তু বিস্তারিত বিবরণ নয়, অল্প কথায় বলব। তবে বলার আগে আপনাদের সতর্ক করে দিতে চাচ্ছি যে–‘
তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আমি বলে উঠলাম–‘সতর্ক? কেন সতর্ক কেন?
‘সতর্ক করে দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই, ব্যাপারটা কিন্তু খুবই গোপনীয়।
‘তাই বলুন।
‘হ্যাঁ, ঘটনাটা আমি কারো কাছে ফাস করেছি এ-কথা ওপরওয়ালা জানতে পারলে আমাকে যে কেবল জবাবদিহিই করতে হবে তাই নয়, চাকরিটাও খোয়াতে হবে।
‘ঠিক আছে, কথা দিলাম, এ-ব্যাপারে কারো কাছেই মুখ খুলব না।’
দুঁপে বলল–‘যদি আপত্তি থাকে তবে না-ও বলতে পারেন। আমি অন্তত পীড়াপীড়ি করব না।’
পুলিশ অফিসার মঁসিয়ে মুচকি হেসে বললেন–‘আপত্তি থাকলে আর এখানে ছুটে আসব কেন মি. দুঁপে। যাক, শুনুন তবে বলছি–‘খুবই ওপরমহল থেকে আমি জানতে পেরেছি, রাজপ্রাসাদ থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল খোয়া গেছে।
‘রাজপ্রাসাদ থেকে দলিল–গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল চুরি গেছে?
‘হ্যাঁ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ দলিল সেটা। আর সেটা কে গায়েব করেছে তা-ও জানা গেছে। আর তা নিয়ে এতটুকুও. সন্দেহের অবকাশ নেই।
‘আশ্চর্য ব্যাপার তো!’
আমি কপালের চামড়ার ভাজ এঁকে বললাম–‘
‘কিন্তু এমন নিঃসন্দেহ কিভাবে—’
‘আরে মি., তাকে যে চুরি করতে দেখা গেছে।‘
‘বেশ, তারপর?’
‘চোরাই করা দলিলটা যে চুরি করেছে এখন তার কাছেই আছে।’
দুঁপে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করল–‘তা কী করে জানা সম্ভব হয়েছে?
‘ব্যাপারটা হচ্ছে কি মি. দুঁপে–‘দলিলটার গুরুত্ব ও প্রকৃতি এবং সেটা চোরের হাতের বাইরে চলে গেলে যা-কিছু ঘটা স্বাভাবিক ছিল, অর্থাৎ ঘটা সম্ভব ছিল তা থেকেই নিশ্চিত ভাবেই এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
আমি তার দিকে সামান্য ঝুঁকে আগের চেয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে বললাম–মি. জি, আরও একটু খোলসা করে বলে আমার উকণ্ঠা দূর করুন।
দুঠোঁটের ফাঁক থেকে চুরুটটা নামিয়ে এনে পুলিশের বড় অফিসার মি. জি বললেন–মি., একটা কথা আমি রীতিমত জোর দিয়েই বলতে পারি যে, উপরোক্ত দলিলটা যার অধিকারে থাকবে সে এক বিশেষ ক্ষমতা বলে বলিয়ান হবে এমন এক বিশেষ মহলে যেখানে ওই ক্ষমতাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।’ পুলিশের এ বড় অফিসার
দ্রলোকের কুটনীতির চাল দেওয়ার ব্যাপারটার প্রতি খুব বেশি প্রবণতা।
বন্ধুবর দুঁপে যুগল কুঁচকে বলল–‘আমার মাথায় কিন্তু এখনও মাথামুণ্ডু কিছুই ঢুকল না।
‘কিছুই না?’
‘কিছু না।
‘শুনুন তবে বলছি, দলিলটা যদি কোনো অজানা তৃতীয় ব্যক্তির হাতে চলে যায় তবে এক সম্মানীয় ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটবে। অতএব যে সম্মানীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তির যশখ্যাতি মনোবল প্রভাবে নষ্ট হতে চলেছে তিনি সে তৃতীয় ব্যক্তিটার একেবারে কজায় চলে গেছেন, ব্যাপারটা এবার কিছুটা অন্তত খোলসা হয়েছে আশা করি।
‘কিন্তু দলিলের মালিক, অর্থাৎ যার দলিল খোয়া গেছে তিনি যে চোরকে চিনতে পেরে গেছেন এ-কথা চোরটা যদি জেনে যায়, তবেই তো তার পক্ষে সুযোগটা নেয়া সম্ভব হবে। এখন কথা হচ্ছে, কোন চোরের বুকের পাটা এমন নয় যে ব্যাপারটাকে–‘
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি., জি বলে উঠলেন–‘চোর, মানে। গুরুত্বপূর্ণ দলিলটা চুরি করেছেন মন্ত্রী ডি.আরে ভাই তিনি এমন একজন জাহাবাজ লোক যে, তার অভিধানে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই অর্থাৎ তিনি পাওে না এমন কোনো কাজই নেই তার চুরির কৌশলটা রীতিমত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। যে দলিলটার কথা বলছি–খোলসা করে বলাই দরকার যে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি। সেটা যার কাছ থেকে যখন গায়েব করা হয়েছে তখন তিনি শোবার ঘরে একাই ছিলেন।
