হাতির দাঁতের নৌকাটার পলকে মোড়া মেঝের একধারে একটামাত্র হালকা দাঁড় আলতোভাবে পড়ে রয়েছে। সেটার ওপরে কোনো মাঝি বা অনুচরকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। অতিথিকে আনন্দ ফুর্তিতে থাকতে বলে দেওয়া হয়েছে। নিয়তিই তার দেখভাল করবে।
বড় জাহাজটা ক্রমে দূরে সরে যেতে যেতে কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের আড়ালে। চলে গেল।
পাহাড়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে নতুন একটা নদী এগিয়ে গেছে। সেটা উপসাগরের বাঁ দিক থেকে বেরিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এভাবে একই ভাবে, একই দিকে অনবরত অগ্রসর হতে হতে বহু ছোট ছোট বাঁক, অতিক্রম করে হঠাৎ নৌকারোহীর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা ফটক, সুবিশাল একটা ফটক। সেটা যেন তার পথ আগলে অবস্থান করছে।
সেটাকে ফটক না বলে বার্নিশ করা একটা দরজাও বলা যেতে পারে। তবে সাধারণ দরজা অবশ্যই নয়, তার গায়ের অদ্ভুত সব নক্সার ওপর বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভা প্রতিফলিত হচ্ছে। আর তাতে করে মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ বনভূমিটাই বুঝি আগুনের শিখায় অনবরত জ্বলছে তো জ্বলছেই।
আর তার চোখের সামনে যে দরজাটা অবস্থান করছে সেটা একটা উঁচু দেওয়ালের গায়ে বসানো।
উঁচু দেওয়ালটার গায়ে দরজাটাকে এমন অত্যাশ্চর্য কায়দায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হঠাৎ করে দেখলে বলতেই হয়, দরজাটাকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যেন সেটা নদীটাকে বুঝি সমকোণে সমদ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে।
তবে অবশ্য হাতির দাঁতের ছোট্ট নৌকাটা তরতর করে আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই আরোহীর মনে হলো দেওয়ালটার বুঝি শেষ নেই–সীমাহীন। সেটা যেন আগের মতোই তার সঙ্গে সঙ্গে চলেছে।
আর ঠিক আগের মতোই মূল জলধারাটা নদী থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
সামান্য এগিয়েই খুব প্রশস্ত একটা জলধারা আসল নদীটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ সৃষ্টি করে দরজাটার তলা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
হাতির দাঁতের ছোট্ট নৌকাটা এবার নদী থেকে পড়ল, তারপর খাল-বেয়ে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ সৃষ্টি করে দরজাটার তলা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নৌকাটা এগিয়ে দরজার কাছে গেলে দরজার ভারী পাল্লা দুটো আস্তে আস্তে সরে গিয়ে নৌকাটার যাবার মতো রাস্তা তৈরি করে দিল।
খোলা-দরজাটা দিয়ে এগিয়ে সবেগে দরজাটা দিয়ে গলে গেল। তারপর তীরবেগে এগিয়ে যেতে যেতে সেটা সুবিশাল একটা খোলা রঙ্গমঞ্চের ভেতরে হাজির হল।
রঙ্গমঞ্চটার চারদিক টকটকে লাল পাহাড় বেষ্টন করে রেখেছে। শুধু কি এই? পাহাড় আর লালপাহাড়ের চারদিক ঘিরে রয়েছে একটা নদী। তার জলরাশি ঝকঝক করছে। ছোট্ট নৌকাটা নদীতে পড়তে না পড়তেই আৰ্ণহিসের স্বর্গরাজ্য নৌকারোহীর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
কোথা থেকে শ্রুতিমধুর সংগীতলহরীর তাল ভেসে আসতে লাগল, নৌকারোহী তা উকর্ণ হয়ে শুনেও তার উৎস সম্বন্ধে তিলমাত্র ধারণাও করতে পারল না। এবার অবর্ণনীয় মিষ্টি-মধুর সুগন্ধ বাতাস প্রবাহিত তার নাকে আসতে লাগল।
আর? আর প্রাচ্যদেশীয় বনাঞ্চলের এমন এক অদ্ভুত এক সমাবেশ নৌকারোহীর চোখের সামনে ফুটে উঠল যার সৌন্দর্যের বর্ণনা ভাষার মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়। আর তার মাথার ওপর দিয়ে রক্তবর্ণ আর সোনালি পাখির দল পাখা মেলে উড়ে বেড়াতে যাব, যার শোভা তার চোখ-মনকে তৃপ্ত করল। আর পদ্ম-ছাওয়া বিচিত্র হ্রদের শোভা তো আছেই।
নদী আর পাহাড়ের ধারে রয়েছে বিস্তীর্ণ এক প্রান্তর যা টিউলিপ, হায়াসিন্থ, ভায়োলেট, টিউবরোজ আর আফিমফুলে ছাওয়া। তারই ফাঁক দিয়ে এঁকে বেঁকে হেলে দুলে বয়ে চলেছে বেশ কয়েকটা রূপালি নদীর জলধারা। সবকিছুর মাঝখানে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে অবস্থান করছে আধাগনিক আর আধা সারাসেনীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশৈলীর মনোলোভানিদর্শন। শত শত কারুকার্যমণ্ডিত বাতায়ান, সুউচ্চ গম্বুজ
আর আকাশচুম্বী মিনার সূর্যের রক্তিম আভায় ঝকমক করছে।
নৌকারোহী কৌতূহল-মিশ্রিত বিস্ময়ের ছাপ চোখে এঁকে সবকিছু দেখে ভাবতে লাগল, এ সবকিছুই রূপসি তম্বী নারী, স্বর্গের অপ্সরা, পরী, জিন আর পাতালে বসবাসকারী ভূত-প্রেতদের মিলিত প্রচেষ্টায় সৃষ্ট এক অলৌকিক কাণ্ড!
দ্য পাওয়ার অব ওয়ার্ডস
ওইনোস বলল–আগাথস, অমৃতময় জীবনের সর্বশক্তিতে শক্তিমান এ আত্মার দুর্বলতাকে মার্জনা করার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা করছি।
আগাথস বলল–আরে ওইনোস, তুমি এমন করে ভেঙে পড়ছ কেন, বুঝছি না তো! তুমি তো এমন কোনো অসঙ্গত কথাই বলনি, যার জন্য তোমাকে এমন করে মার্জনা ভিক্ষা করতে হবে।
আগাথস অস্তিত্বের এ অবস্থায় আমি কিন্তু স্বপ্ন দেখেছিলাম। ওইনোস বলল– আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, সব ব্যাপারই জানব এবং সচেতন থাকব। আর সর্বজ্ঞ। হওয়ায় আমি হঠাৎই সুখি হব।
আগাথস বলল–জ্ঞান আর সুখ এক নয়। জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে সুখ আসে। জ্ঞান আহরণের মধ্য দিয়ে চিরটাকাল কাটাতে পারছি বলেই তো সুখভোগ করা সম্ভব হচ্ছে, তাই না? সবকিছু জেনে বুঝে ফেলা তো শয়তানের অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়।
একটা কথা, ঈশ্বর কি তবে সর্বজ্ঞ নন? সবকিছু কি তার নখদর্পণে নয়?
তার কাছে সেটা আজ অবধি অজানা রয়ে গেছে। কারণ কি? আরে তিনি যে চিরসুখি।
একটা কথা–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আগাথস বলে উঠল–কী কী বলতে চাইছ?
