আমি বন্ধুর এরকম সিদ্ধান্ত বাতিলের কারণ জিজ্ঞাসা করলে সে জবাব দিল ‘হ্যাঁ, কারণ তো অবশ্যই আছে।’
আমি আগ্রহান্বিত হয়ে বললাম–আরে বন্ধু, সে কারণটাই তো জানতে চাইছি। কেন হঠাৎ দক্ষিণ-সমুদ্রে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা বাতিল করলে, বল তো?’
‘যদি আমি একদল মানববিদ্বেষী হতাম তবে সে জায়গাটা আমার কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য হত সন্দেহ নেই।
‘হুম!’
‘সত্যি কথা বলতে কি, সে স্থানটার সম্পূর্ণ নির্জনতা বিচ্ছিন্নতা আর প্রবেশ ওনির্গমনের সমস্যাই আমার মনকে দারুণভাবে আকর্ষণ করত।
‘তাই বুঝি?
‘অবশ্যই। আরে ভায়া, আমি তো আর ‘টাইমন’ নই।’
‘তোমার কথার তাৎপর্য–’
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বন্ধু মি. এলিসন এবার বলল–‘আমি বলতে চাইছি, নির্জনতা আমার প্রিয়। কিন্তু আমি নির্জনতার শান্তির প্রত্যাশী, তার বিষণ্ণতাকে অবশ্যই চাই না। তাই তো আমাকে এমন একটা জায়গার খোঁজ করতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে যার অবস্থান জনাকীর্ণ শহর থেকে তেমন কিছু দূরে নয়। আমি নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী যেখানে কাজে আত্ম নিয়োগ করতে সক্ষম হব।’
ব্যস, যে কথা সেই কাজ। আমার বন্ধু এবার কয়েক বছর ধরে নিজের মনের মতো একটা উপযুক্ত জায়গার খোঁজে বহু জায়গায় ঘুরে বেড়ালো। আজ এখানে কাল সেখানে করে কত জায়গায়ই যে সে ঘুরে বেড়ালো তার ইয়ত্তা নেই।
জায়গা বাছাবাছির কাজে সে আমাকে সঙ্গেনিল। আমরা দুজন মিলে হাজার হাজার জায়গা দেখে বেড়াতে লাগলাম। আমি যতসব জায়গা দেখে মুগ্ধ হই, তার কাজে জায়গাটা সম্বন্ধে যতই আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি না কেন সে কিন্তু এক কথাতেই তা বাতিল করে দিল। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়াল যে, আমার রুচি-পছন্দ যেন মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আর বন্ধু মি. এলিসন নিজের কাজের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমার কাছে যেসব যুক্তির অবতারণা করত সেগুলোকে আমিও শেষ অবধি মেনে না নিয়ে পারতাম না। এ তো খুবই সত্য যে, কোনো কথা যদি যুক্তিসঙ্গত হয় তবে তাকে মেনে না নিয়ে। উপায়ও তো থাকে না।
একের পর এক জায়গায় ঘুরে আমরা শেষমেষ এমন একটা জায়গায় হাজির হলাম যেখানে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বিচারে আকর্ষণীয় নয়, আছে অবিশ্বাস্য রকমের উর্বর আর মনোরম এক উচ্চ মালভূমি। বিচার করতে বসলে বলতেই হয়, জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের পরিবেশ রূপসি এটনার পরিবেশ থেকে কোনো অংশে কম বলা যাবে না। বরং বন্ধুবর এলিসনের মতে, এমনকি আমার মতেও, সে জায়গায় দাঁড়িয়ে দৃষ্টিপাত করলে যে প্রাকৃতিক দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়া যায়, তা এটনার পর্বতের শীর্ষদেশ থেকে দেখা যায় এমন বহুজনের দ্বারা প্রশংসিত মনোলোভা দৃশ্যগুলোকেও ম্লান করে দেয়। তাই আমার পক্ষে বন্ধুর সঙ্গে সহমত ব্যক্ত না করে উপায়ই বা কি? যা প্রকৃত সৌন্দর্য্যের দাবিদার, যা বাস্তবিকই দেহ-মনকে এক অনাস্বাদিত পুলকে ভরপুর করে তোলে তাকে অস্বীকার করা যে কেবলমাত্র আমার পক্ষেই নয়, কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।
আমার পর্যটকবন্ধু মি. এলিসন অপলক চোখে, ভাবাপুত মন নিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সে মনোলোভা দৃশ্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে এক সময় পুলকানন্দে ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল–একটা কথা কিন্তু আমার অবশ্যই জানা আছে, মানে ভালোই বুঝি
আমি তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালাম।
সে প্রসঙ্গটার জের টেনে বলে চলল–‘হ্যাঁ, আমি বুঝি যে, যে কেউ আমার পরিস্থিতিতে পড়লে খুবই নাক সিঁটকানো খুঁত খুঁতে চরিত্রের দশজন মানুষের মধ্যে নয়জনই এ জায়গাটা দেখে মুগ্ধ হবে। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী বাস্তবিকই মনোরম ও অতুলনীয়।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে দৃশ্যটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করলাম–হুম’!
সে বলে চলল–এ দৃশ্যাবলী, মানে জায়গাটা সম্বন্ধে আমার পুলকিত হওয়া উচিত। তবে একটা কথা–‘।
আমি তার কথার মাঝখানে বলে উঠলাম–কী? কী বলতে চাইছ?
‘বলতে চাইছি, এ স্থানটা কিন্তু খুব বেশি মহিমামণ্ডিত।
‘হ্যাঁ, তা অবশ্য খুবই সত্য কথা।
‘এমন অতিমাত্রায় মহিমান্বিত দৃশ্য গোড়ার দিকে মনকে চমকে দেয় বটে। আর উত্তেজনাও কম সৃষ্টি করে না। ব্যস, তারপরই মনপ্রাণকে ক্লান্তিতে ভরপুর করে তোলে, আর বিষণ্ণও কম করে না।
‘হুম!’
‘তাই বলছি কি–’
সে কথাটাকে শেষ করার দরকার মনে না করায় এ পর্যন্ত বলেই সে থেমে গেল।
আমরা এভাবে এক নাগাড়ে চার বছর ধরে ঘুরে বেরালাম। ঘুরতে ঘুরতে আমরা শেষমেশ এমন একটা জায়গার খোঁজ পাই সেটা দেখে আমার বন্ধু এলিসনও উল্লসিত হল। কোন জায়গা সেটা বলার দরকার আছে বলে আমি মনে করছি না।
বর্তমানে আমার বন্ধুবর এলিসন আর ইহলোকে নেই। সে পরলোকে গমন করায় তার সে জমিদারি কয়েকটা বিশেষ শ্রেণির পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এরই জন্য, আর্লহিমকে কেন্দ্র করে একটা গোপন ও চাপা যশ-খ্যাতির ঢেউ গড়ে উঠল। অনেকেই এর-ওর সঙ্গে ফিসফিসিয়ে আহিসের সুখ্যাতি সম্বন্ধে আলোচনায় মগ্ন হল।
এবার বিখ্যাত স্থান আর্নহামে প্রবেশের উপায় সম্বন্ধে ধারণা দিচ্ছি। একমাত্র নদীপথেই সেখানে যেতে হয়। আমার পর্যটক বন্ধু কাক ডাকা ভোরে শহর থেকে আর্নহামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
