তার পোশাক-পরিচ্ছদ? কমলা রঙের পোশাক তার পরনে, পিছনদিকটা ঢোলা ও একটু বেশিরকম ঝুলে পড়েছে আর কোমরটা আটসাট। আর মাথায় একটা চওড়া টুপি। তার গায়ে লাল-হলুদ ফিতে জড়িয়ে দেওয়া রয়েছে। দুপায়ে ইয়া লম্বা সোজা আর লাল চামড়ার জুতা। হলুদ ফিতে দিয়ে বাঁধাকপির ঢঙে গিঁট বাঁধা। আর বাঁ । হাতের কবজিতে বড় সড় একটা হলন্দাজ ঘড়ি বাধা, ডান হাতের মুঠোয় একটা মুণ্ডি। ধরে রাখা। মোটাসোটা, প্রায় গোলগাল একটা বিড়াল প্রায় সর্বক্ষণ তার পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
বাড়িতে তিনটি ছেলে। সবাই বাগানে শুয়োর চড়ায়। সবাই বেটেখাটো। সবারই উচ্চতা দু-ফুট করে। তাদের মাথায় একটা করে উঁচু ত্রিভুজাকৃতি টুপি। গায়ে ওয়েস্ট কোট। উরু পর্যন্ত নামিয়ে-দেওয়া। আর পরনে ব্রীটেস। হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি। পায়ে পড়েছে প্রায় হাঁটু অবধি লাল মোজা। পশমের তৈরি। আর ভারী এক জোড়া জুতা, রূপার বকলেস দিয়ে পায়ের সঙ্গে এমনভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে যাতে ছুটোছুটি করলেও কিছুতেই খুলে যাওয়ার জো নেই।
এ তো গেল বাড়ির ছেলে তিনজনের পোশাক আশাকের বিবরণ। আর তাদের প্রত্যেকের দুঠোঁটের ফাঁকে একটা করে পাইপ প্রায় সর্বক্ষণই আটকানো থাকে। সেগুলো থেকে গলগল করে ধোয়া ছাড়ে আর শুয়োরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে নেয়, আবার ধোঁয়া ছাড়ে আর দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুয়োরগুলোকে দেখে নেয়। আরে, কথায় কথায় তাদের ডান হাতে যে একটা করে ছোট ঘড়ি বাঁধা আছে, বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম।
গৃহকর্তা ভদ্রলোক অতি বৃদ্ধ। চামড়ায় মোড়া আর উঁচু পিঠযুক্ত একটা আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ গৃহকর্তা সর্বক্ষণ খোলা সদও দরজায় বসে থাকেন। বেটেখাটো তার চেহারা, আর ভুড়িটা লক্ষ্যণীয়। চোখ দুটো গোল আর বড় বড়। আর থুনিটা যেন দুই ভাঁজ করা।
গৃহকর্তা বৃদ্ধের পোশাক-পরিচ্ছদ ধরতে গেলে ছেলেদের মতোই। তবে অমিল যা রয়েছে হচ্ছে, তার দুঠোঁটের ফাঁকে আঁকড়ে-রাখা পাইপটা তাদের পাইপগুলোর তুলনায় বেশ বড়–লম্বা। আর গল গল করে ধোঁয়াও বেরোয় প্রচুর পরিমাণেই। আর ছেলেদের মতো তারও একটা ঘড়ি রয়েছে। তবে ছেলেদের মতো কবজিতে বাঁধা নয়, ফিতের সাহায্যে কোটের পকেটে রেখে দিয়েছেন।
বৃদ্ধ গৃহকর্তা আরাম কেদারাটায় শরীর এলিয়ে দিয়ে বাঁ হাঁটুর ওপর ডান পা টা তুলে দিয়ে বিশেষ-ভঙ্গিতে আয়েশ করে বসে। তার চোখেমুখে গাম্ভীর্যের ছাপ সুস্পষ্ট। একটা চোখ সর্বক্ষণ বিশেষ একটা বস্তুর ওপরনিস্পলকভাবে নিবদ্ধ রাখেন। আর সে বিশেষ বস্তুটা সমতলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে।
