পরিস্থিতি কিন্তু ক্রমেই আরও ভয়ঙ্কর–খারাপ হয়ে পড়তে লাগল।
লেজে বাঁধা পকেট ঘড়িগুলোও আর চুপ করে রইল না। তারাও হঠাৎ এমন ক্ষেপে উঠল যা ভাবলেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তাদের এমন অসহনীয় কাণ্ডকারখানায় অতিষ্ট হয়ে শুয়োর আর বিড়ালগুলো রীতিমত ক্ষেপে গিয়ে লম্ফ ঝম্ফ শুরু করেছিল। অনবরত ঘঁাও মাও ফেস-ফোঁস করতে একে-ওকে আঁচড় আর কামড় দিতে লাগল।
শুধু কি এই? আচমকা এর-ওর মুখেও আঁচড় মারতে বাকি রাখল না। পরমুহূর্তেই সেটি কোটের ভেতর ঢুকে গিয়ে এমন বিচ্ছিরি তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দিল যা কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেনি।
এসব ব্যাপার নিঃসন্দেহে অভাবনীয়। কিন্তু এসবের চেয়েও আরও বেশি পরিতাপের ব্যাপার হচ্ছে, বাড়িটার শীর্ষদেশে বসে হতচ্ছাড়া বেঁটে লোকটা যা খুশি এমন তা-ই করে চলেছে। ধোয়ার পর্দার ভেতর দিয়ে একটু পর পরই হতচ্ছাড়াটার মূর্তি চোখে পড়ছে।
আরে, ঘণ্টা ঘরের লোকটার এ কী হাল হয়েছে! সে যে একেবারে কুপোকাৎ! চিৎ হয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। আর হতচ্ছাড়াটা তার বুকের ওপর চেপে বসে পড়েছে!
শুধুই কি তার বুকের ওপরে বসে? ঘণ্টার দড়িটাকে সে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে। আর বার বার মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ দিয়ে অনবরত যেমন বিচ্ছিরি শব্দ করে চলেছে, সে কথা মনে পড়লে এখনও আমার কানে তালা লেগে যায়। সে কী বিদঘুঁটে শব্দ রে বাবা!
আর ইয়া পেলাই বেহালাটাকে কোলের ওপর উঠিয়ে নিয়েছে। এবং তার তার গুলোর ওপর হাত দুটোকে এমন আনাড়িভাবে চালাচ্ছে, যার ফলে তাল আর বেতাল যা-ই বলা যাক না কেন, হঠাৎ করে শুনলে মনে হবে সেটা নির্ঘাৎ পাগলের কাণ্ডকারখানা শুরু হয়ে গেছে। পাগল ছাড়া অন্য কিছু ভাবারই জো নেই।
না, আমি আর পারলাম না। আমার পক্ষে সেখানে কিছুতেই থাকা সম্ভব হলো । কেবলমাত্র আমিই নয়, অন্য কারো পক্ষেই সেখানে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব। হত না। যা-ই হোক, আমি নিরুপায় হয়েই সেখান থেকে চলে এলাম।
এখন সঠিক সময় আর সুরের পিয়াসি যারা তাদের কাছে আমি একটা অনুরোধ, সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখছি–চলুন, আমরা জোট বেঁধে সে নগরটায় যাই। আর সে হতচ্ছাড়া বেঁটে খাটো লোকটাকে বাড়িটার শীর্ষদেশ থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনি। তাকে ঘাড় ধরে একেবারে নগরটার সীমানার বাইরে বের করে দিয়ে আসি। আর ভন্ডারভটিমিটিস নগরটার সে পুরনো দিনের শান্তি ও আনন্দঘন পরিবেশ ফিরিয়ে আনি। কী? যাবেন?
