ঘণ্টাঘরের কাজের নিযুক্ত দায়িত্বশীল লোকটা তার কাণ্ড কারখানা দেখে তো একদম হতবাক হয়ে গেল। সে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পকেট থেকে পাইপটা বের করে ধূমপান করতে শুরু করল।
কিন্তু বেঁটেখাটো আগন্তুক একলাফে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল। পর মুহূর্তেই তার নাকটা চেপে ধরে এক পাক ঘুরিয়ে দিয়েই আচমকা এমন এক ধাক্কা দিল, দুম করে মাথায় একটা চাটি বসিয়ে দিল। ব্যস, ঘণ্টাঘরের কর্তব্যরত লোকটা সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
আগন্তুক ঘণ্টা ঘরের লোকটার বগল থেকে ছিটকে পড়া বেহালাটা কুড়িয়ে নিয়ে সেটা দিয়ে দমাদম আঘাত হানতে লাগল যে, সবাই ভাবল ঘণ্টা ঘরে বুঝি একদল ঢাকি অনবরত ঢাক পেটাচ্ছে। সত্যি সে যে কী ও গমৃগম্ আওয়াজ তা আর বলার নয়।
এ কী অরাজকতা! এসব কী বে-আইনি কাজ শুরু হয়েছে রে বাবা! আর এ যে রীতিমত জবরদস্তি শুরু হল! এসব বে-আইনি জবরদস্তি কাজের বদলা নেবার জন্য নগরের মানুষগুলো একাট্টা হয়ে গেল। তারা উপযুক্ত বদলা নেবার জন্য এমন এক ভয়ানক কাণ্ড করল, সেটা সবাই জানতেও পারল না।
তখন দুপুর হয় হয়। দুপুর হতে ঠিক আধা সেকেন্ড বাকি। ঘণ্টাটা ঢং ঢং শব্দে বেজে ওঠার সময় হয়ে এলো বলে। সবাই নিজের নিজের ঘড়ির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে ব্যস্ত।
তবে এটাও সত্য যে বাড়ির শীর্ষদেশের অতিকায় ঘড়িটাকে নিয়ে আগন্তুক বেটেখাটো লোকটা এমনকিছু একটা কাজ করতে মেতে গেল, যা তার কর্তব্যের আওতায় পড়ে না, মোটেই তার করার কথা নয়।
কিন্তু ঘড়িটা যখন গুরুগম্ভীর শব্দে বাজতে আরম্ভ করল, ঠিক সে মুহূর্তেই সবাই ঘড়ির শব্দ শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে লোকটার কাজকর্মের দিকে নজর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা বা সময় কোনোটাই তাদের নেই। সবাই যে নিজের নিজের পকেটঘড়ি নিয়েই পুরোপুরি মেতে রয়েছে।
বাড়ির চূড়ার অতিকায় ঘড়িটা ‘ঢং’ শব্দ করে বেজে উঠল।
ব্যস, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ভন্ডারভট্টিমিটিস নগরের প্রত্যেক বুড়ো গৃহকর্তাই চামড়ার মোড়া আরাম কেদারায় তড়া করে সোজাভাবে বসে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–‘টং’।
আর তাদের প্রত্যেকের পকেটঘড়িতে বেজে উঠল–‘টং’। তাদের শুয়োর আর বেড়ালেরা লেজ-মার্কা পকেটঘড়িগুলোর কথা বলছি।
আর তাদের ছেলেদের ঘড়িতেও একই সঙ্গে বেজে উঠল–‘টং’! অতিকায় ঘড়িটায় বেজে উঠল–‘ঢং’!
পকেটঘড়িতে বেজে উঠল–‘ঢং’!
বড় ঘড়িটায় একের পর এক বাজতে লাগল ‘থ্রি! ফোর! ফাইভ! সিক্স! সেভেন! এইট! নাইন! টেন!
আর একই সঙ্গে অন্যসব ঘড়িতেও বাজতে লাগল–‘থ্রি! ফোর! ফাইভ! সিক্স! সেভেন! এইট! নাইন! টেন!’
পর মুহূর্তেই বাড়ির শীর্ষদেশের বড় ঘড়িটা বলে উঠল–‘ইলেভেন’!
সবাই একই সঙ্গে বলে উঠল–‘ইলেভেন’!
