আমার বন্ধুবর এলিসনের ওপর ভাগ্যদেবতা যেন উদার হস্তে সৌভাগ্য চাপিয়ে । দিয়েছেন। কোনো মানুষের প্রতি ভাগ্যদেবতা যে এমন উদার হতে পারেন তা যেন কল্পনাও করা যায় না। তিনি দুহাতে আমার বন্ধুটির মাথায় সৌভাগ্য উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন।
কেবলমাত্র যে ধন দৌলতের ব্যাপার তাই নয়, ভাগ্যদেবতা তাকে দৈহিক সৌন্দৰ্য্যও কম দেননি। সুঠাম ও রূপ-লাবণ্যের বিচারেও তার জুড়ি মেলা ভার। তার তুল্য সৌন্দর্য পরিচিত মহলে অন্য কারো দেহেই লক্ষিত হয় না। আর বুদ্ধিমত্তা?
জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারেও আমার বন্ধু এলিসনের তুলনা হয় না। যাদের পরিশ্রমের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করতে হয় না আমার বন্ধুটি তাদেরই একজন। অর্থাৎ তার জ্ঞান যেন তার মধ্যে জন্মাবধি বিরাজ করত।
আর তাদের বংশ মর্যাদা? পারিবারিক খ্যাতির বিচারেও তাদের সাম্রাজ্যে সবার শীর্ষে অবস্থান করত। বংশমর্যাদার ব্যাপারেও তাদের পরিবারের ওপর যেন দেবতার আশীর্বাদ বর্ষিত হত।
আমার বন্ধুর পারিবারিক সুখ-শান্তিও ছিল যথার্থই অতুলনীয়। তার সহধর্মিনী ছিল যথার্থই একজন রূপে গুণে অনন্যা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তার সহধর্মিনী ছিল একজন রমনীয়া রমনী। আর তার বিশ্বস্ততা? এদিক থেকে তার তুল্য সতী নারী দ্বিতীয় আর একজন খুঁজে পাওয়া ভার।
আর তার বিষয় সম্পত্তির কথা মুখ ফুটে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের পরিবারে সর্বদাই প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে সে যেমন রূপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিল, আজীবন তা আর মুখ থেকে নামেনি।
আমার বন্ধুবরের জ্ঞান-বুদ্ধি হবার পর জানতে পারল যে, নিয়তি আরও একবার তাকে নিয়ে অসাধারণ খামখেয়ালি খেলায় মেতেছে।
আমার বন্ধু এলিসন নাবালকত্ব কাটিয়ে সাবালক হবার প্রায় একশো বছর আগে দেশের একেবারে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মি. ব্রিাইট এলিসন নামক এক ভদ্রলোক ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান। তিনি ছিলেন এক রাজার তুল্য ধন দৌলতের অধিকারী। এমন অপরিমিত বিত্তসম্পদ কিন্তু তার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী ছিল না, বলতে কেউই ছিল না। মোদ্দা কথা, ধন সম্পত্তি অঢেল কিন্তু তার কোনো মালিক নেই।
শুধু কি এই? মি. ব্রিাইট এলিসন তার ধন-সম্পত্তির যে ব্যবস্থাদি করে যান তা হচ্ছে, তার পরলোক গমনের পর সে বিষয় আশায় দীর্ঘ একশো বছর ধরে বিভিন্ন প্রকার লগ্নির মাধ্যমে কেবল বেড়েই যাবে। তারপর সে ধন-সম্পদের কি গতি হবে, তাই না? সবকিছুর মালিকানা যাবে রক্তের সম্পর্ক আছে এমন এক আত্মীয়ের ওপর। সে ব্যক্তি একশো বছর পরও পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে। এতেই আমার বন্ধুবর যুবক এলিসনের ভাগ্য গেল খুলে। সে তার একুশতম জন্মদিনে সে সব অপরিমিত সম্পত্তি রেখে-যাওয়া ব্রিাইটের উত্তরাধিকারী হিসেবে পঁয়তাল্লিশ কোটি ডলারের মালিক বনে গেল। পঁয়তাল্লিশ কোটি ডলার, কম কথা! এক দাও মারার কথা ভাবা যায়! হ্যাঁ, ব্যাপারটাকে একেবারেই অভাবনীয়, রীতিমত অবিশ্বাস্য ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে?
ব্যাপারটা চাপা তো থাকলই না, বরং বাতাসের কাঁধে ভর করে দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। এ-কান সে-কান করে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে অঞ্চলের মানুষরা এখানে-ওখানে ছোট-বড় দলে বিভক্ত হয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনায় মেতে উঠল। সবার একই বক্তব্য, মি. এলিসন হঠাৎ এমন বিপুল অর্থের মালিক তো বনে গেল। এবার? সে অর্থগুলো কিভাবে খরচ করবে? এ ব্যাপারটা নিয়ে এক-একজন খরচের ভিন্ন ভিন্ন ফিরিস্তি দিতে লাগল। শেষমেষ দেখা গেল, সব মিলে পরিস্থিতি যা দাঁড়াল, কম সে কম হাজার রকম মতামত লোকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কেউ, কারো চেয়ে কমতি যায় না।
আরে ব্যস, একে রাজার সমান ধন-সম্পত্তি! তার ওপর একশো বছর ধরে তা লগ্নি খেটে তা শেষমেশ পঁয়তাল্লিশ কোটি ডলারে পরিণত হয়েছে। পঁয়তাল্লিশ কোটি ডলারের কথা শুনলেই তো মাথা ঘুরে, মূচ্ছা যাবার জোগাড়।
এবার কেউ কেউ কাগজ-কলম নিয়ে হিসাব কষতে বসে গেল। পঁয়তাল্লিশ কোটি ডলার শতকরা তিনভাগ হার সুদ হলেও প্রাপ্ত মোট অর্থের সুদ পাওয়া যাবে এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ ডলার; অর্থাৎ প্রতি মাসে পাওয়া যাবে এগারো লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার।
এ তো গেল প্রতিমাসে অর্থাগমের হিসাব। আর প্রতিদিনে? প্রতিদিনে তার আয় হবে ছত্রিশ হাজার নয়শ ছিয়াশি ডলার।
আর যদি প্রতিঘণ্টার অর্থাগমের হিসাব করা যায়, তবে প্রতি ঘণ্টায় আয় হবে এক হাজার পাঁচশো একচল্লিশ ডলার।
এবার দেখা যাক, সে কি পরিমাণ অর্থ পেতে পারে। হিসাব কষে দেখা গেল, তা হবে দুশ বিশ ডলার–ভাবা যায়!
তাই বলতেই হয়, মানুষের কল্পনা বার বার ধাক্কা খেতে খেতে একেবারে ভোতা হয়ে গেল। সত্যিই তো এমন একটা ব্যাপার নিয়ে বাবনা-চিন্তা করতে বসলে এমন কোন মানুষ আছে যে বেশিক্ষণ মাথা ঠিক রাখতে পারে?
আমার বন্ধুবর মি. এলিসনের অর্থকড়ির ব্যাপারটা নিয়ে যারা বেশি করে ভাবনা চিন্তায় মাতল তাদের মধ্যে কেউ-কেউ জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে এমন সিদ্ধান্তেও এলো যে, মি. এলিসন তার প্রাপ্ত সম্পূর্ণ সম্পত্তির কম হলেও অর্ধেকটা দূর সম্পর্কের ও নিকট আত্মীয়ের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দেবে। আর অবশিষ্ট অর্ধাংশ? নিজের ভোগ বিলাসের জন্য অর্ধেক সম্পত্তি জমা রাখবে।