দ্য ডোম্যাইন অব আর্নহিস
এলিসন।
আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু এলিসন।
জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে একেবারে সমাধিক্ষেত্র পর্যন্ত পুরো পথটাই আমার বন্ধুবর এলিসন সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের মধ্য দিয়েই পাড়ি দিয়েছে।
সমৃদ্ধি আর প্রাচুর্য্য কথা দুটোকে কিন্তু আমি মোটেই কেবলমাত্র জাগতিক অর্থেই ব্যবহার করছি না। বরং মনে করা যেতে পাওে, মুখের সমার্থক শব্দ হিসেবেই ব্যবহার করছি। অর্থাৎ আমার বন্ধুবর যেমন রূপার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছিল ঠিক তেমনই সুখ স্বাচ্ছন্দের মধ্য দিয়ে আমৃত্যু জীবন যাপন করে গেছে। দুঃখ-দুর্দশা বা অভাব অনটন কাকে বলে বিন্দুমাত্রও তার জানা ছিল না।
এবার বলছি, যার কথা আমি বলছি, তার জন্মও বিশেষত্বে ভরপুর। সত্যি কথা বলতে কি, তার জন্মই যেন প্রিস্টলি, কন্ডসেট, তুগগা ও প্রাসইস কর্তৃক প্রচারিত মতবাদের পূর্বভাষ ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না। একটু আধটু ঘুরিয়ে বললে বলতে হয়, তার জন্ম পূর্ণতাবাদীদের অলীক কল্পনার ব্যক্তিগত একটা উদাহরণস্বরূপ।
তবে এ-কথাও কিন্তু খুবই সত্য যে, সুখ সম্বন্ধে কোনো কাহিনী বা প্রবন্ধের অবতারণা করা আদৌ আমার অভিলাষ নয়, সে চেষ্টাও আমি করব না।
তবে খুই সংক্ষেপে আমার বন্ধুটি সম্বন্ধে কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব।
আমার সে বন্ধুবর মুখের চারটি মৌলিক নীতি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলত, অর্থাৎ আরও খোলসা করে, যথাযথভাবে বললে, চারটি শর্তকে সে সতর্কতার সঙ্গে পালন করত।
শুনলে অবাক না হয়ে পারা যায় না, শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সরল দৈহিক একটা কাজ। ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো না, তাই না? আসলে কোনোরকম যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম ছাড়াই মুক্ত বাতাসে কয়েকটি ব্যায়ামের অনুশীলন করা।
শরীরগঠন অর্থাৎ ব্যায়ামের প্রসঙ্গ নিয়ে কারো সঙ্গে কথা উঠলেই আমার বন্ধু সরাসরি জবাব দিত–অন্য কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে যে স্বাস্থ্য লাভ সম্ভব হয় তাকে স্বাস্থ্য আখ্যাই দেওয়া চলে না!
আর একটা কথা, শ্রেণিগতভাবে অন্যের চেয়ে তুলনামূলকভাবে যাদের সুখি বলা যেতে পারে তাদের দৃষ্টান্ত খাড়া করাতে গিয়ে আমার বন্ধুটি শেয়াল শিকারিদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর যারা কৃষিকাজে লিপ্ত থাকে তাদের দৃষ্টান্তই তুলে ধরত।
আমার বন্ধুটির প্রথম ও সেরা শর্তের কথা তো বললাম। এবার বলছি, তার দ্বিতীয় শর্তের কথা। সেটা হলো নারীর প্রেম–নারী হৃদয়ের ভালোবাসা।
আর তৃতীয় শর্তটা? সেটা অর্জন করা বাস্তবিকই কঠিন সমস্যা। সেটা কি? সংক্ষেপে বলতে গেলে, উচ্চাকাঙ্খার প্রতি বিতৃষ্ণা, জলন্ত বিতৃষ্ণাই বলা চলে। এবার শেষ, অর্থাৎ চতুর্থ শর্তের কথা উল্লেখ করছি। সেটা হচ্ছে, নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুসরণ করার মতো কোনো বিষয়। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ছিল, অন্য যাবতীয় কিছু যদি সমতুল্য হয় তবে লব্ধ সুখের পরিমাণ হবে বিষয়টার আধ্যাত্মিকতার সমানুপাতিক। এটা একটু লটঘটে সন্দেহ নেই।