অতিকায় ঘড়িটা বলল–‘টুয়েলভ’!
গবা ইনিচু গলায় বলে উঠল–‘ডবলেফ!’
নিজনিজ ঘড়ি বন্ধ করে বেটেখাটো গৃহকর্তা ভদ্রলোকেরা বলল–এখন সময় ঠিক ডবলেফ!’ ডবলেফ!
অতিকায় ঘড়িটা কিন্তু এখনও তার স্বর থামাল না, বলেই চলল। সেটা পরমুহূর্তেই বলল–‘থারটিন!
গৃহকর্তা বৃদ্ধরা বলে উঠলেন–‘ডের টিউফেল’! ডের টিউফেল’!
এবার তাদের সবার মুখেই ঘন কালো মেঘ নেমে এলো। দুম দুম করে সবার মুখ থেকে জ্বলন্ত পাইপ মেঝেতে পড়ে গেল। আর সবারই ডান পা বা হাঁটুর ওপর থেকে তড়াক করে নেমে গেল। আর সে সঙ্গে সবাই আরাম কেদারায় খাড়াভাবে বসে পড়ল।
সবাই সমস্বরে আর্তনাদ করে উঠল–‘ডের টিউফেল!’ সবাই আবার সমস্বরে আর্তনাদ করে উঠল–‘ডারটিন! ডারটিন! –মেইন গট ঘড়িতে তো এখন বাজে ডারটিন!’
এবার সে ভয়ঙ্কর দৃশ্য ঘটে গেল তা আর বলার নয়। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য রে বাবা! পুরো ভন্ডারভটিমিটিস নগর শোকে হাহাকার করে উঠল। হরদম কপাল চাপড়াতে লেগে গেল।
কেবলমাত্র বৃদ্ধরাই নয়। ছেলেরাও তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আর্তনাদ জুড়ে দিল।
হাহাকার হা-হুঁতাশ করতে করতে গৃহকর্তা বৃদ্ধরা নিজনিজ পাইপে তামাক খুঁজে তাতে অগ্নি সংযোগ করলেন। তারপর লাল চামড়ায় মোড়া আরাম কেদারায় নিজেদের পুরোপুরি সঁপে দিয়ে ঘন ঘন টান দিয়ে গল গল করে ধোয়া ছাড়তে লাগলেন। তারা এত বেশি পরিমাণে ধোয়া ছাড়ল যে, পুরো উপত্যকাটাই ধোয়ার আস্তরণে চাপা পড়ে গেল। দুর্ভেদ্য সে ধোয়ার আস্তরণ ভেদ করে এমনকি নিজের হাতটাকে পর্যন্ত দেখা যায় না।
আর এদিকে? বাঁধাকপিগুলো টকটকে লাল রং ধারণ করল। ক্রমে পরিস্থিতি এমন অবিশ্বাস্য রকম ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়াল, যা আর বলে কি হবে! পরিস্থিতিটা দেখে। একটা কথাই বার বার মনে হতে লাগল যে, ‘স্বয়ং নিক’ বুঝি বা ঘড়ির রূপ পরিগ্রহ করে নগরের সবকিছুর ওপর ভর করেছে। আসবাবপত্রের ওপরকার খোদাই করা মনোলোভা কারুকার্যসমৃদ্ধ ঘড়িগুলোর কথাই ধরা যাক না কেন। সেগুলো যেন ভূতচাপার মতো তিড়িং তিড়িং করে অদ্ভুতভাবে নাচনা-কোদন জুড়ে দিল।
আর চুলির ওপরকার তাকের ওপরে রক্ষিত ঘড়িগুলো আরও অনেক, অনেক বেশি অদ্ভুত কাণ্ডে মেতে উঠেছে। সেগুলোর আকস্মিক তীব্র ক্রোধ সম্বরণ করতে না পেরে একনাগাড়ে কেবল থারটিন-থারটিন বাজতে লাগল। আরও আছে, তাদের দোলকগুলো এমন অত্যাশ্চর্যভাবে এদিক-ওদিক এঁকে বেঁকে দোল খেতে লাগল যে, সে ভয়ঙ্কর বুক-কাঁপানো দৃশ্য চোখে দেখা বাস্তবিকই কষ্টসাধ্য।
