জলপথ ধরে সে ধীর-মন্থর গতিতে এগোতে লাগলাম। নদী ও নদীর দুপাড়ের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে দুপুর পর্যন্ত পথ পাড়ি দিল।
নদীর পাড়ের তৃণক্ষেত্রে অগণিত ভেড়ার পালকে চড়ে বেড়াতে দেখতে পেলাম যাকে ভেড়ার মেলা আখ্যা দিলেই হয়তো সঠিক বর্ণনা দেওয়া হবে। সেখানে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবিকই অকল্পনীয়। সাদা লোমযুক্ত ভেড়াগুলো এমন দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে হঠাৎ করে দেখলে যাদের সবুজ ঘাসের প্রান্তরের গায়ে অগণিত সাদা বিন্দু বলে মনে হতে লাগল।
গোড়ার দিকে তার মাথায় ছিল চাষ আবাদ করা। কিন্তু সবুজ প্রান্তরের বুকে এমন মনোরম দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পর তার মন থেকে সে বাসনা মুছে গিয়ে পশুপালনের বাসনা তার মনে চেপে বসল।
তার গতি অব্যাহতই রইল। ধীরগতিতে ক্রমেই সামনের দিকে এগিয়ে চলল। এবার তার মন থেকে পশুপালনের বাসনা একটু একটু করে মুছে যেতে লাগল। ক্রমেই নির্জনতার চেতনা তার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে লাগল, আর তা অচিরেই তা তার মনকে ছেয়ে ফেলল।
ক্রমে প্রকৃতির বুকে শুরু হয়ে গেল আলো-আঁধারীর খেলা। তারপরই একটু একটু করে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। অন্ধকার যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল নদীটাও যেন অন্ধকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়তে আরম্ভ করল। তার উভয় তীরই খাড়া হতে লাগল।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে নদীর তীরবর্তী মাঠ-প্রান্তর যেন ক্রমেই ঘন সবুজ আর লতাপাতায় বেশি করে ঢাকা পড়তে পড়তে মিলিয়ে যেতে আরম্ভ করল।
এদিকে নদীর পানি ক্রমেই স্বচ্ছ হতে লাগল। আর একের পর এক বাঁক ঘুরে নদী তার গতি, স্রোতধারাকে নজরে পড়ছে না, অর্থাৎ হাত কয়েক দূরে গিয়েই দৃষ্টি থমকে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
ছোট, এক চিলতে নদীটা ক্ৰমে এগোতে এগোতে এক সময় গিরি-নালার রূপনিল।
পাহাড়ের বুক চিড়ে নদীটা কুল কুল ধ্বনি ধ্বনিত করে এগিয়ে চললনিম্নভূমির উদ্দেশ্যে।
গিরি নালাটার দুপাশের পাথরের প্রাচীর খাড়াভাবে একশো থেকে দেড়শো ফুট ওপর পর্যন্ত উঠে গেছে। আর একটা ব্যাপার নজরে পড়ছে, প্রাচীর দুটো যতই ওপরে উঠছে ততই যেন একে অন্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর এ-ঝুঁকে পড়াটা ক্রমে এত বেশি হতে লাগল যে, দিনের আলো ঢোকা রাস্তাটাও যেন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
শুধু কি এ-ই? খাড়া পাথরের প্রাচীর দুটোর শীর্ষদেশ গায়ে গায়ে অবস্থান করার সঙ্গে গাছগাছালি আর লতাপাতার সমাবেশ ঘটেছে। আর শ্যাওলা আর পাহাড়ের ঝোঁপঝাড় লতাপাতা মিলে সম্পূর্ণ সুড়ঙ্গটাকেই যেন এক বিশেষ প্রকৃতির বিষণ্ণতায় ভার সে রেখেছে। সব মিলে যেন এক অত্যাশ্চর্য পরিবেশ সেখানে গড়ে উঠেছে।