সে বিশেষ বস্তুটা নগরের পারিষদ ভবনের চূড়ায় রক্ষিত আছে। নগর-পরিষদের সদস্যরা সবারই চেহারা বেটেখাটো, প্রায় বলের মতোই গোলগাল। যাকে বলে নাদুস নুদুস। তাদের গা দিয়ে যেন তেল চুঁইয়ে পড়ে। তাদের সবার চোখও গোল, আর থুনি ভাঁজ করা।
আমি নগরে যতদিন ছিলাম, তার মধ্যে নগর পারিষদরা কয়েকটা অধিবেশন আহবান করেছিল। নগর পরিষদ ভবনেই অধিবেশন বসেছিল। পারিষদরা সবাই একমত হয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। নিচে যে সিদ্ধান্ত গুলো উল্লেখ করা হল:
‘সে আসলের প্রচলিত নিয়ম-কানুনের পরিবর্তন অন্যায়।’
‘ভান্ডারভটিমিটিসের বাইরে কিছুমাত্রও গ্রহণ করার মতো নয়।’
‘আমাদের বাঁধাকপি আর ঘড়িকেই আমরা আঁকড়ে ধরে রাখব।’
এ সুযোগে নগর-পরিষদের অধিবেশনকটা সম্বন্ধে দু-চার কথা বলে রাখছি। তার মাথায় শোভা পাচ্ছে একটা চূড়া, চূড়াটা খুবই উঁচু। তার মধ্যে রয়েছে একটা ঘণ্টাঘর। আর সেখানে হ্যাঁ, সেখানেই রয়েছে সুদূর অতীত থেকেই রয়েছে, এ অঞ্চলের বড়াই করার মতো ও বিস্ময়কর বস্তু–ভন্ডারভট্টিমিটি নগরের সুবিশাল ঘড়িটা। চামড়ায় মোড়া আরাম কেদারায় আয়েশ করে বসে বৃদ্ধ গৃহকর্তা নিস্পলক চোখে এ ঘড়িটার দিকেই তাকিয়ে থাকেন। হবে না-ই বা কেন? এ ঘড়িটার জন্য সে নগরবাসীদের গর্বের অন্ত নেই।
সুবিশাল ঘড়িটার সাতটা মুখ এমনভাবে তৈরি যে, যে কোনো অঞ্চলের যে কোনো প্রান্ত থেকে কোনো-না-কোনো মুখ দেখা যাবেই। অর্থাৎ আকাশচুম্বী চূড়ার সাতটা দিকের প্রতিটা দিকে ঘড়িটার একটা করে মুখ অবস্থান করছে। এ ব্যবস্থার কথা তো আগেই বলা হয়েছে যে, সব দিক থেকে যাতে অনায়াসেই সময় দেখা যায়, এ কথা মাথায় রেখেই এমনটা করা হয়েছে।
ঘড়িটার মুখগুলো সাদা আর বড়। আর এর কাঁটাগুলো মোটা মোটা ও কালো।
ঘণ্টাঘরের কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য একজনের ওপর দায়িত্ব দেওয়া আছে। তার প্রথম ও প্রধান কাজ ঘড়িটার দিকে নজর রাখা, কাঁটাগুলো ঠিকঠিক ভাবে চলে কিনা দেখভাল করা। আর এ কাজটা কর্মহীন বেতনভোগি পদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণনিদর্শক। এ কথা বলার যুক্তিও আছে যথেষ্টই। কারণ, ভন্ডারভটিমিটিসের সুবিশাল এ ঘড়িটার কোনোরকম বেয়াদপি, গোলযোগের কথা আজ পর্যন্ত কোনোদিন কারো মুখে শোনা যায়নি।
কিছুদিন আগে অবধিও সেরকম যে কোনো বক্তব্যকেই খুবই গর্হিত, ধর্মবিরোধী বলে বিবেচনা করা হত।
সেই আদিকাল থেকেই বড় ঘড়িটা সর্বদাই বাজে। সঠিক সময় জানার মতো এমন কোনো অবলম্বন, কোনো স্থান আর কোথাও ছিল না। অর্থাৎ নগরবাসীদের সঠিক সময় জানতে হলে এঘড়িটার ওপর নির্ভর না করে কোনো উপায় ছিল না।
