কর্মহীন অবৈতনিক পদে যারা বহাল রয়েছে সচরাচর লোকে তাদের অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকে। আর যেহেতু ভন্ডারভটিমিটি নগরের ঘণ্টাঘরের কাজকর্ম দেখভাল করার জন্য নিযুক্ত কর্মচারীটা কর্মহীন তেনভোগীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো, গুরুত্বপূর্ণ পদটা অধিকার করে রয়েছে, তাই তো সবাই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা সম্মানিত লোক বলে জ্ঞান করা হয়, রীতিমত সমীহ করে। এমনকি নগরের একরোখা লোকগুলো পর্যন্ত তাকে যথেষ্ট সমীহ করে মান্য করে।
ঘণ্টাঘরের দায়িত্বশীল লোকটার কোটের লেজ চার দিকেই সমান লম্বা, সবচেয়ে লম্বাও বটে। নগরের অন্যান্য বুড়ো লোকগুলোর থেকে তার সবকিছুই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের। যেমন ধরা যাক, তার ব্যবহারের পাইপটা, তার জুতার বকলেসের সঙ্গে অন্য কারো পাইপ আর জুতার ফিতের তুলনাই চলে না। আবার তার চোখ দুটো অন্য সবার চেয়ে বড়, তার ভূড়িটা পর্যন্ত নগরের যে কোনো বুড়ো মানুষের ভুড়িকে টেক্কা দিতে পারে। আর তার থুৎনিটা? অন্য সবার মতো দুই ভাঁজ নয়, পুরোপুরি তিন ভাঁজ। ফলে সহজেই যে কোনো লোকেরই তার থুৎনিটার দিকে নজর যায়।
এতক্ষণ তো আমি ভন্ডারভিট্টিমিটিস নগরের চমৎকার বিবরণটা পাঠকদের সামনে সবিস্তারে তুলে ধরলাম। হায় ঈশ্বর! এমন সুন্দর একটা নগরের বরাতে এত অবর্ণনীয় দুর্দশা ছিল! এর দুর্দশার কথা বলে শেষ করা যাবে না।
নগরটার পুরনো বাসিন্দাদের মধ্যে বহুকাল আগে থেকেই একটা কথা প্রচলিত আছে–‘পাহাড়ের ওপর থেকে কোনোদিনই ভালো কিছু আসবে না। এ কথাটাকে নগরের সবাই ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবেই জ্ঞান করে।
বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো গতকাল দুপুরের পাঁচ মিনিট আগের কথা। ঠিক তখনই পূর্বদিকে পাহাড়ের চূড়ায় এক বিচিত্র দর্শন বস্তু দেখতে পাওয়া গেল সত্যি। একেবারেই অদ্ভুত বস্তু সেটা।
সে বস্তুটার, সে ঘটনাটার প্রতি সবারই সতর্ক দৃষ্টি পড়ল। চামড়ায় মোড়া আরাম কেদারায় বসে-থাকা প্রত্যেক বেটেখাটো বৃদ্ধ ভদ্রলোকেরই একটা চোখ অত্যুগ্র আগ্রহভরা দৃষ্টিতে সে দিকে তাকিয়ে রইল। আর দ্বিতীয় চোখটা? সেটা পাহাড়ের। শীর্ষদেশের অতিকায় ঘড়িটার দিকে। কিন্তু বিচিত্র দর্শন বস্তুটা কি?