গিরি-পালাটা এঁকে বেঁকে হেলে দুলে বার বার বাঁক ঘুরে রীতিমত এমন এক চক্করের সৃষ্টি করেছে, যাকে একমাত্র গোলকধাঁধার সঙ্গেই তুলনা করে চলতে পারে। এমন এক সঙ্কীর্ণ নালাপথে, গোলকধাঁধার কয়েক ঘণ্টা চক্কর খেয়ে হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত বাঁক ঘুরে এগোতেই আমাদের জাহাজটার সামনে যেন আকাশ থেকে। বড়সড় একটা বৃত্তাকার অববাহিকা সামনে পড়ল।
বৃত্তাকার অববাহিকাটার ব্যাস দুশ মিটারের কাছাকাছি। ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় একটিমাত্র বিন্দু ছাড়া আর অন্য সব দিকেই সুড়ঙ্গের মতো খাড়া পাহাড় সদম্ভে অবস্থান করছে।
পাহাড়টার দিকে চোখ ফেরাতেই চোখ দুটো যেন জুড়িয়ে যায়। সে মনোলোভা দৃশ্য নজরে পড়ে তা হচ্ছে, পাহাড়টার পাদদেশ থেকে শুরু করে চূড়া অবধি যেন অত্যুজ্জ্বল হরেক রং আর হরেক ঢঙের ফুল দিয়ে দৃষ্টিনন্দন অলঙ্কারের মতো সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শুধুই ফুল আর ফুল। মাঝে মধ্যে, একেবারেই হঠাৎই এক আধটা সবুজ পাতা চোখে পড়ে, কি পড়ে না।
ভালোভাবে লক্ষ্য করে বোঝা গেল, অববাহিকাটা খুবই গভীর। তবে গিরি নালাটার পানি এতই গভীর, এতই স্বচ্ছ যে, তার তলার সবকিছু পরিষ্কার, স্পষ্ট নজরে পড়ে।
আর তার পানির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আকাশটাকে দেখে মনে হয় বুঝি সেটাকে উলটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে আর ফুলে ফুলে সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া দ্বিতীয় একটা পর্বতমালা বুঝি তার গায়ে অবস্থান করছে।
আমাদের জাহাজটা গিরি-নালাটা ধরে অগ্রসর হতে হতে সুড়ঙ্গটার বিষণ্ণতা থেকে হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে এসে দিগন্তের গায়ে অস্তগামী সূর্যের পূর্ণ বৃত্তটাকে চোখের সামনে দেখে আমার পর্যটক বন্ধু মি. এলিসন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে যতখানি খুশিতে ডগমগ হলো তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি বিস্ময়াপন্ন হল।
তার অবাক হবার কারণও কম ছিল না। সে মোটামুটি নিঃসন্দেহই হয়ে পড়েছিল বিদায়ী সূর্য ইতিমধ্যে দিগন্তরেখা অতিক্রম করে নিচে নেমে গেছে। কিন্তু সেই সূর্যই এমন অন্তহীন দৃশ্যকে তার দুচোখের সামনে মেলে ধরেছে। এমন একটা অপ্রত্যাশিত দৃশ্য হঠাৎ চাক্ষুষ করলে বিস্মিত হবার মতো কথাই বটে।
আমার বন্ধুবর এখানে পৌঁছেই জাহাজ থেকে নেমে পড়ল। এবার জাহাজটা ছেড়ে সে ছোট্ট একটা নৌকায় উঠে পড়ল। সেটা হাতির দাঁতের তৈরি ধবধবে সাদা একটা নৌকা। আর তার সারা গায়ে দক্ষ শিল্পীর দ্বারা কারুকার্যমণ্ডিত।
বাস্তবিকই নৌকা ছোট হলেও সুদৃশ্য তার গঠনপ্রকৃতি। তার সামনের আর পিছনের গলুই দুটো পানি থেকে এতই ওপরে ওঠানো যে, সেটাকে হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় উপসাগরের বুকে বুঝি একটা সফেন দুধের মতো ধবধবে সাদা রাজহাঁস সগর্বে ভেসে বেড়াচ্ছে।
