হুম্। ওইনোস প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করল।
আগাথস বলে চলল– হ্যাঁ, যা বলছিলাম, অন্তহীন জ্ঞানের অধিকারী সে তাড়নাকে পিছন দিকে চলে গেলে মূলে অর্থাৎ ঈশ্বরে অবশ্যই পৌঁছে যাওয়া যাবে। এরকমভাবে পিছনে চলে যাওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করে পিছনে চলে গেলে ধূমকেতু উত্সকেও জানা সম্ভব হবে। ধী-শক্তিতেই এ-সমতা বর্তমান থাকে। মোদ্দা কথা, যেখানে আরম্ভ সেখানে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। তাই বলছি কি–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ওইনোস বলে উঠল–কিন্তু তুমি তো কেবলমাত্র বাতাসের তাড়না সৃষ্টির কথাই বলছিলে, তাই না?
হ্যাঁ, তা বলেছিলাম বটে। তবে পৃথিবীর সম্পর্কেই এ-কথা বলে ছিলাম। এ তাড়না সাধারণত ইথারের মাধ্যমে ছুটে চলে। আরে ইথারেই তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তলিয়ে রয়েছে। যত কিছু সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি।
ওইনোস এবার বলল–তবে তুমি বলতে চাইছ, সব গতিই সৃষ্টিকার্য সম্পাদন করছে, তাই কী?
অবশ্যই। যথার্থ জ্ঞান কিন্তু আমাদের এ-শিক্ষাই দিচ্ছে, চিন্তাই হচ্ছে যাবতীয় গতির উৎস। আর যাবতীয় চিন্তার উৎস–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ওইনোস বলে উঠল–ঈশ্বর, তাই তো?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। সে বিশ্ব সম্প্রতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেল তার আবহমণ্ডল তাড়নার কথা তো তোমার কাছে সবেমাত্রই ব্যক্ত করলাম। তুমি রূপসি এ বিশ্বের সন্তান ছিলে। তুমি কি তখন কিছুই বুঝতে পারনি, বাহ্যিক ক্ষমতার অস্তিত্ব আছেই আছে? আমাদের প্রতিটা কথাই কি বায়ুমণ্ডলে তাড়না সৃষ্টি করছে না, বল তো?
ওইনোস বলল–তাই যদি হয় তবে কেঁদে আকুল হচ্ছ না কেন? দৃষ্টিনন্দন এ নক্ষত্ররাজ্যের ওপর দিয়ে ডানা মেলে উড়তে উড়তে তোমার পাখা দুটো কেন এমন করে ঝুলে পড়ছে? আর এমন ঘন সবুজ অথচ এমন ভয়ঙ্কর পৃথিবীকে তো আমার নজরে পড়েনি। এর আগ্নেয়গিরিগুলোর রক্তচক্ষু আরও উত্তাল হৃদয়ের ক্ষোভ ছাড়া কিছু নয়।
আগাথস সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–ঠিক, একেবারে পুরোপুরি ঠিক কথাই বলেছ। তিন শতক আগে করজোড়ে চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে কয়েকটা উচ্চারণের মাধ্যমে এর জন্মদান করেছি। চকচকে ঝকঝকে পাপড়িগুলো অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব স্বপ্ন, আর বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের স্বপ্ন জ্বলন্ত ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরিগুলো, বুঝলে?
দ্য পারলয়েন্ড লেটার
প্যারিস! প্যারিস শহর!
আঠারো সাল। সে বছর শরতের একটা ঝড়ো সন্ধ্যা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ সে সন্ধ্যায় আমরা দুই বন্ধু তেত্রিশ নম্বর রুদুনো ফবুর্গ স্যাঁৎ জারমেন ঠিকানার ছোট গ্রন্থাগারটায় মুখোমুখি বসে আরামে পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গভীর চিন্তায় আত্মমগ্ন রয়েছি। বাড়ি আর গ্রন্থাগার উভয়েরই মালিক আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু মি. অগস্ত পুঁপে। আর সে-ই আমার মুখোমুখি চেয়ারটায় বসে। গভীর চিন্তা আমাদের মাথায় থাকলেও চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে চুরুটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে রীতিমত আরামের মধ্যেই আমরা যে ডুবে গিয়েছি, অস্বীকার করতে পারব না।
তবে অবশ্য আমার নিজের সম্বন্ধে আমি এটুকু অন্তত বলতে পারি যে, সে সন্ধ্যায় প্রথম প্রথম বন্ধু মি. অগস্ত দুঁপের সঙ্গে যে সব প্রসঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল, আমি চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে পাইপ থেকে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে মনে মনে সে সব কথাই আওড়ে চলেছি। আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমার চিন্তার বিষয় হচ্ছে মার্গের ঘটনা। আর মারি বোগেতের খুনের রহস্য।
আমরা যখন নিবিষ্ট মনে চিন্তার জট ছাড়াতে ব্যস্ত ঠিক তখনই আমাদের বহুদিনের বন্ধু ও পুলিশের বড় অফিসার মি. জি. হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে এলেন।
দরজার পাল্লার মৃদু অথচ কাঁচ কাঁচ আওয়াজ কানে যেতেই আমাদের উভয়েরই চিন্তায় ছেদ পড়ল। আচমকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁকে দরজায় দেখে সাধ্যমত দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে তাকে অভ্যর্থনা করে ঘরে নিয়ে এলাম। চেয়ার এগিয়ে বসতে দিলাম।
বহুদিন বাদে বন্ধুবর মি. জি-এর সঙ্গে দেখা হল।
আমরা দুই বন্ধু এতক্ষণ সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারেই বসে চুরুট টানছিলাম। মি. জি. আসাতে বন্ধু এঁপে মোমবাতিটা জ্বালাবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েই আবার দুম্ করে বসে পড়ল।
তার আবার বসে পড়ার কারণ, পুলিশ অফিসার বন্ধু জি, জানালেন, একটা জটিল সরকারি ব্যাপার সম্বন্ধে জরুরি পরামর্শ করার জন্যই তার এ-আকস্মিক আগমন। তার কথার ইঙ্গিতে বুঝতে পারলাম, বিশেষ করে বন্ধুবর দুঁপে-র মতামত জানার আগ্রহই তিনি এখানে আরও বেশি আগ্রহান্বিত হয়ে ছুটে এসেছেন।
বন্ধুবর দুঁপে বলল–‘ব্যাপারটা যদি এমন জরুরিই হয়ে থাকে তবে কথাবার্তা বরং অন্ধকারেই হলে গভীরভাবে মনোসংযোগ করা সম্ভব হবে, কী বলেন মি. জি?
মি. জি স্লান হেসে বললেন–এটা তোমার কিন্তু আর একটা বিচিত্র খেয়াল ছাড়া কিছু নয়।’ তিনি ‘বিচিত্র’ শব্দটা কেন ব্যবহার করলেন? আসলে নিজের বুদ্ধি দিয়ে যার বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারেন না তা-ই তার কাছে বিচিত্র এবং বিচিত্র’ শব্দটা ব্যবহার করাটাও তার একটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে তাকে এমন হাজারো ‘বিচিত্র কাণ্ডকারখানার মধ্যেই প্রতিটা দিন–প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে হয়।
পুলিশের বড় অফিসার বন্ধুবর জি-র হাতে একটা পাইপ ধরিয়ে দিতে দিতে দুঁপে বলল, সত্যি খুবই সত্যি কথা বলছেন।