দুপুর হতে মাত্র তিন মিনিট বাকি। তিন মিনিট বাকি থাকতেই নগরের সবাই বুঝতে পারল যে, সে বিচিত্রদর্শন প্রাণীটা খুবই বেটেখাটো এক যুবক, বিদেশি যুবক। সে লম্বা লম্বা পায়ে পাহাড়ের গায়ের পথ ধরে নিচে নেমে এলো।
নিচে নেমে আসার পরই নগরের সবাই সে পরদেশি যুবকটাকে ভালোভাবে দেখতে পেল।
এত বেটে, একেবারে ফিনল্যান্ডের দেশের মানুষের মতো কোনো বেটে মানুষকে ভন্ডারভটিমিটিস নগরে, এর আগে কেউ, কোনোদিনও দেখেনি।
আগন্তুক যুবকটার মুখটা গাঢ় নস্যি রংয়ের, নাকটা খুব লম্বা আর খুবই খাড়া। চোখ দুটো মটরদানার মতো গোল, মুখটা চওড়া আর দাঁতের পাটি দুটো সুদৃশ্য–যাকে বলে রীতিমত চমৎকার। তার মুখটা জুড়ে রয়েছে গোঁফ-দাড়ি। আর এ জন্যই তার মুখের বাকি অংশটা পুরোপুরি দেখার উপায় নেই। বহু চেষ্টা করেও কেউ তার মুখটা দেখতে পায়নি।
তার মাথাটা খোলা, চুলগুলো সুন্দরভাবে আঁচড়ে পাট-করা। আর গায়ে আটসাট লেজ-ঝোলা কালো একটা কোট। সেটার একটা পকেট থেকে বেশ বড়সড় একটা সাদা ভাঁজ করা রুমাল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বীচেসটা কালো। পায়ে কালো মোজা। আর পাম্প সু। জুতার সঙ্গে একটা করে সার্টিনের ফুল সেঁটে দেওয়া আছে।
তার বগলে সর্বক্ষণ একটা টুপি আর নিজের দৈহিক উচ্চতা থেকে পাঁচ গুণ বেশি দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট একটা বেহালা অন্য বগলে ধরা থাকে। আর বাঁ হাতে একটা সোনার নস্যির কৌটা সর্বক্ষণ থাকবেই থাকবে।
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে-আসা আঁকাবাঁকা পথ ধরে নামতে নামতে পরমানন্দে অনবরত নস্যি টেনে চলেছে।
খুবই সত্য যে, ভন্ডারভটিমিটিস নগরের মানুষগুলোর দৃষ্টিতে ঘটনাটা একটা লোভনীয়, কৌতূহল উদ্দীপক-অপলক চোখে দেখার মতো দৃশ্যই বটে। আর হবে-ই বা কেন? এমন একটা বিচিত্র মানুষ পাহাড় থেকে হেলেদুলে নামতে থাকলে এমন কোন বেরসিক মানুষ আছে যে চোখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে?
সত্যি কথা বলতে কি, লোকটা যতই ধবধবে সাদা দাঁতগুলো বের করে হাসিহাসি মুখ করুক না কেন, তার চোখ-মুখে কিন্তু একটা ধৃষ্টতা আর অশুভ ইঙ্গিত প্রকাশ পাচ্ছে।
লোকটা যখন অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে লাফিয়ে লাফিয়ে পাড়ায় ঢুকল, তখন তার পায়ের পুরনো পাম্প সুর দিকে চোখ পড়তেই সবার মনে সন্দেহ দানা বাঁধল। আর তার ঢিলেঢালা মাত্রাতিরিক্ত লেজ-ঝোলা কোটের পকেট থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া কেমব্রিজের সাদা রুমালটার তলা দিয়ে উঁকি দেওয়ার সুযোগ লাভের বিনিময়ে তাকে কিছু অর্থ ঘুষ দিতেও সম্মত হল।
কিন্তু সে আত্মম্ভরী হতচ্ছাড়াটা যখন পথের মাঝে সবার সামনে প্রাচীন নাচ দেখাতে আরম্ভ করল, তখন সেখানে এমন অঙ্গভঙ্গি করে কোমর দোলাতে আরম্ভ করল যে, সবার রীতিমত তাক লেগে গেল, বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
দুপুর হতে তখন ঠিক দেড় মিনিট বাকি। নগরের ভালো মানুষগুলো তখনও ভালোভাবে চোখ মেলে তাকাতে পর্যন্ত পারেনি তখন সে শয়তান লোকটা ভিড় ঠেলে এক লাফে একদম সবার মাঝখানে পৌঁছে, তারপর কোমর দুলিয়ে, হাত পা নেড়ে চেড়ে এমনভাবে এখানে একটু, ওখানে একটু নাচানাচি করল। নগরবাসীরা বিস্ময় বিমূঢ় অবস্থায় যেননির্বাক-নিস্পন্দ হয়ে তার নাচন-কোদন দেখল। তারপরই সে লম্বা লম্বা পায়ে যেন পাখির মতো উড়তে উড়তে সোজা পারিষদ-ভবনের ওপরকার ঘন্টাঘরে গিয়ে হাজির হল।
