কিন্তু আমি জিজ্ঞাসাবাদ করে যখন জানতে পারলাম, আমার বন্ধুবর এলিসন অনেক আগেই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে তখন কিন্তু আমি এতটুকুও বিস্মিত তো হই-ইনি বরং স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছি।
আবার তার অর্থকড়ির ভাগাভাগির ব্যাপারটা নিয়েও আমি অবাক হবার মতো কিছু দেখলাম না।
শেষমেশ আমি লক্ষ্য করলাম, আমার বন্ধুটি সুখে বা দুঃখে যে করেই হোক সে প্রায় তার আগেকার সে-অবস্থাতেই ফিরে গেল। অর্থাৎ সে যা ছিল বর্তমানে অবস্থা সে-রকমই হল।
বন্ধুবর মি. এলিসন ছিল একজন মনে-প্রাণে কবি। কবিতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনার মধ্য দিয়ে দিনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিতেই তার সবচেয়ে বেশি আনন্দ।
তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল কাব্যিক মনস্কতা। আর সে ভালোই জানত, তার মহান মান-মর্যাদা তার উদার আদর্শ বলতে আসলে কি বোঝায়?
আমার বন্ধুটি ভালোই বুঝত, বিশ্বাস করত, তার কাব্যিক মনোভাবের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও বিকাশ কেবলমাত্র নুতন নতুন সৌন্দর্য সৃষ্টির মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। আর এরই জন্য বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন হয়ে উঠল যে, সে একজন সত্যিকারের কবি বা সুরশিল্পী কোনোটাই হতে পারল না, আর যা-ই হোক, অন্তত সাধারণ অর্থে তো অবশ্যই নয়। আবার এও বলা যেতে পারে যে, এ দুটোর কোনোটা হবার আগ্রহ তার মধ্যে ছিল না।
আমি তার মনোভাব সম্বন্ধে যে ধারণা করেছিলাম, সে হয়তো বা মনে মনে ভেবেই নিয়েছিল, পৃথিবীতে প্রকৃত সুখি হবার একমাত্র পথই হচ্ছে উচ্চাভিলাষের প্রতি মনে বৈরাগ্যভাব পোষণ করা। অর্থাৎ বৈরাগ্য ছাড়া যথার্থ সুখ আসতে পারে না, কিছুতেই না।
একজন বড়মাপের প্রতিভাবানকে উচ্চাভিলাষী হতেই হবে এটা কি সত্যি সত্যি সম্ভব নয়? তবে এও খুবই সত্য যে, একজন সর্বোচ্চ প্রতিভার অধিকারী কিন্তু উচ্চাভিলাষের অতীত। অর্থাৎ সত্যিকারের প্রতিভাবান উচ্চাভিলাষের বশীভূত হয়ে কোনো কাজে প্রবৃত্ত হয় না। এসব ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা করার মানসিকতার বড়ই অভাব।
আচ্ছা, এটা কি সম্ভব নয় যে, কবি মিলটনের চেয়ে অনেক বড় মাপের কবি প্রতিভা নীরব আর অখ্যাতই বয়ে গেছেন।
আমার বন্ধুবর এলিসন কবি হলো না, আর সুরশিল্পী কোনোটাই হলো না। যদিও তার মতো কবিতা আর সংগীতের প্রতি এমন অনুরাগের গভীরতা ওর আগে কারো মধ্যেই কেউ দেখেনি।
সত্যি কথা বলতে কি, সে অন্য রকম পরিবেশে পড়লে হয়তো বা একজন চিত্রশিল্পীরূপে খ্যাতি অর্জন করতে পারত।
চিত্রশিল্পী সম্বন্ধে কথা উঠলে প্রসঙ্গক্রমে সে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলত, শিল্পকর্মের সবচেয়ে আসল, সর্বাধিক মূল্যবান আর সবচেয়ে স্বাভাবিক বিভাগটাকেই একেবারেই অহেতুক অবস্থার চোখে দেখা হয়েছে। এমন একটা ব্যাপারের কথা ভাবলেও খারাপ লাগে।
কবি কাকে বলা হয়, একজন কবির সংজ্ঞা কি, কার না জানা আছে? কিন্তু একজন যদি প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাধ্যমে চমৎকার একটি উদ্যানকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে তবে তাকে কি বলে সম্বোধন করা হবে, তাকে কোন আখ্যা দেওয়া হবে? অথচ আমার বন্ধুবর এলিসন নিজের মতো ব্যক্ত করতে গিয়ে বলে প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাধ্যমে উদ্যান তৈরির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে একজন চিত্রকরের শিল্প-বিকাশের যথার্থ ক্ষেত্র।
আমার বন্ধুবর চিত্রশিল্প সম্বন্ধে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে এও বলেছে যে, চিত্রশিল্পীর শিল্প-বিকাশের ক্ষেত্রেই রয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যকে কল্পনার সাহায্যে হরেক রকম উপায়ে সাজিয়ে নতুন নতুন দৃশ্য সৃষ্টির এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র। মনোলোভা প্রাকৃতিক দৃশ্য সৃষ্টির এমন সুযোগ সচরাচর মেলে না, তাকে কাজে লাগাতেই উৎসাহি হবে। আশ্চর্য কি?
উপরোক্ত দিকটার কথা বিবেচনা করে তাই তো সে প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাধ্যমে সৃষ্টির কাজেই সে নিজেকে লিপ্ত করল। আর এটাই তো স্বাভাবিক।
আমার বন্ধুবর মি. এলিসন শিল্প-সৃষ্টির এ বিশেষ দিকে যে দক্ষতার পরিচয় দিল, সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট একটা ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের কাছে যথাযথভাবে ব্যক্ত করার সাধ্য আমার নেই, আসলে সত্যি ব্যাপারটা সাধ্যাতীত। এ ব্যাপারটা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেই আমার অক্ষমতার জন্য আমি যারপরনাই হতাশায় ভেঙে পড়ি। তাই অনন্যোপায় হয়েই সে চেষ্টা থেকে আমি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছি। তার চেয়ে বরং তার কাজের একটা দৃষ্টান্ত দিয়েই আমার বক্তব্য পাঠক-পাঠিকাদের সামনে তুলে ধরছি
আমার বন্ধু মি. এলিসন কাজে হাত দিয়েই গোড়াতেই যে কাজে মনোনিবেশ। করল তা হচ্ছে, প্রস্তাবিত উদ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থাননির্বাচন করা।
উদ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থান বাছাবাছি করার চিন্তা-ভাবনা শুরু করতেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। মতি দ্বীপপুঞ্জের প্রাকৃতিক দৃশ্য তাঁর মন-প্রাণকে পুরোপুরি জয় করেনিল।
ব্যস, তার মন-প্রাণ দক্ষিণ সমুদ্রের দিকে ছুটে গেল। সে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, যত শীঘ্রই সম্ভব দক্ষিণ সমুদ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। কিন্তু আবার এক রাতের মধ্যেই সে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল, অর্থাৎ দক্ষিণ-সমুদ্রের অভিমুখে যাত্রা করার পরিকল্পনাকে বাতিল করে দিল।
